রেজাউল ইসলাম ঢাকার নারিন্দা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ইংরেজি বিষয়ের সহকারী শিক্ষক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করে ৩৬তম বিসিএসের (নন-ক্যাডার) মাধ্যমে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। ২০২০ সালে খুলনা টিচার্স ট্রেনিং কলেজ থেকে বিএড ডিগ্রি অর্জন করেন। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে ‘প্রফেশনাল ডেভেলপমেন্ট ফর টিচার্স ট্রেইনার’ বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। শিক্ষা ও শিক্ষাঙ্গনের নানা দিক নিয়ে বণিক বার্তার নিয়মিত আয়োজন ‘শিক্ষালয়’-এ কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাবিদিন ইব্রাহিম
শিক্ষকতায় এলেন কীভাবে? এ পেশায় আসার পেছনে কি কোনো বিশেষ স্বপ্ন বা আকাঙ্ক্ষা ছিল?
সত্যি বলতে, শিক্ষকতায় আসাটা আমার জন্য অনেকটা আকস্মিক। ২০১৪ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে ভালো কোনো ক্যাডার সার্ভিসে যোগ দেয়ার চেষ্টা করেছি। কয়েকটি বিসিএস পরীক্ষায় অংশ নিয়েছি। পছন্দের তালিকায় প্রশাসন ও পুলিশ ক্যাডার ছিল প্রথম দিকে, আর শিক্ষা ক্যাডার ছিল একেবারে শেষের দিকে। সম্ভবত পরীক্ষার ফল বা প্রাপ্ত নম্বরের কারণে পছন্দের ক্যাডারগুলোতে সুযোগ হয়নি।
সে সময় সরকার একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়, যার আওতায় ক্যাডার পদে নিয়োগের সুযোগ না পাওয়া যোগ্য প্রার্থীদের মধ্য থেকে নন-ক্যাডার পদে নিয়োগ দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়। এ প্রক্রিয়ায় ২০১৭ সাল থেকে নন-ক্যাডার নিয়োগ শুরু হয়। পরে ৩৬তম বিসিএসের মাধ্যমে ২০১৯ সালে আমি সরকারি মাধ্যমিক
বিদ্যালয়ে নিয়োগ পাই। অর্থাৎ শিক্ষকতাকে প্রথম পছন্দ হিসেবে বেছে নিইনি; নিয়োগ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই এ পেশায় আসা।
আপনার অভিজ্ঞতা থেকেই বোঝা যাচ্ছে, শিক্ষকতা অনেকের কাছে প্রথম পছন্দ নয়; বরং অন্য পেশায় সুযোগ না পেলে বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হয়। মেধাবী তরুণদের কাছে শিক্ষকতা কেন আকর্ষণীয় পেশা হয়ে উঠতে পারছে না?
