স্টোরে পর্যাপ্ত ওষুধ থাকলেও পাচ্ছে না রোগীরা, নেই সুপেয় পানির ব্যবস্থা। ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়সহ নানা সংকট এবং অনিয়ম-অব্যবস্থাপনায় ধুঁকছে নোয়াখালী কভিড ডেডিকেটেড হাসপাতাল। পর্যাপ্ত অক্সিজেন থাকলেও বাইরে থেকে অক্সিজেনমাস্ক ও ওষুধ কিনতে হচ্ছে রোগীদের। অব্যবস্থাপনার কথা কিছুটা স্বীকার করে কর্তৃপক্ষ বলছে, অল্প সময়ের মধ্যে সব সংকট নিরসন হবে।

রেমডিসিভির, ইনোক্সাপেরিন, নরঅ্যাড্রিনালিন ইনজেকশন কিংবা পেভিপিডাভির, মিথালপ্যাডনিসিলন, রিভারোক্সাবেন ট্যাবলেটসহ দামি কিংবা স্বল্পদামি সব ওষুধই পর্যাপ্ত আছে ফার্মেসির স্টোরে। কিন্তু এসব ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে রোগীদের। ওষুধ লিখে দিলেও ব্যবস্থাপত্র রোগী কিংবা স্বজনের হাতে যাচ্ছে না। নার্স কিংবা বয়ের মোবাইল থেকে তা চলে যাচ্ছে তাদেরই পছন্দের ফার্মেসিতে।

আব্দুর রহিম নামে এক রোগীর স্বজন জানান, তিনি তার বাবাকে নিয়ে এক সপ্তাহ ধরে রয়েছেন করোনা হাসপাতালে। এক সপ্তাহে হাসপাতাল থেকে কোনো ওষুধ পাননি। যেসব খাবার দিচ্ছে তাও মানসম্মত নয়। হাসপাতালের ভেতরে রোগীদের আবর্জনা পরিষ্কার করতে হচ্ছে রোগীর স্বজনদের। নার্স ও আয়া পর্যাপ্ত না থাকায় রোগীর স্বজনদের ঝুঁকি নিয়ে থাকতে হচ্ছে হাসপাতালের ভেতরে।

তিনি আরো বলেন, হাসপাতাল থেকে যেসব ওষুধ লিখে দেয়া হচ্ছে সেগুলোর কোনো ব্যবস্থাপত্র তাদের হাতে দিচ্ছে না। ব্যবস্থাপত্র নার্সরা তাদের মোবাইল থেকে পাঠিয়ে দিচ্ছে বাইরের ফার্মেসিতে। আর ফার্মেসির লোকজন থাকছে হাসপাতালের ভেতরে। তারা মোটরসাইকেল নিয়ে বাইরে অপেক্ষা করে। যখনই ব্যবস্থাপত্র পাঠিয়ে দেয়া হয় তখন রোগীর স্বজনকে নিয়ে এসব লোকজন ফার্মেসিতে যাচ্ছে। সেখান থেকে ওষুধ কিনে আনছেন তারা। রেমডিসিভির কোনো কোনো ফার্মেসিতে ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করা হচ্ছে। হাসপাতালের নার্স-কর্মচারীদের পছন্দের ফার্মেসিতে বিক্রি হচ্ছে ৩ হাজার ৫০০ টাকা।

একাধিক রোগীর স্বজন জানান, প্রত্যেক রোগীর জন্য প্রতিদিন ৩০০ টাকা খাদ্যের জন্য বরাদ্দ থাকলেও পুষ্টিকর খাদ্য দেয়া হচ্ছে না। বিকালে ফল দেয়ার কথা থাকলেও তা দিচ্ছে না। ভেতরে সুপেয় পানির কোনো ব্যবস্থা নেই। আয়া-বয় সংকটে হাসপাতালের যেখানে সেখানে ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, ২৫০ শয্যা নোয়াখালী সরকারি জেনারেল হাসপাতালের সঙ্গে যুক্ত করে গত বছর শহীদ ভুলু স্টেডিয়ামে নির্মিত হয়েছে এ অস্থায়ী করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতাল। কাগজে কলমে ১২০ শয্যার হাসপাতাল হলেও এখানে শয্যা আছে মাত্র ৬০টি। ফলে অনেক রোগীকে থাকতে হচ্ছে বারান্দা কিংবা জিনমনেশিয়ামের ফ্লোরে।

