বিশ্ববাজার থেকে ব্র্যান্ড নিউ গাড়ির যন্ত্রাংশ আমদানি করে সংযোজনের মাধ্যমে বিপণন করে আসছে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড (পিআইএল)। প্রায় এক দশকেরও বেশি সময় ধরে লাভজনকভাবে ব্যবসা করছে। এসব গাড়ির প্রধান ক্রেতা মূলত সরকারি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলায় কৃচ্ছ্র সাধনের কারণে সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের পরিচালন ও উন্নয়ন ব্যয়ের আওতায় যানবাহন কেনা বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। এতে প্রগতির গাড়ি বিক্রি প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। ধস নামে মুনাফায়। বছরখানেক পর সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো গাড়ি কেনা শুরু করলে কিছুটা গতি ফেরে প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজে। কিন্তু সর্বশেষ সরকারি পর্যায়ে গাড়ি ক্রয়ের মূল্যসীমা পুনর্নির্ধারণসহ যন্ত্রাংশ আমদানিতে শুল্ক বৃদ্ধি নতুন সংকটে ফেলেছে। দ্রুতই এ বিষয়ে উদ্যোগ নেয়া না হলে বন্ধ হয়ে যেতে পারে বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল করপোরেশনের (বিএসইসি) প্রতিষ্ঠানটি।
জানা গেছে, প্রগতির চট্টগ্রামের বাড়বকুণ্ডের কারখানায় প্রতি বছর গাড়ি সংযোজনের সক্ষমতা ১ হাজার ৩০০টি। যদিও নিয়মিত সংযোজন করা হয় ৯০০ থেকে এক হাজার গাড়ি। বিপণনও করা প্রায় সমপরিমাণ। তবে কভিডের সংক্রমণ শুরু হলে সরকারি পর্যায়ে প্রকল্প ও সরকারি কাজের প্রয়োজনে গাড়ি কেনার পরিমাণ কমে যায়। এতে বিপাকে পড়ে প্রগতি। দেশে ভাইরাসটির প্রকোপ কমার পর গাড়ি বিক্রি শুরু হলেও সাম্প্রতিক সময়ে ডলার সংকটসহ নানা জটিলতা দেখা দেয়। সরকারি পর্যায়ে ফের গাড়ি কেনা প্রায় বন্ধ। সীমিত পরিসরে গাড়ি বিক্রির সুযোগ থাকলেও সরকারি কর্মকর্তাদের গাড়ি ক্রয়ের সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ৯৪ লাখ টাকা (ট্যাক্স ও ভ্যাটসহ)। কিন্তু বাজেটে গাড়ির যন্ত্রাংশ আমদানি শুল্ক ৫০ শতাংশ বাড়ানোয় সেই দামে প্রগতির পক্ষে কোনো অবস্থায়ই গাড়ি বিক্রি সম্ভব নয়, যার কারণে চলতি অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির বিক্রি অস্বাভাবিক কমে গেছে।
সম্প্রতি সিকেডি অর্থাৎ কমপ্লিটলি নকড ডাউন গাড়ির যন্ত্রাংশ আমদানির শুল্ক কমিয়ে আগের অবস্থায় রাখতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) চিঠি দিয়েছে শিল্প মন্ত্রণালয়। জানুয়ারির শুরুতে মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মো. মানিক উদ্দিন স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে এনবিআর চেয়ারম্যানকে জানানো হয়, প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ মূলত সরকারি বিভিন্ন সংস্থা, মন্ত্রণালয়, সরকারি বিভিন্ন বিভাগ, অধিদপ্তর, পরিদপ্তর কিংবা প্রকল্পে গাড়ি বিক্রি করে। ২০২১-২২ অর্থবছরে সিকেডি আমদানির মোট শুল্ক ছিল ২১২ দশমিক ২০ শতাংশ। কিন্তু ২০২২-২৩ অর্থবছরে গাড়ি আমদানির সম্পূরক শুল্ক ১০০ থেকে বাড়িয়ে ১৫০ শতাংশ করা হয়েছে, যার কারণে সিকেডি আমদানিতে মোট শুল্ক দিতে হচ্ছে ২৮৯ শতাংশ। আবার টাকার বিপরীতে