চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তলদেশে দেশের প্রথম টানেল নির্মাণকাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। ৫ জুন পর্যন্ত সাড়ে ৯৭ শতাংশ কাজ শেষ করেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। তবে মূল প্রকল্প উন্নয়ন প্রস্তাবনা (ডিপিপি) সংশোধন করে স্ক্যানার বসানোর সিদ্ধান্তে নতুন করে ভূমি অধিগ্রহণে যেতে হচ্ছে সেতু কর্তৃপক্ষকে। এজন্য টানেলের দুই প্রান্তে প্রায় ৭ একর ভূমি সংগ্রহে জেলা প্রশাসকের কাছে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। 

কর্ণফুলী নদীর তলদেশে দেশের প্রথম বহুলেন টানেল নির্মাণ প্রকল্পটি কোনো ধরনের বাধা বা সময়ক্ষেপণ ছাড়াই এগিয়েছে। করোনাকালীন সংকটেও নির্মাণকাজ ছিল স্বাভাবিক। দুই বছর ধরে মাসভিত্তিক লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি অগ্রগতি ছিল কাজ বাস্তবায়নে। তবে শেষ মুহূর্তে এসে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন শেষে বাণিজ্যিক যান চলাচল পিছিয়ে যাচ্ছে। চলতি অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকের মধ্যেই টানেলটি যানবাহন চলাচলের জন্য খুলে দেয়ার কথা থাকলেও নিরাপত্তা ঝুঁকি কমানোর উদ্যোগে উদ্বোধন পেছানো হচ্ছে। মূল প্রকল্প প্রস্তাবনায় (ডিপিপি) ডিজাইন না থাকলেও নতুন করে যানবাহনের স্ক্যানার বসানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ফলে বাড়তি ভূমির প্রয়োজন দেখা দেয়ায় অধিগ্রহণ ছাড়া এসব যন্ত্র বসানোর সুযোগ নেই।

বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ (বিবিএ) সূত্রে জানা গেছে, টানেলের উভয় প্রান্তে পাঁচটি করে সর্বমোট ১০টি স্ক্যানার বসানো হবে। শুরুতে দুটি করে চারটি স্ক্যানার বসানোর চিন্তাভাবনা করছে বিবিএ। এ চারটি স্ক্যানার বসানোর মতো জমি টানেল কর্তৃপক্ষের রয়েছে। তবে বাড়তি ছয়টি স্ক্যানার বসাতে যে পরিমাণ ভূমির প্রয়োজন সেটি নেই। সর্বশেষ এপ্রিলে ৬ দশমিক ৯৩১ একর ভূমি নতুন করে অধিগ্রহণে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের কাছে প্রস্তাব পাঠিয়েছে সেতু বিভাগ। যাচাই-বাছাই শেষে এ পরিমাণ ভূমি অধিগ্রহণ করতে আরো কয়েক মাস লাগতে পারে বলে জানিয়েছেন প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা।

বিবিএ’র নথিপত্রে দেখা গেছে, টানেল বাস্তবায়নে এ পর্যন্ত ৩৬৫ দশমিক ৩৯১১ একর জমি অধিগ্রহণ শেষে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে বুঝিয়ে দিয়েছে সেতু কর্তৃপক্ষ। টানেলে যানবাহন প্রবেশের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিতে অত্যাধুনিক স্ক্যানার বসানোর উদ্যোগের পর আরো ৬ দশমিক ৯৩১ একর ভূমি অধিগ্রহণের প্রস্তাব করা হয়েছে। এগুলো বাস্তবায়ন করতে সময়ক্ষেপণ হওয়ায় সেপ্টেম্বরের মধ্যে টানেল উদ্বোধনের বিষয়টি শঙ্কার মধ্যে রয়েছে বলে মনে করছেন সেতু বিভাগের দায়িত্বশীলরা। তবে শুরুতে চারটি স্ক্যানার বসানোর মতো ভূমি টানেল কর্তৃপক্ষের রয়েছে বলে দাবি করেছেন সেতু বিভাগের কর্মকর্তারা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বঙ্গবন্ধু টানেলের প্রকল্প পরিচালক হারুনুর রশীদ চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘টানেল নির্মাণকাজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই সম্পন্ন করা হয়েছে। এখন বিভিন্ন প্রকৌশল কাজের জন্য শেষ মুহূর্তের সমন্বয় করা হচ্ছে। টানেলে স্ক্যানার বসানোর বিষয়টি আগে ছিল না। যার কারণে নতুন করে জমির প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। শুরুতে চারটি স্ক্যানার বসানোর মতো জমি থাকলেও বাড়তি ছয়টি স্ক্যানারের জন্য বাড়তি ভূমি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের মাধ্যমে অধিগ্রহণ করতে প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। আশা করি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ভূমি অধিগ্রহণ শেষে স্ক্যানার বসানোর মাধ্যমে বহুল প্রতীক্ষিত টানেল প্রকল্পটি চালু সম্ভব হবে।’ 

