জুলাইয়ে বিভিন্ন দেশের কারখানায় নতুন পণ্যের চাহিদা ও ক্রয়াদেশ কমেছে। একই সময় বেড়েছে উৎপাদন উপকরণের দাম। বিশেষ করে জ্বালানির খরচ বাড়ায় চাপ বেড়েছে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও। খবর দ্য স্ট্রেট টাইমস।
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি চীনের উৎপাদন খাতেও এ পরিস্থিতির প্রভাব দেখা গেছে। জুলাইয়ে দেশটির কারখানাগুলোয় নতুন পণ্যের ক্রয়াদেশ বাড়ার গতি কমে জানুয়ারির পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশের কারখানায়ও চাহিদার দুর্বলতা দেখা গেছে।
গত পাঁচ মাস চলা মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি রফতানির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ এটি। ফলে এ জলপথে পণ্য পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় জ্বালানি বাজারে চাপ তৈরি হয়েছে। এতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের উৎপাদক প্রতিষ্ঠানের জ্বালানি ব্যয় বেড়েছে।
বিভিন্ন দেশের পারচেজিং ম্যানেজার্স ইনডেক্স বা পিএমআই জরিপে চলতি সপ্তাহে এ চিত্র উঠে এসেছে। এসব সূচক থেকে উৎপাদন খাতের কার্যকলাপ, নতুন ক্রয়াদেশ ও ব্যয়ের গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। জুলাইয়ের তথ্য বলছে, বিশ্ব অর্থনীতিতে উৎপাদন খাত এখনো পুরোপুরি থমকে যায়নি। তবে চাহিদার দুর্বলতা ও ব্যয় বাড়ায় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউরোজোনের উৎপাদন খাতে অবশ্য জুলাইয়ে কিছুটা গতি দেখা গেছে। এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল ইউরোজোন ম্যানুফ্যাকচারিং পিএমআই জুলাইয়ে বেড়ে ৫১ দশমিক ৯ পয়েন্টে উঠেছে। জুনে এ সূচক ছিল ৫১ দশমিক ৪ পয়েন্ট। এপ্রিলের পর এটি ইউরোজোনের উৎপাদন খাতের সর্বোচ্চ পিএমআই। তবে প্রাথমিক হিসাবে সূচকটি ৫২ পয়েন্ট হবে বলে ধারণা করা হয়।
স্বল্পমেয়াদে ইউরোজোনের অর্থনীতিতে দুর্বল হলেও তুলনামূলক স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধি থাকতে পারে বলে মনে করেন তিনি। তবে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির বড় ধরনের অবনতি হলে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আরো খারাপ হতে পারে।
এদিকে ইউরোজোনে মূল্যস্ফীতিও বেড়েছে। জুলাইয়ে অঞ্চলটির মূল্যস্ফীতি বেড়ে ২ দশমিক ৯ শতাংশ হয়েছে। জুনে ছিল ২ দশমিক ৮ শতাংশ। মূল্যস্ফীতি বাড়ায় ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের (ইসিবি) সুদহার আরো বাড়ানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
ইউরোপের সবচেয়ে বড় অর্থনীতি জার্মানির উৎপাদন খাতে জুলাইয়ে ইতিবাচক গতি দেখা গেছে। তৃতীয় প্রান্তিকের শুরুতে দেশটির উৎপাদন কার্যক্রম বেড়েছে। তবে এ গতি দীর্ঘস্থায়ী হবে কিনা, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
এশিয়ার আরেক বড় অর্থনীতি ভারতের উৎপাদন খাতেও চাহিদার দুর্বলতা দেখা গেছে। আগের প্রকাশিত পিএমআই তথ্য অনুযায়ী, দেশটির উৎপাদন খাতের প্রবৃদ্ধি প্রায় পাঁচ বছরের মধ্যে সবচেয়ে ধীর ছিল গত মাসে।
অর্থাৎ বিশ্বের বড় অর্থনীতিগুলোর একটি অংশে একই সময় চাহিদার দুর্বলতা দেখা গেছে।
তবে এর বিপরীত চিত্র দেখা গেছে জাপানে। দেশটির কারখানার উৎপাদন জুলাইয়ে ১২ বছরের বেশি সময়ের মধ্যে সবচেয়ে দ্রুত বেড়েছে। প্রায় সাড়ে চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ গতিতে নতুন ক্রয়াদেশ বেড়েছে জাপানে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পর্কিত (এআই) পণ্যের বাড়তি চাহিদা এ প্রবৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সব দেশের জন্যই জ্বালানি ব্যয় এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও অন্যান্য জ্বালানি পণ্যের দামে চাপ অব্যাহত আছে। এর প্রভাব পড়ছে কারখানার উৎপাদন ব্যয়ে।
উৎপাদন ব্যয় বাড়লে প্রতিষ্ঠানগুলোর মুনাফার ওপর চাপ তৈরি হয়। অনেক ক্ষেত্রে বাড়তি ব্যয় পণ্যের দামে যোগ করতে হয়। এতে ভোক্তা পর্যায়ে পণ্যের দাম বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। আবার চাহিদা দুর্বল থাকলে কোম্পানিগুলো পুরো বাড়তি ব্যয় ক্রেতার ওপর চাপিয়ে দিতে পারে না। ফলে মুনাফাও কমে যেতে পারে।
আগামী মাসগুলোয় জ্বালানি দামের গতিপথ ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি বিশ্ব শিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। যুদ্ধ দীর্ঘ হলে জ্বালানি সরবরাহ ও পরিবহন ব্যয়ের ওপর চাপ আরো বাড়তে পারে। একই সঙ্গে নতুন অর্ডার ও ভোক্তা চাহিদা কমে গেলে উৎপাদন খাতের প্রবৃদ্ধিও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।