ডলারের মূল্যবৃদ্ধিসহ বিভিন্ন কারণে বর্তমানে ২ হাজার ৪৭৭ সিসির গাড়ি সংযোজন করে লাভসহ বিক্রি করতে হচ্ছে ন্যূনতম ১ কোটি ৪৫ লাখ টাকায়। এসব কারণে চলতি অর্থবছরে প্রগতির গাড়ি বিক্রি এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে দীর্ঘদিন ধরে লাভজনক থাকা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানটি লোকসানের দায়ে বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে শিল্প মন্ত্রণালয়।
চিঠিতে আরো দাবি করা হয়, চলতি অর্থবছরে সিকেডি আমদানিতে সম্পূরক শুল্ক ১০০ থেকে বাড়িয়ে ১৫০ শতাংশ করা হলেও সিবিইউ (কমপ্লিটলি বিল্ট আপ) আমদানিতে শুল্ক ২০০ শতাংশের স্থলে মাত্র ২৫০ শতাংশ করা হয়েছে। ফলে সিকেডি যন্ত্রাংশ আমদানিতে সম্পূরক শুল্ক ৫০ শতাংশ বাড়লেও সিবিইউতে বেড়েছে কেবল ২৫ শতাংশ। বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা তাই সিবিইউ আমদানি করে সরকারি পর্যায়ে গাড়ি সরবরাহ করতে পারলেও সিকেডি আমদানিনির্ভর প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ বড় ধরনের ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতার মধ্যে পড়েছে। সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এ অসম প্রতিযোগিতার কারণে ক্ষতির মুখে পড়েছে প্রগতি।
বিএসইসির দেয়া তথ্যে জানা গেছে, ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রগতি গাড়ি বিক্রি করেছে ৬৫০টি। তার আগের অর্থবছরে বিক্রি করেছিল ৩৪২টি গাড়ি। আর চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে প্রগতি গাড়ি বিক্রি করতে পেরেছে মাত্র ১১৮টি, যা বার্ষিক বিক্রয় লক্ষ্যমাত্রার ১৫ শতাংশেরও কম। সরকারি প্রতিষ্ঠানের গাড়ি কেনা কার্যত বন্ধ থাকায় প্রতিষ্ঠানটির বিক্রি অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি হবে বলে আশঙ্কা করছে বিএসইসিও। এরই মধ্যে প্রগতির কাছ থেকে ন্যূনতম গাড়ি কেনার প্রস্তাব দেয়া হলেও অর্থ মন্ত্রণালয় তা ফিরিয়ে দেয়।
প্রগতির তথ্যমতে, ২০২০-২১ অর্থবছরে প্রগতি করপূর্ব মুনাফা করেছে ৭ কোটি ২৮ লাখ টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরে আয় করেছিল ৩৮ কোটি ৫০ লাখ টাকা। তারও আগে ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৭৬ কোটি ২ লাখ, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ১০১ কোটি ৩৩ লাখ, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৯৫ কোটি ৪৯ লাখ ও ২০১৬-১৭ অর্থবছরে করপূর্ব আয় করেছে ৮৬ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বার্ষিক ৯০০টি গাড়ি বিক্রয় লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৪৪৮টি বিক্রি করেছিল। চলতি অর্থবছরে অবশ্য গাড়ি উৎপাদন ও বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে ৮০০-তে নামিয়ে আনা হয়। যদিও এখন পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে মাত্র ১১৮টি গাড়ি। দুই প্রান্তিকের লোকসানের ধারাবাহিকতায় তৃতীয় প্রান্তিকেও বড় ধরনের লোকসান গুনতে হবে বলে মনে করছেন প্রতিষ্ঠানটির শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা। বিক্রয় বিভাগ বলছে, গাড়ি বিক্রির লক্ষ্যমাত্রার ৩০ শতাংশও পূরণ করা সম্ভব হবে না এবার।
