দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে আইসিটি শিল্পের বিকাশ ও উদ্যোক্তা সৃষ্টির লক্ষ্যে যশোরে শেখ হাসিনা সফটওয়্যার টেকনোলজি (হাই-টেক) পার্কটির যাত্রা হয় ২০১৭ সালের ১০ ডিসেম্বর। শুরুতে অনেক উদ্যোক্তা বড় স্বপ্ন নিয়ে এ পার্কে বিনিয়োগ করেছিলেন। কিন্তু দক্ষ জনবলের অভাব, ইজারামূল্য নিয়ে বিরোধ, উচ্চ ইন্টারনেট ও বিদ্যুৎ সেবা না থাকায় বাড়েনি ব্যবসার পরিধি। তাই মাত্র তিন বছরের মাথায় পার্ক ছেড়েছে ১৭টি প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে যে কয়টি প্রতিষ্ঠান পার্কে রয়েছে, তাদের ব্যবসায়ও চলছে মন্দা।

বিনিয়োগকারীরা বলছেন, সরকার যেসব স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ দেয়, তাতে কোনো দক্ষ কর্মী তৈরি হয় না। ২০১৭ সালে যশোর পার্কে বেশ আয়োজন করে চাকরি মেলা করা হয়েছিল। চাকরিপ্রার্থীদের বিপুল আবেদন জমা পড়ে। কিন্তু সেখান থেকে জনবল তৈরি হয়নি।

সে সময়ে যশোর পার্কের প্রকল্প পরিচালক ছিলেন বর্তমান যুগ্ম সচিব মো. জাহাঙ্গীর আলম (বর্তমানে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে কর্মরত)। তিনি বলেন, অনেক তরুণ সাড়া দিয়েছিলেন। কিন্তু যেহেতু এটা তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ের, তাই সবার আবেদন নেয়া সম্ভব হয়নি।

পার্ক ছেড়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আপন ফ্রিডম, ওয়াটার স্প্রিড অন্যতম। এসব প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা জানান, তারা যে প্রত্যাশা নিয়ে পার্কে বিনিয়োগ করেছিলেন, তা পূরণ হয়নি। এর মধ্যে একটি বড় সমস্যা দক্ষ জনবল না পাওয়া। ইজারামূল্য নিয়ে বিরোধ, উচ্চগতির ইন্টারনেট, বিদ্যুৎ সেবা না থাকায় ব্যবসার পরিধি বাড়েনি। পার্কের নানা সংকটের সমাধান চেয়ে ২২ ডিসেম্বর জেলা প্রশাসক তমিজুল ইসলাম খানের মাধ্যমে আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের কাছে স্মারকলিপি দেন বিনিয়োগকারীরা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, যশোর শহরের নাজির শঙ্করপুর এলাকায় ১২ একরের কিছু বেশি জমিতে পার্কটি নির্মাণে সরকারের ব্যয় হয় ৩০৫ কোটি টাকা। এটি চালুর আগে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ গণমাধ্যমে বলেছিলেন, যশোর হাই-টেক পার্ক হবে শিক্ষিত বেকার যুবকদের স্বপ্নের কর্মস্থল। কিন্তু পার্কটি উদ্বোধনের তিন বছর পার হলেও কোনো কাজে আসেনি। এখন সেটি ভবনসর্বস্ব। কোনো বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান তো আসেনি, বরং যারা ছিল তারা চলে যাচ্ছে। আইটি পার্কটি ভাড়া দেয়া হচ্ছে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের জন্য।

সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, শেখ হাসিনা সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্কে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে রয়েছে দৃষ্টিনন্দন ও সুউচ্চ দুটি ভবন। এর একটি মূল ভবন ও অন্যটি আবাসন সুবিধার জন্য নির্মাণ করা। এর বাইরে রয়েছে আরো দুটি ভবন। সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক এলাকার মধ্যেই একপাশে স্থাপন করা হয়েছে জাতীয় ডাটা সেন্টারের ডিজাস্টার রিকভারি সেন্টার। ১৫ তলাবিশিষ্ট মূল ভবনে গিয়ে দেখা যায়, বিভিন্ন তলার অধিকাংশ স্থান এখনো অব্যবহূত পড়ে আছে।

বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হোসনে আরা বেগম বলেন, যশোর শেখ হাসিনা সফটওয়ার পার্কে বিনিয়োগকারীদের নানা চাহিদা আছে। ভাড়া মওকুফ, বিদ্যুৎ বিল মওকুফসহ অনেক কিছুই তারা দাবি করছেন। বিনিয়োগকারীদের সব চাওয়া সঠিক নয়।

হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ জানায়, এখন পর্যন্ত যশোর হাই-টেক পার্কে বিনিয়োগ এসেছে প্রায় ৬০ কোটি টাকা। পার্কটি ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান টেক সিটি জানায়, সেখানে ৫০টি প্রতিষ্ঠান জায়গা বরাদ্দ নিয়েছে। এর মধ্যে কার্যক্রমে রয়েছে ৩২টি।

পার্কটির মূল ১৫ তলা ভবনে ১ লাখ ৩৭ হাজার বর্গফুট জায়গা ইজারাযোগ্য। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা দেয়া হয়েছে প্রায় ৯৫ হাজার বর্গফুট। তিনটি প্রতিষ্ঠান প্রায় ১০ হাজার বর্গফুট জায়গা নিয়ে ফেলে রেখেছে। ফলে ৩৮ শতাংশ জায়গা এখনো খালি রয়েছে।

পার্কসংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, পার্কটিতে বিদেশী কোনো বিনিয়োগ নেই। ডেসটিনি আইএনসি ডট নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে জাপানি বিনিয়োগকারী হিসেবে উল্লেখ করা হয়। যদিও প্রতিষ্ঠানটির মালিক জাপান প্রবাসী বাংলাদেশী।

যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য আবদুস সাত্তারের এন সলিউশন নামে একটি প্রতিষ্ঠান আছে যশোর হাই-টেক পার্কে। তিনি বলেন, ‘ভেবেছিলাম বিদেশী প্রতিষ্ঠানগুলো যশোর হাই-টেক পার্কে বিনিয়োগ করবে। তাদের মাধ্যমে আমরাও শিখব। কিন্তু কিছুই হয়নি।’

যশোর হাই-টেক পার্কটিকে ১৫ বছরের জন্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে টেকসিটি বাংলাদেশ নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে। তাদের নিয়ে বিনিয়োগকারীদের নানা অভিযোগ রয়েছে। অন্যতম হলো ইজারামূল্য। কোনো প্রতিষ্ঠানের বর্গফুটপ্রতি ১৮ টাকা, কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ২২ টাকা ভাড়া নেয়া হয় বলে অভিযোগ। ছয়টি প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্যদের ভাড়া চার মাসের বেশি বকেয়া রয়েছে। অবশ্য যারা হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ইজারা নিয়েছিল, তাদের ভাড়া পড়েছে বর্গফুটপ্রতি ১৪ টাকা।

মাইলাইটহোস্টের স্বত্বাধিকারী রকিবুর রহমান বলেন, অন্যদের চেয়ে আমাদের বেশি ভাড়া পরিশোধ করতে হচ্ছে। চুক্তির মেয়াদও দুই বছর, যেখানে তাদের সঙ্গে বিএইচটিপিএ চুক্তি করেছে পাঁচ বছর মেয়াদে। এসব বিষয় নিয়ে কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও এখন পর্যন্ত কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।

টেকসিটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ওয়াহিদুর রহমান বলেন, যেসব চিন্তাভাবনা মাথায় রেখে হাই-টেক পার্কের সঙ্গে চুক্তি হয়েছিল, তার সঙ্গে বাস্তবতার অনেক পার্থক্য। এত বড় একটা অবকাঠামোর ব্যবস্থাপনার খরচ অনেক। বিনিয়োগকারীদের অনেকে ভাড়া দিচ্ছেন না। তাদের কাছে কমপক্ষে ৭০ লাখ টাকা ভাড়া বাকি।