ব্রিটিশ ভারতে চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম পরিচালিত হতো আসাম বেঙ্গল রেলওয়ের মাধ্যমে। দ্য চিটাগং পোর্ট অ্যাক্টের আওতায় রেল থেকে আলাদা করে ১৯৬০ সালে স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান হিসেবে সমুদ্রবন্দরটির আত্মপ্রকাশ। ওই সময় বন্দরকে দেয়া হয় রেলওয়ের ৪৭০ দশমিক ৫২ একর জমি। এত বছর পর এসেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ভূমি নিয়ে সরকারের এ দুই সংস্থার মধ্যে চলছে দ্বন্দ্ব। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (চবক) সম্প্রতি দুটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে তাদের ভূমি ইজারা দিলে সেই দ্বন্দ্ব আরো প্রকট হয়ে দেখা দেয়।  

জানা যায়, বন্দরের ভূমিতে নিজস্ব অবকাঠামো নির্মাণ কিংবা লিজ দেয়া হলে সেটি নিজেদের দাবি করে আসছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। সম্প্রতি এ ধরনের বিরোধের পরিপ্রেক্ষিতে উভয় সংস্থা বৈঠকে বসে। কিন্তু কোনো নিষ্পত্তি হয়নি। শীর্ষ পর্যায়ের ওই বৈঠকে বন্দর কর্তৃপক্ষ নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করলেও রেলওয়ে তাদের পক্ষে উল্লেখযোগ্য কোনো নথিপত্র দেখাতে পারেনি। উল্টো বন্দর কর্তৃপক্ষকে তারা এ বিষয়ে মামলা করার হুঁশিয়ারি দিয়েছে।  

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের দাবি, ১৯০৮ সালে অধিগ্রহণের সময় পূর্ব পাকিস্তান রেলওয়ের সিএস খতিয়ানভুক্ত ২৭ দশমিক ১৯৪ একর জমির মধ্যে ঢেবার (বৃহৎ জলাধার) পূর্ব-উত্তর ও দক্ষিণ পাশের ৯ দশমিক ৯৬৫ একর রেলওয়েকে এবং ১৭ দশমিক ২২৫ একর জমি চট্টগ্রাম বন্দর বরাবর হস্তান্তর করা হয়। দ্য চিটাগাং পোর্ট অ্যাক্ট ১৯১৪ (৩০ জুন, ১৯৬০ সালে গেজেট আকারে প্রকাশিত)-এর তৃতীয় তফসিলের চতুর্থ অংশে ‘ইমপ্রুভাল প্রভার্টি টান্সফারেড ফ্রম পোর্ট রেলওয়ে চিটাগাং টু দ্য পোর্ট ট্রাস্ট, চিটাগাং’ শিরোনামে চবকের সম্পত্তির হিসাবে রয়েছে। বিএস জরিপেও বন্দরের নামে এসব জমি নথিভুক্ত। এসব জমির ভূ-উন্নয়ন করও পরিশোধ করছে চবক। ফলে ঢেবারপাড়ের জমি নিয়ে রেলওয়ের বক্তব্য সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। 

এ বিষয়ে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা সুজন চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বন্দরের সঙ্গে ভূমি ভাগাভাগির সময় ঢেবারপাড়ের জমিগুলো পড়ে রেলওয়ের ভাগে। অথচ বন্দর কর্তৃপক্ষ রেলওয়ের মালিকানার জমি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা দিয়ে দিচ্ছে। আগ্রাবাদ এলাকায় ভূমির একাংশ বিএস জরিপে ভুলবশত বন্দরের নামে চলে যাওয়ায় রেলওয়ে এরই মধ্যে বিএস সংশোধনের মামলা করেছে। ভূমিবিরোধ নিয়ে একটি মামলা চলমান থাকার পরও বন্দরের এমন কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে নতুন করে আইনি প্রক্রিয়ার দিকে হাঁটছে রেলওয়ে। বেআইনিভাবে রেলওয়ের জমি ইজারার বিরুদ্ধে শিগগিরই মামলা করা হবে।’ 

রেলওয়ের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, মাটি কাটার জন্য আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে ১৯০৮ সালে গোসাইলডাঙ্গা মৌজার ২৭ দশমিক ১৯৪ একর ভূমি অধিগ্রহণ করে। ওই জমি ১৯৩৪ সালের আরএস ৯৩৭ নম্বর খতিয়ানে আসাম বেঙ্গল রেলওয়ের নামে এবং ১৯৬৪ সালের পিএস/এসএ ০৫ নম্বর খতিয়ানে ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ের নামে রেকর্ডভুক্ত হয়। বাংলাদেশ জরিপে জমিটি বিএস ১৬/১ নম্বর খতিয়ানে দাগ নং-বিএস ২৪২৯, বিএস ২৪৩০, বিএস ২৪৩১, বিএস ২৪৩২ এবং বিএস ৪৫১৬ দাগে মোট ১৮ দশমিক ৯২ একর চবকের নামে রেকর্ডভুক্ত হয়। সেখান থেকে ৯ দশমিক ৫ কাঠা বা ১৫ দশমিক ৬৮ শতাংশ জমি ২০২২ সালের ২৩ নভেম্বর চবি অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনকে লিজ দেয় বন্দর কর্তৃপক্ষ। এর আগে এক্স-ক্যাডেট অ্যাসোসিয়েশনকে ইজারা দেয়া হয় ১০ কাঠা বা ১৬ দশমিক ৫৩ শতাংশ জমি। রেলওয়ে সেই জমিকে নিজেদের দাবি করছে।        