যোগাযোগ করা হলে প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মো. আব্দুল ওয়াহেদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিএসইসির বেশ কয়েকটি লাভজনক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রগতি অন্যতম। করোনা মহামারী চলাকালীনও সরকারি কোষাগারে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব দেয়ার পাশাপাশি লাভের ধারায় ছিল প্রতিষ্ঠানটি। বর্তমানে সরকারি পর্যায়ে যানবাহন কেনা বন্ধ থাকায় চলতি অর্থবছরে প্রগতি কিছুটা সংকটে রয়েছে। মূলত শুল্ক করহার বেড়ে যাওয়ার কারণে সবচেয়ে বেশি সংকট দেখা দিয়েছে। আমরা বিষয়টি নিয়ে এনবিআরে যোগাযোগ করেছি। প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজকে রক্ষার জন্য হলেও শুল্ক কর শিথিল করা জরুরি।’
খাতসংশ্লিষ্টরা অবশ্য বলছেন, শুধু রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের কাছে গাড়ি বিক্রির ওপর নির্ভরশীলতায় প্রগতি বর্তমানে লোকসানের ঝুঁকিতে পড়েছে। একটি টেকসই ও লাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাঁড়াতে গেলে সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বেসরকারি খাতকেও প্রাধান্য দিতে হয়। বর্তমান সংকটকালীনও বেসরকারি গাড়ি সংযোজনকারী কোম্পানিগুলো দেশে ব্যবসা করে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে বিপণন দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রগতিকে সংযোজনেও বৈচিত্র্য আনার প্রতি মনোযোগ দেয়া জরুরি বলে মনে করছেন তারা।
দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় জাপানের মিত্সুবিশি মোটরস করপোরেশনের (এমএমসি) উৎপাদিত পাজেরো স্পোর্টস (কিউএক্স) জিপ আমদানি করে সংযোজনপূর্বক বাজারজাত করেছে প্রগতি। এটিই এখন প্রতিষ্ঠানটির প্রধান সংযোজিত পণ্য। ২০২১ সাল থেকে মিত্সুবিশি এল-২০০ ডাবল কেবিন পিকআপের সিকেডি আমদানি করে সংযোজনপূর্বক বাজারজাত করা হচ্ছে। অত্যন্ত সীমিত পরিসরে চীনের ফোর্ড কোম্পানির এসইউভি জিপ ও ডাবল কেবিন পিকআপের সিকেডিও সংযোজনপূর্বক বাজারজাত করছে প্রগতি। অন্যদিকে জাপানের মিত্সুবিশি মোটরস করপোরেশনের মিত্সুবিশি জিপ সিবিইউ অবস্থায় আমদানি; টয়োটা, নিশান ইত্যাদি ব্র্যান্ডের কার, পিকআপ, ডাবল কেবিন পিকআপ, মাইক্রোবাস, অ্যাম্বুলেন্স ইত্যাদি স্থানীয় বাজার থেকে কিনে ক্রেতাপ্রতিষ্ঠানগুলোর চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ করে আসছে।
প্রগতির বিপণন বিভাগের শীর্ষ এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রগতি আমদানি শুল্ক শতভাগ পরিশোধের মাধ্যমে ৪০০ শ্রমিক-কর্মচারীর একটি বিশাল উৎপাদনমুখী শিল্প-কারখানা লাভজনক পর্যায়ে চালু রেখেছে। সিকেডি আমদানির মাধ্যমে দেশে গাড়ি সংযোজন ও উৎপাদন খাতে দক্ষতার স্বাক্ষর রেখে লাভজনক রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে সুনাম কুড়িয়েছে। যেখানে সিবিইউ আমদানি করে যেকোনো বেসরকারি উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান কম মূল্যে গাড়ি সরবরাহ করতে পারে, সেখানে শুল্ক করহার বৈষম্যের কারণে বন্ধের ঝুঁকিতে প্রগতি।’