আমার মনে হয়, এর অন্যতম কারণ শিক্ষাকে ঘিরে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব। আগামী ২০ বা ৩০ বছরে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে কোথায় নিয়ে যেতে চাই, শিক্ষকদের কীভাবে তৈরি করব এবং তাদের পেশাগত অবস্থান কী হবে—এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন। এ ঘাটতির কারণে মেধাবী তরুণদের শিক্ষকতায় আকৃষ্ট করা যাচ্ছে না।
এর মধ্যে বেতন কাঠামো ও সামাজিক মর্যাদার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের মাধ্যমিক শিক্ষকদের বেতন আন্তর্জাতিক তুলনায় অনেক কম। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ভারতে একজন মাধ্যমিক শিক্ষকের মাসিক বেতন প্রায় ৫১০ ডলার, যেখানে বাংলাদেশে তা প্রায় ১১৯ ডলার। যুক্তরাষ্ট্রে একজন মাধ্যমিক শিক্ষকের মাসিক বেতন ৫-৬ হাজার ডলার এবং সিঙ্গাপুরে প্রায় ৫ হাজার ৩০০ ডলার বলে উল্লেখ করা হয়। ফলে বাংলাদেশের শিক্ষকদের বেতন আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় কতটা পিছিয়ে, তা সহজেই বোঝা যায়। বণিক বার্তার একটি প্রতিবেদনেও বাংলাদেশের মাধ্যমিক শিক্ষকদের বেতন দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন বলে উঠে এসেছিল। পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের শিক্ষকদের বেতনের তুলনায়ও বাংলাদেশের শিক্ষকরা পিছিয়ে আছেন বলে প্রতিবেদনটিতে তুলে ধরা হয়। একজন মেধাবী শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করে স্বাভাবিকভাবেই এমন পেশা বেছে নিতে চাইবেন, যেখানে তার যোগ্যতা অনুযায়ী ভালো আয় ও জীবনযাপনের সুযোগ রয়েছে। শিক্ষকতায় সেই সুযোগ না থাকলে তার অন্য পেশার দিকে ঝুঁকে পড়ার আশঙ্কাই বেশি।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সামাজিক মর্যাদার প্রশ্ন। শিক্ষকদের যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয় না। কম বেতনের কারণে অনেক শিক্ষককে সীমিত আয়ের মধ্যে জীবনযাপন করতে হয়, সমাজে তাদের জীবনযাত্রার মানও অনেক ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত পর্যায়ে থাকে না। ফলে পেশাটি তরুণদের কাছে আকর্ষণ হারায়। শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদা ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে মেধাবীদের এ পেশায় আকৃষ্ট করা কঠিন। আমার মতে, বেতন-ভাতা ও সামাজিক মর্যাদা—দুই ক্ষেত্রেই শিক্ষকদের অবস্থানের উন্নতি প্রয়োজন।
সম্প্রতি একটি প্রতিবেদনে মাধ্যমিক পর্যায়ে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের ঘাটতির চিত্র উঠে এসেছে। বিশেষ করে ইংরেজি ও গণিতে ২০ হাজারের বেশি শিক্ষকের ঘাটতি রয়েছে বলে জানা গেছে। মাধ্যমিক পর্যায়ে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক থাকা কতটা জরুরি?
বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক অবশ্যই জরুরি। একজন গণিতের শিক্ষকের দায়িত্ব একজন ইংরেজির শিক্ষক যথাযথভাবে পালন করতে পারবেন না। গণিতের নিজস্ব তত্ত্ব, সূত্র ও বিষয়ভিত্তিক ধারণা রয়েছে, যেগুলো সমাজবিজ্ঞানের একজন শিক্ষকের পক্ষে যথাযথভাবে শেখানো সম্ভব নয়। একইভাবে সমাজবিজ্ঞানের ক্লাসে ইংরেজির শিক্ষককে দায়িত্ব দিলেও কাঙ্ক্ষিত শিখনফল অর্জন করা কঠিন হবে। অর্থাৎ যে বিষয়ে পাঠদান করা হচ্ছে, সে বিষয়ে শিক্ষকের পর্যাপ্ত জ্ঞান ও দক্ষতা থাকা প্রয়োজন।
কিন্তু বাংলাদেশের মাধ্যমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের ঘাটতির পাশাপাশি শিক্ষকদের বিষয়ভিত্তিক যোগ্যতারও সমস্যা রয়েছে। বণিক বার্তার ২০২৪ সালের একটি প্রতিবেদনে উঠে এসেছিল, মাধ্যমিক পর্যায়ে ইংরেজি ও গণিতের ক্লাস নেন—এমন প্রায় ৮০ শতাংশ শিক্ষকের সংশ্লিষ্ট বিষয়ে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেই। অর্থাৎ তারা হয়তো অন্য বিষয়ে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর করেছেন, কিন্তু নিয়োগ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ইংরেজি কিংবা গণিতের শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
বিষয়ভিত্তিক পর্যাপ্ত যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও বছরের পর বছর পাঠদান চলতে থাকলে শিক্ষার্থীদের যে জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করার কথা, তা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই শুধু শিক্ষক নিয়োগ দিলেই হবে না; যে বিষয়ে পাঠদান করবেন, সেই বিষয়ে তার যথাযথ যোগ্যতা ও দক্ষতা রয়েছে কিনা, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ইংরেজি ও গণিতে অনেক শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হচ্ছে। ইংরেজি শিক্ষার দুর্বলতাগুলো কোথায়?
