ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার মেডিসিন অ্যান্ড অ্যালায়েড সায়েন্সেস (নিনমাস)। বাংলাদেশে নিউক্লিয়ার মেডিসিন কার্যক্রমের শীর্ষস্থানীয় এ প্রতিষ্ঠান মেডিসিন সংক্রান্ত সেবা দেয়ার পাশাপাশি প্রশিক্ষিত জনবলও তৈরি করে আসছে। অথচ নিনমাস নিজেই জনবল সংকটে। কর্মীর অভাবে নষ্ট হচ্ছে অবকাঠামোসহ গুরুত্বপূর্ণ সব যন্ত্রপাতি। সঠিক সেবা পাচ্ছেন না সেবাগ্রহীতারা। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে বিষয়টি উঠে এসেছে। সংস্থাটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন থেকে ১ হাজার ১৮৬ জনবল সৃষ্টির প্রস্তাব করা হয়েছিল। যদিও অনুমোদন মিলেছে মাত্র ১২৮টি পদের।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে একটি প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়। সেখানে বলা হয়, নতুন আটটি ইনমাস স্থাপন প্রকল্প ২০১৭ সালের জুলাই থেকে ২০২৩ সালের জুন মেয়াদে বাস্তবায়ন হচ্ছে। কাজের মান নিশ্চিতকরণসহ যথাসময়ে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে নিয়মিতভাবেই তা পর্যবেক্ষণ করছেন পরমাণু শক্তি কমিশনের প্রকৌশলীরা। তাছাড়া প্রকল্প পরিচালক ও উপ-প্রকল্প পরিচালকরা এ বিষয়ে সার্বক্ষণিকভাবে যোগাযোগ রাখছেন। এমনকি নির্মাণকাজে ব্যবহূত মালামালের গুণগতমান বজায় রাখার জন্য নিয়মিতভাবেই সেগুলো বুয়েটসহ বিভিন্ন প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, জনবলের জন্য কমিশন থেকে ১ হাজার ১৮৬টি পদ সৃষ্টির প্রস্তাব করা হয়। তার মধ্যে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ১৫৪টি পদের সম্মতি দেয়। অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে যদিও সম্মতি মিলেছে ১২৮টি পদের। সেই জনবল নিয়োগের জন্য মন্ত্রণালয় থেকে ছাড়পত্র দেয়া হয়েছে।
সংসদীয় কমিটির গত বছরের নভেম্বরে অনুষ্ঠিত আলোচনায় জামালপুর-৫ আসনের সংসদ সদস্য মো. মোজাফফর হোসেন বলেন, ‘নিউক্লিয়ার মেডিসিন অ্যান্ড অ্যালায়েড সায়েন্স চিকিৎসাসেবার অত্যাধুনিক প্রযুক্তি। তবে উপযুক্ত জনবল ছাড়া এ চিকিৎসাসেবা দেয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। জনগণকে সঠিক সেবা দেয়ার জন্য কমিশন থেকে ১ হাজার ১৮৬টি পদ প্রস্তাব করা হয়েছিল। দুই দফায় সেখান থেকে কেটে ১২৮টি পদের অনুমোদন মিলেছে। কিন্তু এত কম জনবল দিয়ে এ গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাসেবা দেয়া কী করে সম্ভব!’ তিনি বলেন, ‘প্রায়ই দেখা যায়—ভবন আছে, যন্ত্রপাতি আছে, কিন্তু জনবল না থাকায় জনগণ সেবা পাচ্ছে না। অন্যদিকে গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতিসহ অবকাঠামো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, যা অর্থের অপচয়। জনবলই যদি না-ই দেয়া হয় তাহলে জনগণের কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে অবকাঠামো নির্মাণসহ গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি ক্রয়ের প্রয়োজনীয়তা কী, তা বোধগম্য নয়।’
