কার্ড ব্যবহার করে গ্রাহকরা বিদেশ গিয়ে নগদ অর্থ বেশি তুলেছেন—এমন অজুহাতে বিদেশে কার্ড ব্যবহার করে নগদ অর্থ উত্তোলন বন্ধ করে দিয়েছে ব্র্যাক ব্যাংক। ব্যাংকের পক্ষ থেকে গত রোববার গ্রাহকদের মোবাইল ফোনে পাঠানো মেসেজের মাধ্যমে এ সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। দ্বৈত মুদ্রার ডেবিট কার্ডের পাশাপাশি ক্রেডিট কার্ড গ্রাহকদের ক্ষেত্রেও একই নীতি গ্রহণ করেছে বেসরকারি ব্যাংকটি।
কার্ড ব্যবসার সামনের সারিতে থাকা অন্যান্য ব্যাংকও এখন ব্র্যাক ব্যাংকের দেখানো পথে হাঁটতে পারে বলে আভাস পাওয়া গেছে। এরই মধ্যে কয়েকটি ব্যাংকের গ্রাহকরা জানিয়েছেন, বিদেশে ব্যাংকগুলোর কার্ড ব্যবহার করে নগদ অর্থ উত্তোলন করা যাচ্ছে না। কোনো ধরনের পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই ব্যাংকগুলোর বিদেশে কার্ড দিয়ে নগদ উত্তোলন বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট গ্রাহকরা।
বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশের ডলার সংকট নিয়ে বিদেশীরা এমনিতেই উদ্বিগ্ন। এ অবস্থায় কার্ডে নগদ উত্তোলন বন্ধ হলে তাদের কাছে দেশের অর্থনীতি নিয়ে ভুল বার্তা যেতে পারে। এক্ষেত্রে এমন ধারণা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা আছে যে বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর এখন ক্রেডিট কার্ডের লেনদেন পরিশোধেরও সামর্থ্য নেই।
বাংলাদেশীদের বিদেশে ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে নগদ উত্তোলনের প্রবণতা তুলনামূলক কম। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, দেশের মোট বৈদেশিক লেনদেনে কার্ডে নগদ উত্তোলনের ভাগ একেবারেই ক্ষুদ্র ভগ্নাংশ মাত্র। আবার দেশের ব্যাংকগুলোর ইস্যুকৃত কার্ডে মোট লেনদেনেও এর অংশ খুবই কম। চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে ক্রেডিট কার্ডে মোট লেনদেন ছিল ২ হাজার ৫৬৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে বিদেশে নগদ উত্তোলন হয়েছিল মাত্র ২০ কোটি টাকা। অর্থাৎ ক্রেডিট কার্ডে বাংলাদেশীদের মোট লেনদেনে (দেশে ও দেশের বাইরে) বিদেশে নগদে উত্তোলনের অবদান ১ শতাংশেরও কম।
একই পরিস্থিতি ডেবিট কার্ডের ক্ষেত্রেও। দেশের ব্যাংকগুলোর ইস্যুকৃত ডেবিট কার্ডের মধ্যে খুবই অল্প পরিমাণ কার্ডে ডুয়াল কারেন্সি বা দ্বৈত মুদ্রায় ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে ডেবিট কার্ডের মাধ্যমে দেশে-বিদেশে মোট লেনদেন ছিল ৩৬ হাজার ৭৫৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে মাত্র ৯০ কোটি টাকা বিদেশে নগদ উত্তোলন করা হয়েছে। অর্থাৎ মোট লেনদেনের দশমিক ২৪ শতাংশ অর্থ বিদেশে নগদ উত্তোলন করা হয়েছে। দেশের ব্যাংক খাতের লেনদেন বা বৈদেশিক বাণিজ্যের আকারের তুলনায় বিদেশে কার্ড ব্যবহার করে উত্তোলনকৃত অর্থ একেবারেই যৎসামান্য।