এর একটি কারণ শিক্ষকদের বিষয়ভিত্তিক যোগ্যতার ঘাটতি। আগেই বলেছি, মাধ্যমিক পর্যায়ে ইংরেজি পড়ান—এমন শিক্ষকদের বড় একটি অংশেরই সংশ্লিষ্ট বিষয়ে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেই। ফলে বিষয়টি শেখানোর ক্ষেত্রে তাদের দক্ষতার ঘাটতি থাকতে পারে।
তবে শিক্ষকের যোগ্যতার ঘাটতি থাকলেও ভালো ব্যবস্থাপনা ও কার্যকর পাঠদান পদ্ধতির মাধ্যমে কিছুটা উন্নতি করা সম্ভব। ভাষা শেখানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করা। শ্রেণীকক্ষে এমন একটি পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে শিক্ষার্থীরা বাস্তব পরিস্থিতির অনুকরণে ইংরেজিতে কথা বলার সুযোগ পাবে।
ধরা যাক, একটি শ্রেণীকক্ষে ৩০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। তাদের মধ্যে একজন ইংরেজিতে কথা বলতে পারে, কিন্তু বাকি ২৯ জন পারে না। এ অবস্থায় শিক্ষক যদি শিক্ষার্থীদের ইংরেজিতে কথা বলতে উৎসাহিত না করেন, তাদের অনুশীলনের সুযোগ তৈরি না করেন, এমনকি নিজেও শ্রেণীকক্ষে ইংরেজিতে কথা না বলেন, তাহলে ইংরেজি শেখার পরিবেশ গড়ে উঠবে কীভাবে?
ভাষা শেখার জন্য শুধু ব্যাকরণ পড়ানো কিংবা বইয়ের অনুশীলনী শেষ করাই যথেষ্ট নয়। শিক্ষার্থীদের ভাষাটি ব্যবহার করতে দিতে হবে। তারা যেন নিজেদের মধ্যে ইংরেজিতে কথোপকথন করতে পারে, প্রশ্ন করতে পারে এবং ভুল করলেও আবার চেষ্টা করার সুযোগ পায়, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। আমাদের শ্রেণীকক্ষে পাঠদান হয়তো চলছে, সিলেবাসও শেষ হচ্ছে; কিন্তু শিক্ষার্থীরা বাস্তবে কতটা ইংরেজি ব্যবহার করতে পারছে, সেটিই আসল প্রশ্ন। ইংরেজিচর্চার পরিবেশ তৈরি না হলে পাঠদান চললেও প্রত্যাশিত শিখনফল অর্জিত হবে না।
বিদ্যালয় পর্যায়ে বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি আরো এক বা একাধিক বিদেশী ভাষা শেখানোর উদ্যোগের কথা বলা হচ্ছে। অথচ ১২ বছর ইংরেজি পড়ার পরও অনেক শিক্ষার্থী প্রয়োজনীয় ভাষাদক্ষতা অর্জন করতে পারছে না। এ পরিস্থিতিতে নতুন ভাষা শেখানোর উদ্যোগ কতটা বাস্তবসম্মত? এর প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো কী?
এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে শতভাগ চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলে আমি মনে করি। কারণ দীর্ঘদিন ধরে ইংরেজি শেখানোর পরও শিক্ষার্থীরা প্রত্যাশিত দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না। এর অন্যতম কারণ শিক্ষকদের যোগ্যতা ও শ্রেণীকক্ষে ভাষা শেখানোর পদ্ধতিগত দুর্বলতা। একজন ইংরেজির শিক্ষক নিজেই যদি ইংরেজিতে কথা বলতে না পারেন কিংবা পারলেও শ্রেণীকক্ষে তা প্রয়োগ না করেন, তাহলে শিক্ষার্থীরা কীভাবে ভাষাটি শিখবে? শিক্ষক যদি পুরো ক্লাস বাংলায় পরিচালনা করে ইংরেজি শেখানোর প্রত্যাশা করেন, তাহলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ইংরেজিতে কথা বলার দক্ষতা গড়ে তোলা কঠিন।
আমরা পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে শিক্ষার্থীদের ইংরেজি শেখানোর চেষ্টা করছি। এর পরও কাঙ্ক্ষিত দক্ষতা তৈরি হয়নি। এর পেছনে যোগ্য শিক্ষকের ঘাটতি ও কার্যকর ভাষা শিক্ষার পরিবেশের অভাব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এ অবস্থায় তৃতীয় বা চতুর্থ ভাষা শেখানোর উদ্যোগ নেয়ার আগে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি আছে কিনা তা বিবেচনা করা জরুরি।
ধরা যাক, বিদ্যালয়ে ফরাসি ভাষা শেখানো হবে। সেক্ষেত্রে ফরাসি ভাষায় দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে। কিন্তু দেশে এ ধরনের শিক্ষকের সংখ্যা কত? তাদের দিয়ে সারা দেশের বিদ্যালয়গুলোতে পাঠদান নিশ্চিত করা কতটা সম্ভব? বাংলাদেশে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যাই ২১ হাজারের বেশি। প্রতিটি বিদ্যালয়ে একজন করে ফরাসি ভাষার শিক্ষক নিয়োগ দিতে হলেও ২১ হাজারের বেশি শিক্ষক প্রয়োজন হবে। এত বিপুলসংখ্যক যোগ্য শিক্ষক পাওয়া যাবে কিনা সেটি বড় প্রশ্ন।
তাই নতুন ভাষা শেখানোর পরিকল্পনা নেয়ার আগে শিক্ষকপ্রাপ্যতা, প্রশিক্ষণ, নিয়োগ ব্যবস্থা ও বাস্তবায়ন সক্ষমতা যাচাই করতে হবে। দক্ষ শিক্ষক এবং উপযুক্ত শিক্ষণ পদ্ধতি নিশ্চিত না করে শুধু পাঠ্যক্রমে নতুন ভাষা যুক্ত করলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন হবে।
অভিভাবকদের একটি বড় অংশ সন্তানদের বেসরকারি বিদ্যালয়ে পড়াতে আগ্রহী। সরকারি বিদ্যালয়ে যোগ্য শিক্ষক থাকা সত্ত্বেও অনেক ক্ষেত্রে সেগুলো অভিভাবকদের প্রথম পছন্দ হয়ে উঠতে পারছে না। এর কারণ কী বলে মনে করেন?