নির্মাণকাজ শেষে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি কিংবা মার্চ মাসের মধ্যেই প্রকল্পটি দিয়ে যানবাহন চলাচলের ঘোষণা দিয়েছিল সেতু কর্তৃপক্ষ বিবিএ। গত ২৬ এপ্রিল সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের আগামী সেপ্টেম্বরে টানেলটি উদ্বোধনের ঘোষণা দেন। বিশেষায়িত এ প্রকল্পে শুরুতে যানবাহনের নিরাপত্তায় স্ক্যানার বসানোর কথা ছিল না। তবে বাংলাদেশী বাস্তবতায় যুক্ত করা হয় স্ক্যানারসহ নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট একাধিক প্রযুক্তির ব্যবহার। যার কারণে ভৌত কাজ শেষ হওয়ার পরও অন্তত ছয় মাস যান চলাচল করবে না টানেল দিয়ে।

সেতু কর্তৃপক্ষ বলছে, মাটি বা নদীর তলদেশের মাটির ভেতর দিয়ে যানবাহন চলাচলের জন্য নির্মিত টানেল সেতু কিংবা সড়কের চেয়ে আলাদা। সড়ক কিংবা সেতুর ভৌত কাজ শেষ হলেই যানবাহন চলাচল করতে পারে। কিন্তু টানেল নির্মাণের পর সিভিল ওয়ার্কের সঙ্গে মেকানিক্যাল, ইলেকট্রিক্যাল কাজের সমন্বয় করতে হয়। মেকানিক্যাল ও ইলেট্রিক্যাল ওয়ার্কের আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি বসানোর (ইনস্টলেশন) পর প্রি-কমিশনিং করা হয়। এছাড়া টানেল অভ্যন্তরে ভেন্টিলেশন, ফায়ার ফাইটিং, মনিটরিং, ড্রেনেজ সিস্টেম সংযোজনের মাধ্যমে টানেল অভ্যন্তরে সাধারণ মানুষ ও যানবাহনের প্রবেশ সুরক্ষিত করা হয়। টানেলের ভৌত কাজ শেষ হওয়ার পর বাকি কাজ সম্পন্ন করা হচ্ছে। পাশাপাশি যানবাহন পরীক্ষা করতে স্ক্যানার বসানোর প্রস্তুতি চলছে। এসব কারণে শুরুতে চলতি অর্থবছরের মধ্যেই যানবাহন চলাচলের জন্য টানেল উন্মুক্ত করার কথা থাকলেও কিছুটা পিছিয়ে দেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে ভূমি অধিগ্রহণে বিলম্ব হলে উদ্বোধন শেষেও বাণিজ্যিকভাবে যানবাহন চলাচল শুরু করা বিলম্বিত হতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন সেতু বিভাগের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা।

শুরুতে কর্ণফুলী নদীর তলদেশে বহুলেন টানেল নির্মাণ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ৮ হাজার ৪৪৬ কোটি টাকা। প্রকল্পের মেয়াদ ছিল ২০২০ সালের নভেম্বর পর্যন্ত। ২০১৮ সালের নভেম্বরে প্রথম সংশোধীতে ব্যয় বাড়িয়ে ১০ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা ও মেয়াদ ২০২২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়। চলতি বছরের ১৭ জানুয়ারি একনেকে প্রকল্পটির দ্বিতীয় সংশোধনী পাস হয়। নতুন মেয়াদে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন ব্যয় ধরা হয়েছে ১০ হাজার ৬৮৯ কোটি ৭১ হাজার ৩৩ টাকা। অর্থাৎ দ্বিতীয় সংশোধনীতে কর্ণফুলী নদীর তলদেশে বহুলেন সড়ক টানেল নির্মাণ প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে ৩১৫ কোটি ২৮ লাখ ৯৩ হাজার টাকা। এর মধ্যে বাংলাদেশ সরকার ব্যয় করছে ৪ হাজার ৬৯৯ কোটি ৭০ লাখ ৬৬ হাজার টাকা এবং চায়না এক্সিম ব্যাংক ব্যয় করছে ৬ হাজার ৭০ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। সর্বশেষ সংশোধনীতে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।

এর আগে ২০২২ সালের ২৬ নভেম্বর প্রথম টানেল টিউবের উদ্বোধন করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ওই সময়ে টানেলটি সব কাজ শেষে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে চালুর কথা ছিল। টানেলটি চালু হলে চট্টগ্রামের সঙ্গে দক্ষিণ চট্টগ্রামের সরাসরি সংযোগ ঘটবে। টানেলটি চট্টগ্রাম তথা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করবে বলে আশা করছে সেতু কর্তৃপক্ষ। টানেলটির মোট দৈর্ঘ্য হচ্ছে ৩ দশমিক ৩২ কিলোমিটার, ভায়াডাক্ট ৭২৭ মিটার এবং সংযোগ সড়কের দৈর্ঘ্য ৫ দশমিক ৩৫ কিলোমিটার।