রেলওয়ে ও চবকের মধ্যে সেই ভূমি বিরোধ নিয়ে চট্টগ্রামের তৃতীয় যুগ্ম জেলা জজ আদালতে ৪৩/২০০৭ নম্বর রেকর্ড সংশোধন মামলা বিচারাধীন, যা সাক্ষী পর্যায়ে রয়েছে। এক্ষেত্রে চবি অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনকে ইজারা দেয়া জমি নিয়ে রেলওয়ের সঙ্গে বন্দরের মামলা নেই বলে স্বীকার করেছে রেলওয়ের ভূ-সম্পত্তি বিভাগ। 

চবক অবশ্য বলছে, রেলওয়ে-বন্দর একক প্রতিষ্ঠান থানাকালীন পানি সরবরাহের জন্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে বেশ কয়েকটি বৃহৎ জলাধার ও কৃত্রিম হ্রদ তৈরি করা হয়। দুটি প্রতিষ্ঠান আলাদা হয়ে যাওয়ার সময় আগ্রাবাদ ঢেবা ছাড়া সব জলাধার ও হ্রদ দেয়া হয়েছিল রেলওয়েকে। আগ্রাবাদ ঢেবার সুপেয় পানি চট্টগ্রাম বন্দরে আসা বিদেশী জাহাজে সরবরাহ করা হতো। সত্তরের দশকে চট্টগ্রাম ওয়াসা প্রতিষ্ঠার পর আগ্রাবাদ ঢেবা থেকে চবক পানি সংগ্রহ কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। এ কারণে রেলওয়ে সম্পূর্ণ ঢেবাটি নিজেদের দাবি করে মামলা দায়ের ছাড়াও চবকের মালিকানা অস্বীকার করছে। যদিও আগের একাধিক বৈঠক এবং সর্বশেষ বৈঠকেও রেলওয়ে ভূমির মালিকানা বিষয়ে পর্যাপ্ত কোনো নথিপত্র পেশ করতে পারেনি বলে দাবি করেন চট্টগ্রাম বন্দরের শীর্ষ কর্মকর্তারা। 

রেলওয়ের আপত্তিকে সম্পূর্ণ অমূলক ও ভিত্তিহীন দাবি করে চবকের ভূ-সম্পত্তি বিভাগের ডেপুটি ম্যানেজার জিল্লুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ঢেবারপাড়ের জমি নিয়ে রেলওয়ে যে দাবি তুলেছে সেটি কোনোভাবেই যৌক্তিক ও আইনত প্রমাণিত নয়। ঢেবাসংলগ্ন ১৭ দশমিক ২২৫ একর ভূমি বন্দরের নামে রয়েছে। বন্দর ভূ-উন্নয়ন করও পরিশোধ করছে। এর পরও রেলওয়ে ঢেবার জলাধারটির বড় একটি অংশ দখল করে রেখেছে। আমরা এক পাড়ের স্বল্প পরিমাণ জমি বেসরকারি সংস্থার কাছে ইজারা দিয়েছি। রেলওয়ে এর মধ্যে একটি দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের আয়োজন করে। সেখানে সার্বিক বিষয়ে আলোচনা হলেও তারা প্রয়োজনীয় কোনো দলিলপত্র উত্থাপন করতে পারেনি। এ কারণে আগামীতে রেলওয়ের দখলে থাকা ঢেবার অন্যান্য অংশও দখলমুক্ত করে বন্দরের অধীনে নিয়ে আসার কার্যক্রম শুরু করা হবে।’ 

এদিকে চবকের দেয়া ভূমি ইজারা নিয়ে রেলওয়ে আপত্তি তোলায় ঢেবার নিজ মালিকানায় থাকা জলাধারটিও নিজেদের দখলে নেয়ার কার্যক্রম শুরু করেছে বন্দর। ১৯৮৩ সাল থেকে রেলওয়ে ঢেবার উত্তর ও পশ্চিম পাড়ে ৭৯টি অনুমোদিত মাস্টারপ্ল্যানভুক্ত বাণিজ্যিক প্লটের লিজ আদায় করছে। ঢেবা (১৯ দশমিক ৭৮ একর) তথা জলাধারটিও রেলওয়ের মাধ্যমে বেসরকারি উদ্যোক্তার কাছে লিজ দেয়া রয়েছে।