আমার মতে, এর অন্যতম কারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ফলাফল ও ব্যবস্থাপনাগত পার্থক্য। অনেক বেসরকারি বিদ্যালয়ের ফলাফল ভালো হওয়ায় অভিভাবকরা সেসব প্রতিষ্ঠানের প্রতি আকৃষ্ট হন। অন্যদিকে অনেক সরকারি বিদ্যালয় প্রত্যাশিত ফল করতে না পারায় অভিভাবকদের আস্থা অর্জনে পিছিয়ে পড়ছে।
এখন প্রশ্ন হলো, কোনো বিদ্যালয়ের ফলাফল ভালো হয় কেন, আর অন্য কোনো বিদ্যালয় কেন পিছিয়ে থাকে? আমার মতে, এর পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, নিয়মিত তদারকি ও জবাবদিহি।
মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) থাকলেও বিদ্যালয় পর্যায়ে নিয়মিত তদারকি ও জবাবদিহি সব ক্ষেত্রে কার্যকরভাবে নিশ্চিত হচ্ছে না। প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব শুধু প্রশাসনিক কাজ পরিচালনা করা নয়; শিক্ষকরা নিয়মিত ও যথাযথভাবে পাঠদান করছেন কিনা, শিক্ষার্থীরা পাঠ বুঝতে পারছে কিনা এবং শ্রেণীকক্ষে শিক্ষার পরিবেশ ঠিক আছে কিনা, সেদিকেও নজর দেয়া প্রয়োজন।
প্রধান শিক্ষকদের নিজেরাও শ্রেণীকক্ষে পাঠদান ও শিক্ষার মানোন্নয়নে সক্রিয় ভূমিকা রাখা উচিত। তাদের ক্লাস নেয়ার বিষয়ে নির্দেশনা থাকলেও বাস্তবে তা কতটা অনুসরণ করা হচ্ছে, সেটিও তদারকি করা প্রয়োজন। একইভাবে প্রধান শিক্ষকরা বিদ্যালয় পরিচালনায় যথাযথ দায়িত্ব পালন করছেন কিনা তা দেখার দায়িত্ব ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের। কিন্তু নিয়মিত পরিদর্শন ও কার্যকর তদারকি না থাকলে জবাবদিহির ঘাটতি থেকেই যায়।
সরকারি বিদ্যালয় পরিচালিত হয় জনগণের করের টাকায়। বিদ্যালয়ের তদারকির জন্য উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে শিক্ষা কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তারা রয়েছেন। তারা করছেনটা কি?
বিদ্যালয় তদারকির জন্য আলাদা পরিদর্শন ব্যবস্থা আছে। সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে বিদ্যালয় পরিদর্শক ও সহকারী বিদ্যালয় পরিদর্শকের পদ রয়েছে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয় হলো, আমার জানা তথ্যমতে, বিদ্যালয় পরিদর্শকের ১৬টি এবং সহকারী বিদ্যালয় পরিদর্শকের ১৬টি—মোট ৩২টি পদই শূন্য। অর্থাৎ এসব পদে কোনো কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করছেন না।
জেলা পর্যায়েও একই সংকট রয়েছে। দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ২৩টিতে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার পদ শূন্য। সহকারী জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার পদেও শূন্যতা রয়েছে। উপজেলা পর্যায়ে পরিস্থিতি আরো উদ্বেগজনক। ৪৯২টি উপজেলার মধ্যে ৩১৫টিতে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার পদ শূন্য বলে আমার কাছে থাকা তথ্যে উল্লেখ রয়েছে। অর্থাৎ যাদের বিদ্যালয় পরিদর্শন, পাঠদানের মান পর্যবেক্ষণ এবং শিক্ষকদের দায়িত্ব পালন নিশ্চিত করার কথা, তাদের অনেক পদই শূন্য। ফলে বিদ্যালয়গুলো নিয়মিত তদারকির আওতায় আসছে না। পর্যাপ্ত জনবল না থাকলে কার্যকর পরিদর্শন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা কঠিন।
বেসরকারি অনেক বিদ্যালয়ে পরিচালনা পর্ষদ নিয়মিত পাঠদান ও শিক্ষকদের দায়িত্ব পালন তদারক করে। কোনো শিক্ষক নিয়মিত ক্লাস না নিলে বা দায়িত্বে অবহেলা করলে তাকে জবাবদিহি করতে হয়। সরকারি বিদ্যালয়েও একই ধরনের কার্যকর ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। কিন্তু জনবল সংকট, দুর্বল তদারকি এবং কিছু ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে তা প্রত্যাশিতভাবে কার্যকর হচ্ছে না; শিক্ষকরা দীর্ঘদিন দায়িত্বে অবহেলা করলেও তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা হয় না বলে অভিযোগ রয়েছে।
জনবল সংকটের পাশাপাশি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক ও সহকারী প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য থাকা এবং শিক্ষকদের পদোন্নতি নিয়ে দীর্ঘদিনের জটিলতার কথাও শোনা যায়। অনেক শিক্ষক কর্মজীবনের পুরোটা সময় সহকারী শিক্ষক হিসেবেই কাটিয়ে দেন। পদোন্নতির প্রক্রিয়ায় মূল বাধাগুলো কোথায়?
সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতির সংকট চলছে। ১৯৯১ সালের আগে যারা এসব বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেছিলেন, তাদের অনেকে ২৫-৩০ বছর চাকরি করেও পদোন্নতি পাননি। শেষ পর্যন্ত সহকারী শিক্ষক হিসেবেই তাদের অবসর নিতে হয়েছে।
এ সংকটের অন্যতম কারণ সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক পদ কাঠামো ও সংশ্লিষ্ট বিধিমালা। ১৯৮০ সালের ক্যাডার কম্পোজিশন রুলসের ভিত্তিতে এসব বিদ্যালয়ের শিক্ষক পদ বিন্যস্ত করা হয়েছিল। সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলো শিক্ষা ক্যাডারের আওতাভুক্ত। এ কাঠামোয় সহকারী শিক্ষক, সহকারী প্রধান শিক্ষক ও প্রধান শিক্ষক—এ তিন ধরনের পদ রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, সহকারী শিক্ষক থেকে পদোন্নতি পেয়ে সহকারী প্রধান শিক্ষক এবং পরে প্রধান শিক্ষক হওয়ার সুযোগ থাকার কথা। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে বিধিমালার প্রয়োজনীয় সংস্কার না হওয়া এবং পদোন্নতির প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতার কারণে শিক্ষকদের পেশাগত অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
একজন শিক্ষক যখন দেখেন, দীর্ঘ দুই বা তিন দশক চাকরি করেও পদোন্নতির সুযোগ নেই, তখন তার পেশাগত প্রেরণা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। মেধাবী তরুণরাও পেশা নির্বাচনের সময় এসব বিষয় বিবেচনা করেন। তারা যদি দেখেন, শিক্ষকতায় যোগদানের পর দীর্ঘদিন পদোন্নতি ও পেশাগত উন্নয়নের সুযোগ নেই, তাহলে এ পেশার প্রতি তাদের আগ্রহ কমে যাওয়াই স্বাভাবিক।
গত কয়েক বছর নারিন্দা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের এসএসসি ফলাফলে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। সরকারি স্কুলগুলোর ফলাফল খারাপ হওয়ার পেছনে কারণ কী?
আগে সরকারি বিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক ধরনের বাছাই হতো। ফলে তুলনামূলকভাবে ভালো প্রস্তুতি নিয়ে আসা শিক্ষার্থীরাই বেশি ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেত। এখন লটারি পদ্ধতিতে ভর্তির কারণে এমন অনেক শিক্ষার্থীও শ্রেণীকক্ষে আসছে, যারা ঠিকমতো বাংলা পড়তে পারে না। তাদের নিয়ে শিক্ষার মান বজায় রাখা এবং ভালো ফল অর্জন করা নিঃসন্দেহে কঠিন। এর সঙ্গে করোনার কারণে তৈরি হওয়া শিখন ঘাটতিও রয়েছে। তবে আরেকটি বড় সমস্যা হলো সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকস্বল্পতা। সারা দেশের ৭০২টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকের মোট পদ ১৬ হাজার ১৪১টি। এর মধ্যে পূরণ রয়েছে ১০ হাজার ৯৩টি পদ। ফলে বিপুলসংখ্যক পদ শূন্য থাকায় বিদ্যালয়গুলোয় পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। আমার নিজের বিদ্যালয়, নারিন্দা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের কথাই বলি। প্রধান শিক্ষক ও সহকারী প্রধান শিক্ষক বাদে এখানে শিক্ষকের পদ ৫২টি। এর বিপরীতে কর্মরত শিক্ষক মাত্র ২৯ জন। অর্থাৎ প্রায় অর্ধেক পদই শূন্য। ফলে একজন শিক্ষককে একাধিক শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে।
