সাভার চামড়া শিল্পনগরীর ৬০ শতাংশ ট্যানারিই ভাড়াভিত্তিক বলে জানিয়েছে এ শিল্পনগরী বাস্তবায়নকারী সংস্থা বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)। সংস্থাটি বলছে, যেসব ট্যানারি মালিককে এসব প্লট বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল, তারা নিজেরা কার্যক্রম না চালিয়ে অন্যদের ভাড়া দিয়েছেন। দেখা গেছে, যারা ভাড়া নিয়ে কার্যক্রম চালাচ্ছে তারা নিজস্ব প্লট ব্যবহারকারী ট্যানারি মালিকদের তুলনায় চার গুণেরও বেশি পরিবেশ দূষণ করছে। ফলে ট্যানারিগুলোর প্লট বরাদ্দ বাতিল করে নতুন ট্যানারি শিল্প স্থাপনকারী উদ্যোক্তাদের অনুকূলে প্লট বরাদ্দের সিদ্ধান্ত নিয়েছে শিল্প মন্ত্রণালয়।
অন্যদিকে, সঠিকভাবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা না করায় সাভারের চামড়া শিল্পনগরী বন্ধ করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। গত ২৯ নভেম্বর পরিবেশ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। পরিবেশ দূষণের দায়ে এটি বন্ধ করতে এখন শিল্প মন্ত্রণালয়কে চিঠি পাঠাবে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়। এ অবস্থায় অস্তিত্বের সংকটে পড়তে চলেছে শিল্পনগরীটি।
সম্প্রতি চামড়া শিল্প খাতের উন্নয়নে এ খাতসংশ্লিষ্টদের নিয়ে বৈঠক করেন শিল্প সচিব জাকিয়া সুলতানা। সভায় বিসিক জানায়, শিল্পনগরীতে ১৫৪টি ট্যানারিকে প্লট দেয়া হয়। এর মধ্যে বর্তমানে ১৩২টি প্লট চালু রয়েছে। এসব প্লটের ৬০ শতাংশ অর্থাৎ ৭৯টি প্লটই ভাড়া ভিত্তিতে চলছে। অর্থাৎ যেসব ট্যানারি মালিকদের এসব প্লট বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল তারা নিজেরা কার্যক্রম না চালিয়ে অন্যদের ভাড়া দিয়েছেন। দেখা গেছে, যারা ভাড়া নিয়ে কার্যক্রম চালাচ্ছে তারা নিজস্ব প্লট ব্যবহারকারী ট্যানারি মালিকদের তুলনায় চার গুণেরও বেশি পরিবেশ দূষণ করছে। ব্যবসায়ীদের অসহযোগিতার কারণে এসব ট্যানারি মালিকদের চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায়ও আনা যাচ্ছে না। সভার কার্যপত্র সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
গত ২৩ আগস্ট জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠক থেকে সঠিকভাবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা না করায় সাভারের চামড়া শিল্পনগরী বন্ধ করে দেয়ার প্রথম সুপারিশ আসে। সংসদীয় কমিটির পক্ষ থেকে মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়, এ শিল্পনগরীতে দৈনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা ২৫ হাজার ঘনমিটার। অথচ সেখানে এখন প্রতিদিন ৪০ হাজার ঘনমিটার বর্জ্য উৎপাদন হয়। অর্থাৎ দৈনিক ১৫ হাজার ঘনমিটার বর্জ্য পরিবেশে মিশছে। সব মিলিয়ে গত তিন বছরে ১ কোটি ৬৪ লাখ ঘনমিটার বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বাইরে থেকে গেছে, যা পরিবেশকে দূষিত করেছে। সাভারে শুধু তরল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করা যায়। হেভি মেটাল ও ক্রোমিয়াম বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কোনো ব্যবস্থাই সেখানে নেই। ফলে পরিবেশের ক্ষতির মাত্রাও অনেক বেশি।
বিসিক বলছে, সাভার শিল্পনগরীর ভাড়াভিত্তিক ট্যানারিগুলো কোনো নিয়মনীতি মানে না। যেহেতু তারা মূল মালিক না, সেহেতু তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থাও গ্রহণ করা যায় না। এসব ট্যানারি ভাড়া ভিত্তিতে পরিচালিত হওয়ায় সরকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলেও উল্লেখ করে বিসিক।