বিষয়টি নিয়ে বিজ্ঞান প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব জিয়াউল হাসান জানান, খুব স্বল্পমূল্যে জনগণকে সেবা দেয়ার জন্য নিনমাস স্থাপন করা হচ্ছে। একনেক বৈঠকেও এ ধরনের প্রকল্প প্রশংসা কুড়িয়েছে এবং জনবলসহ প্রকল্পও পাস হয়েছে। পরবর্তী সময়ে জনপ্রশাসন ও অর্থ মন্ত্রণালয় জনবল কেটে দিচ্ছে, যা তাদের দ্বৈত অবস্থান। এ অবস্থায় জনবলের বিষয়টি নিয়ে অর্থ সচিবকে অবহিত করা হলে তিনি পুনরায় আবেদন করার জন্য বলেছেন। সেই সঙ্গে বাজেটের কথা বিবেচনা করে পর্যায়ক্রমে তা দেয়া হবে বলেও জানানো হয়েছে। এ ধরনের প্রকল্পে প্রধানমন্ত্রীও জনবলের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার বিষয়ে গুরুত্ব দিয়েছেন বলে কমিটির বৈঠকে অবহিত করেন তিনি। কমিটির অবগতির জন্য জিয়াউল হাসান বলেন, ‘এ অবস্থায় জনগণকে সেবা প্রদানের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য চরমভাবে বিঘ্নিত হবে এবং গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি অব্যবহূত অবস্থায় থাকবে।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কমিটির সভাপতি ও সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী আ ফ ম রহুল হক বলেন, ‘অর্থ সাশ্রয়ের লক্ষ্যে জনপ্রশাসন বা অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে জনবল কমিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু কিছু কিছু কারিগরি বিষয় রয়েছে যেখানে পর্যাপ্ত জনবলের অভাবে জনগণ সেবা পাবে না, পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি ব্যবহার না করায় সেগুলো নষ্ট হয়ে যাবে। নিউক্লিয়ার মেডিসিন অ্যান্ড অ্যালায়েড সায়েন্সেস চিকিৎসাসেবায় পর্যাপ্ত জনবল না দেয়ায় কমিটির পক্ষ থেকে অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়েছে।’ তিনি বিষয়টির গুরুত্ব তুলে ধরে সচিব-কমিটিসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে যোগাযোগ অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান।
নিউক্লিয়ার টেকনোলজি ব্যবহার করে মানুষকে বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা দেয়ার জন্য ১৯৮০ সালে ইনস্টিটিউট অব পোস্ট গ্র্যাজুয়েট অ্যান্ড রিসার্চের (আইপিজিএমআর) আওতায় ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার মেডিসিন প্রথম স্থাপিত হয়। পরে ঢাকায় পরমাণু চিকিৎসা ইনস্টিটিউটের জন্য ভবন নির্মাণ ও আধুনিকীকরণ প্রকল্পের আওতায় এটি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ডি ব্লকে স্থানান্তর করা হয়। সেই সঙ্গে নাম পাল্টে রাখা হয় নিনমাস বা ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার মেডিসিন অ্যান্ড অ্যালায়েড সায়েন্সেস। সর্বাধুনিক পেট-সিটি, সিঙ্গেল ও ডাবল স্পেক্ট গামা ক্যামেরা সংযোজিত ইনস্টিটিউটটি বর্তমানে অনকোলজি, কার্ডিওলজি, নেফ্রোলজি এবং সেরিব্রাল স্ক্যানিংয়ের মতো পরীক্ষা করতে সক্ষম। এর মধ্যে পেট-সিটি দিয়ে প্রচুর রোগী বিশেষত ক্যান্সার আক্রান্তের রোগ শনাক্তের মাধ্যমে পরবর্তী চিকিৎসার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে নিনমাস। ১০-১৫ বছরের মধ্যে নিউক্লিয়ার মেডিসিন থেরাপি, টার্গেটেড রেডিওনিউক্লাইড থেরাপি, রেডিওফার্মেসি, পেট-রেডিওফার্মাসিউটিক্যালস, নিউক্লিয়ার, অন?কোলজি, পেডিয়াট্রিক নিউক্লিয়ার মেডিসিন, নিউক্লিয়ার নেফ্রোলজি ও নিউক্লিয়ার কার্ডিওলজি থেকেও অভূতপূর্ব উন্নতির লক্ষ্য। তাই এ খাতে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত জনবল তৈরির ওপর জোর দিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।