বিদেশে কার্ডে নগদ উত্তোলন বন্ধে ব্র্যাক ব্যাংকের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন গ্রাহকরা। তারা জানিয়েছেন, ২৪ ডিসেম্বর রাতে ব্যাংকটি থেকে গ্রাহকদের মোবাইল ফোনে মেসেজ নিয়ে এ সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। আকস্মিক এ সিদ্ধান্তের কারণে বিদেশ ভ্রমণরত সাধারণ গ্রাহকরা এরই মধ্যে বিপাকে পড়ে গেছেন। তাদের কেউ কেউ এরই মধ্যে বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়াও দিয়েছেন।
এ গ্রাহকদের একজন স্বপন মাহমুদ। ফেসবুকে দেয়া এক স্ট্যাটাসে তিনি লিখেছেন, ‘দেশে নগদ ডলার সংকটের কারণে অল্প কিছু ডলার নিয়ে উজবেকিস্তান এসেছি। এখন পকেটে মাত্র ৫০ ডলার আছে। এ অবস্থায় ব্র্যাক ব্যাংকের পক্ষ থেকে বিদেশে নগদ উত্তোলন বন্ধের মেসেজ দেয়া হয়েছে। অথচ আমার ভ্রমণ শেষ হওয়ার এখনো সাতদিন বাকি। কোনো পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই ব্যাংক এ ধরনের ঘোষণা দিতে পারে? উজবেকিস্তানে পিওএস মেশিন খুব একটা চলে না।’
তার এ স্ট্যাটাসে ব্যাংক থেকে পাওয়া একটি মেসেজও তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয় ‘প্রিয় গ্রাহক, ২৪ ডিসেম্বর ২০২৩ থেকে ব্র্যাক ব্যাংকের কার্ড দিয়ে দেশের বাইরে সব ধরনের নগদ উত্তোলন স্থগিত করা হয়েছে। আপনার ভ্রমণ কোটার মধ্যে পিওএস এবং ই-কমার্সের মাধ্যমে যেকোনো বৈধ কেনাকাটা করতে পারবেন।’
ক্ষুব্ধ আরেক গ্রাহক ইকবাল হোসেন। পেশায় ব্যবসায়ী এ গ্রাহক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমার ব্যবসার পরিধি তেমন বড় নয়। তার পরও প্রায়ই ব্যবসায়িক কাজে বিদেশ যেতে হয়। দেশে নগদ ডলার সংকটের কারণে খুচরা বাজারে (কার্ব মার্কেট) ডলার পাওয়া যাচ্ছে না। পেলেও সে ডলারের দর ১২৫-১২৮ টাকা পড়ে যাচ্ছে। এ কারণে বিদেশে গিয়ে প্রয়োজন হলে কার্ড দিয়ে নগদ অর্থ উত্তোলন করি। এখন ব্যাংক সে পথও বন্ধ করে দিলে আমাদের মতো মধ্যবিত্তরা কোথায় যাবে? ব্র্যাক ব্যাংকের দেখানো পথে অন্য ব্যাংকগুলো হাঁটলে সেটি আরো খারাপ হবে।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম আর এফ হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ব্র্যাক ব্যাংকের নীতি হলো ডিজিটাল ও স্মার্ট বাংলাদেশ গঠনে নগদ লেনদেনে নিরুৎসাহিত করা। এ নীতির বাস্তবায়নেই বাংলাদেশের বাইরে কার্ডের মাধ্যমে নগদ উত্তোলন বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তবে দেশে ও দেশের বাইরে ইলেকট্রনিক ডেবিট বা পেমেন্ট চালু থাকবে। কয়েক বছর আগে আমরা বাংলাদেশের ভেতরেও ক্রেডিট কার্ডে নগদ উত্তোলন বন্ধ করেছিলাম।’
সেলিম আর এফ হোসেন ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যানের দায়িত্বে রয়েছেন। তিনি বলেন, ‘ব্র্যাক ব্যাংকের গ্রাহকরা বিদেশে মার্চেন্টদের কাছ থেকে পণ্য ও সেবা ক্রয়ের ক্ষেত্রে কার্ড ব্যবহার করতে পারবেন। কিন্তু সাধারণ ব্যবহারের জন্য নগদ অর্থ উত্তোলন করতে পারবেন না। যথাযথ ভ্রমণ নথি দেখিয়ে এবং ভ্রমণ কোটা অনুমোদন করিয়ে যেকোনো গ্রাহক ব্র্যাক ব্যাংকের যেকোনো শাখা থেকে নগদ বিদেশী মুদ্রা সংগ্রহ করতে পারবেন। আমাদের গ্রাহকদের সেবা দেয়ার জন্য পর্যাপ্ত বিদেশী মুদ্রার নগদ মজুদ রয়েছে।’