আমার দিনে তিনটি ক্লাস নেয়ার কথা থাকলেও শিক্ষকস্বল্পতার কারণে ছয়টি পর্যন্ত ক্লাস নিতে হয়। আমি ইংরেজির শিক্ষক, কিন্তু শিক্ষক সংকটের কারণে আমাকে বাংলা, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) কিংবা ধর্মের ক্লাসও নিতে হচ্ছে। পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছাড়া একসঙ্গে একাধিক বিষয়ে কার্যকর পাঠদান করা কঠিন। ফলে শিক্ষার্থীদের শেখার ঘাটতি তৈরি হয়, যা পরীক্ষার ফলেও প্রভাব ফেলতে পারে। আমার মতে, মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার মান ও ফলের অবনতির পেছনে শিক্ষকস্বল্পতা একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ।
মাধ্যমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে নীতিনির্ধারক ও সরকারের কাছে আপনার প্রধান তিনটি সুপারিশ কী হবে?
আমি তিনটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিতে চাই। প্রথমত, প্রাথমিক পর্যায়ের শিখন ঘাটতি দূর করতে হবে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তৃতীয় শ্রেণীর ৭৫ শতাংশ এবং চতুর্থ শ্রেণীর ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থী ঠিকমতো বাংলা পড়তে পারে না। ইংরেজির ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। প্রাথমিক পর্যায়ে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন না করেই শিক্ষার্থীরা মাধ্যমিকে চলে এলে পরবর্তী স্তরে তাদের শিখন ঘাটতি পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এ সমস্যা সমাধানে আগামী তিন-পাঁচ বছর প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্তি মজবুত করার জন্য বিশেষ পরিকল্পনা ও কার্যক্রম গ্রহণ করা প্রয়োজন। শিক্ষার্থীরা যাতে প্রয়োজনীয় ভাষাগত ও মৌলিক দক্ষতা অর্জন করেই মাধ্যমিকে প্রবেশ করে, তা নিশ্চিত করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, তদারকি ও বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা জোরদার করতে হবে। বিদ্যালয় পরিদর্শক, জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ও উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাসহ তদারকির দায়িত্বে থাকা বিভিন্ন পদ দীর্ঘদিন শূন্য পড়ে থাকলে বিদ্যালয়গুলোর কার্যক্রম যথাযথভাবে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয় না। এসব পদ দ্রুত পূরণ করতে হবে এবং প্রতিটি বিদ্যালয়ে নিয়মিত পরিদর্শন ও কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। শুধু পরিদর্শন করলেই হবে না, চিহ্নিত সমস্যাগুলোর সমাধান এবং শিক্ষার মানোন্নয়নে গৃহীত পদক্ষেপের অগ্রগতিও পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
তৃতীয়ত, শিক্ষকদের বেতন, সামাজিক মর্যাদা ও পেশাগত স্বীকৃতি বাড়াতে হবে। শিক্ষকতা যেন মেধাবী ও যোগ্য ব্যক্তিদের কাছে আকর্ষণীয় পেশা হয়ে ওঠে, সেজন্য বিদ্যমান বেতন কাঠামোর উন্নয়ন এবং শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা জরুরি। পাশাপাশি ভালো কাজের স্বীকৃতি ও পুরস্কারের ব্যবস্থা থাকতে হবে। যোগ্য ব্যক্তিদের শিক্ষকতা পেশায় আকৃষ্ট করা এবং তাদের পেশাগতভাবে উৎসাহিত করার পরিবেশ তৈরি করা না গেলে শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়ন কঠিন হবে।