এছাড়া ভাড়াভিত্তিক ট্যানারিগুলো অন্যান্য ট্যানারির তুলনায় চার গুণেরও বেশি পানি ব্যবহার করে। তাই কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার বা সিইটিপির কার্যক্ষমতা ব্যাহত হয়। বিসিক আরো জানায়, ভাড়ায় চালিত ট্যানারিগুলো যদি লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপের (এলডব্লিউজি) স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী পানি ব্যবহার করত, তাহলে সিইটিপি ওভার-ফ্লো রোধ করা সম্ভব হতো। ব্যবসায়ীদের অসহযোগিতার কারণে কারা বরাদ্দ পাওয়া প্লটগুলো ভাড়া দিয়েছেন, তা চিহ্নিত করা যায়নি বলেও জানিয়েছে বিসিক।
এ পরিপ্রেক্ষিতে সভায় শিল্প সচিব জাকিয়া সুলতানা ভাড়াভিত্তিক পরিচালিত ট্যানারিগুলোকে শাস্তির আওতায় আনতে বিসিক চেয়ারম্যানকে নির্দেশ দেন। এছাড়া সভায় সিদ্ধান্ত হয়, বিধিবহির্ভূতভাবে ভাড়াভিত্তিক পরিচালিত ট্যানারিগুলোর বরাদ্দ বাতিল করে নতুন ট্যানারি শিল্প স্থাপনকারী উদ্যোক্তাদের অনুকূলে প্লটগুলো বরাদ্দ দেয়া হবে। এছাড়া ট্যানারি মালিকদের পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র প্রদানের বিষয়টি দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে হবে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে চামড়া শিল্পনগরীর প্রকল্প পরিচালক জিতেন্দ্র নাথ পাল বণিক বার্তাকে বলেন, ভাড়া ভিত্তিতে যেসব ট্যানারি পরিচালিত হয়, তাদের কোনো দরদ থাকে না। তাই তারা প্রয়োজনের অতিরিক্ত পানি ব্যবহার করে। ফলে সিইটিপির কার্যক্ষমতা ব্যাহত হয়।
এতদিন এদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা কেন গ্রহণ করা হয়নি জানতে চাইলে এ পরিচালক বলেন, দেখা গেছে কিছুদিন প্লট মালিক নিজেই ব্যবহার করেন, আবার কিছুদিন ভাড়া দেন। এভাবে ট্যানারিগুলো পরিচালিত হয়। ফলে তাদের সহজে চিহ্নিত করা সম্ভব হয় না।
পরিবেশ দূষণের দায়ে সাভার চামড়া শিল্পনগরীটি বন্ধ করতে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের চিঠি এখনো পাননি বলে জানান জিতেন্দ্র নাথ পাল। বন্ধ করে দেয়া কোনো সমাধান হতে পারে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বর্তমানে শিল্পনগরীর দূষণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ভালো। বন্ধ না করে বরং পরিবেশ দূষণ যেন না হয়, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি। এরই মধ্যে সিইটিপি ১০০ শতাংশ কার্যকর করা সম্ভব হয়েছে বলেও জানান তিনি।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান শাহীন আহমেদ বলেন, বিসিকের পক্ষ থেকে ৬০ শতাংশ ট্যানারিকেই ভাড়াভিত্তিক বলা হলেও সেটি আসলে ঠিক নয়। তবে এটা ঠিক যে কিছুসংখ্যক ভাড়াভিত্তিক ট্যানারি রয়েছে। সরকার যদি সেগুলোকে চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়, তাহলে আমরা সরকারকে সহযোগিতা করব।
শিল্পনগরী বন্ধ করে দেয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মাথা ব্যথা হলে মাথা কেটে ফেলা তো কোনো সমাধান নয়। আগে যখন হাজারীবাগে ট্যানারি ছিল, তখন সব ধরনের বর্জ্য সরাসরি বুড়িগঙ্গায় ফেলা হতো। এখন আমরা একটা ব্যবস্থাপনার মধ্যে চলে এসেছি। হয়তো কিছু সময়ে ওভারলোডের কারণে বর্জ্য নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না। কিন্তু একটা পরিকল্পনা করে কার্যক্রম হাতে নিলে শতভাগ বর্জ্য নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। বন্ধ না করে কীভাবে পরিপূর্ণ পরিবেশ দূষণ রোধ করা যায়, সেদিকেই এগোনোর আহ্বান জানান এ ব্যবসায়ী নেতা।