অন্তু নামে এক রোগীর স্বজন জানান, জিমনেশিয়ামে বৃষ্টির পানি পড়ে। স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে ফ্লোরে থাকতে হচ্ছে করোনা উপসর্গের রোগীদের। উপসর্গের রোগীদের কোনো খাবার দেয়া হচ্ছে না।

হাসপাতালে ওষুধ সংকট আছে কিনা জানতে চাইলে ফার্মেসি বিভাগের স্টোর ইনচার্জ মাসুদ রানা বণিক বার্তাকে জানান, কভিড রোগীদের সেবা দেয়ার মতো পর্যাপ্ত ওষুধ রয়েছে স্টোরে। কিন্তু নিয়মিত চাহিদা না আসায় তারা ওষুধ দিতে পারছেন না। হাসপাতালের ইনচার্জ তথা চিকিৎসকরা যখনই চাহিদাপত্র পাঠাচ্ছেন তখনই তারা ওষুধ সরবরাহ করছেন। প্রতি শনিবার মূলত ওষুধ দেয়া হয় স্টোর থেকে। কিন্তু কভিড রোগীদের বেলায় তা ২৪ ঘণ্টাই খোলা। যখনই চাহিদাপত্র আসবে তখনই ওষুধ ছাড় দেয়া হবে।

স্টোরে পর্যাপ্ত ওষুধ রয়েছে, কিন্তু রোগীরা ওষুধ পাচ্ছে না—এমন প্রশ্ন করলে কভিড হাসপাতালের ইনচার্জ ডা. নিরুপম দাশ বলেন, ৯ জুন পর্যন্ত ওষুধের কিছুটা সংকট ছিল। তবে ৯ জুনের পর থেকে কোনো ওষুধ সংকট নেই। জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহেও ওষুধ না পাওয়ার কথা বলেছে রোগীরা—এমন প্রশ্নে তিনি জানান, এ বিষয়ে তিনি খোঁজ নেবেন। যদি নার্স কিংবা বয়রা কোনো অনিয়ম করেন তাহলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। নার্স কিংবা আয়া-বয়রা যাতে কোনো সংকট তৈরি করতে না পারে সেজন্য হাসপাতালে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে।

কভিড হাসপাতালের সার্বিক সমস্যা নিয়ে কথা হয় জেলা করোনা প্রতিরোধ কমিটির সদস্য সচিব ও সিভিল সার্জন ডা. মাসুম ইফতেখারের সঙ্গে। তিনি কিছু অব্যবস্থাপনার কথা স্বীকার করে বলেন, গত দেড় বছরে তিল তিল করে অস্থায়ী এ হাসপাতাল দাঁড় করানো হয়েছে। বর্তমানে হাসপাতালটি লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী ও ফেনী অঞ্চলের করোনা রোগীদের আস্থার স্থল হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। এখানে অক্সিজেন ও ওষুধের কোনো সংকট নেই। তবে লোকবল সংকটের কারণে কিছু অব্যবস্থাপনা হচ্ছে।

তিনি আরো জানান, এরই মধ্যে একজন মেডিকেল অফিসার নিয়োগ দেয়া হয়েছে। তিনি যোগদান করার পর তার দায়িত্বই থাকবে হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা দেখা। ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার হচ্ছে কিনা, রোগীরা ওষুধ পাচ্ছে কিনা কিংবা রোগীরা কারো দ্বারা প্রতারিত হচ্ছে কিনা এ বিষয়গুলোই মূলত দেখবেন ওই চিকিৎসক। এর বাইরে আয়া-বয় ও নার্স নিয়োগের বিষয়ে কাজ চলছে।