ব্র্যাক ব্যাংকের মতো অন্য কয়েকটি ব্যাংকের কার্ডেও বিদেশে লেনদেন করা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ তুলছেন গ্রাহকরা। যদিও ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে কোনো মাধ্যমেই তাদের এ-সংক্রান্ত কিছু বলা হয়নি বলে দাবি করছেন তারা।
প্রায় দুই বছর ধরে দেশে ডলারের সংকট চলছে। সংকট তীব্র হয়ে ওঠায় ডলারের বিপরীতে টাকার রেকর্ড অবমূল্যায়ন হয়েছে। গত বছরের জানুয়ারিতেও দেশের ব্যাংক খাতে প্রতি ডলারের বিনিময় হার ছিল সর্বোচ্চ ৮৫ টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংক অনুমোদিত দর অনুযায়ী এখন প্রতি ডলার ১১০ টাকায় লেনদেন হচ্ছে। যদিও দেশের ব্যাংকগুলোয় ঘোষিত দরে ডলার মিলছে না। আমদানিকারকদের কাছ থেকে ব্যাংকগুলো প্রতি ডলারের জন্য ১২৫-১২৬ টাকাও আদায় করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সে হিসেবে এ সময়ে ডলারের বিনিময় হার বেড়েছে প্রায় ৪৭ শতাংশ। আর কার্ব মার্কেটে (খুচরা বাজার) প্রতি ডলারের মূল্য ১২৮ টাকা পর্যন্ত উঠেছে।
নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে একটি বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কার্ডের মাধ্যমে বিদেশে নগদ উত্তোলন বন্ধ করলে দেশের কার্ব মার্কেটে ডলারের চাহিদা বাড়বে। এতে কিছুটা স্থিতিশীল থাকা কার্ব মার্কেট আবারো অস্থিতিশীল হয়ে উঠবে। সাধারণ মানুষ কার্ব মার্কেটে গিয়ে ডলার কিনতে পারবে না। আর ব্যাংকে গিয়েও যদি ডলার না পায় সেটি হবে দুর্ভাগ্যের।’
বিদেশে গিয়ে ডেবিট কিংবা ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে নগদ উত্তোলন করলে প্রতি ডলারের দর ১১০-১১৫ টাকা পড়ছে, যা দেশের কার্ব মার্কেটের তুলনায় ডলারপ্রতি ১০-১৫ টাকা পর্যন্ত কম। এ কারণে সম্প্রতি বিদেশ গিয়ে কার্ড ব্যবহার করে নগদ উত্তোলনের হার বেড়েছে। যেমন ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রতি মাসে গড়ে সাড়ে ৭ কোটি টাকা ডেবিট কার্ডের মাধ্যমে বিদেশে নগদ উত্তোলন হয়েছিল। কিন্তু চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে কেবল এক মাসেই ৯০ কোটি টাকা ডেবিট কার্ডের মাধ্যমে বিদেশে নগদ উত্তোলন হয়েছে। একইভাবে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমেও বিদেশে নগদ উত্তোলন বেড়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘কার্ডে নগদ অর্থ উত্তোলন বন্ধের সিদ্ধান্তটি ব্র্যাক ব্যাংকের নিজস্ব পলিসি। এখানে কারো বলার কিছু নেই। এখন দেখার বিষয় হলো, এ নীতি অন্য ব্যাংকগুলোও অনুসরণ করে কিনা। কার্ব মার্কেট ও ব্যাংকে ডলারের দরের ব্যবধান বেশি হওয়ার কারণেই এখানে সমস্যা হচ্ছে।’










