শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) জরুরি সিন্ডিকেট সভায় পোষ্য কোটায় ভর্তি কার্যক্রম স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। গতকাল বিকালে অনুষ্ঠিত সভা শেষে রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ইফতিখারুল আলম মাসউদ সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান। এদিকে গত পাঁচ বছরে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে পোষ্য কোটায় ভর্তি হয়েছিলেন মোট ৪৪২ শিক্ষার্থী।

রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ইফতিখারুল আলম মাসউদ জানান, প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধায় শিক্ষার্থী ভর্তি স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত সিন্ডিকেট সভায়ও বহাল রাখা হয়েছে। পাশাপাশি শনিবার জুবেরী ভবনে শিক্ষক লাঞ্ছনার যে ঘটনা ঘটেছে, তার তদন্তের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এজন্য সিন্ডিকেট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। পাশাপাশি বিচার বিভাগীয় তদন্তও হবে।

জুবেরী ভবনে শিক্ষক লাঞ্ছনাকে নজিরবিহীন ঘটনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘একজন উপ-উপাচার্য শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হয়েছেন। এজন্য সিন্ডিকেট নিন্দা জ্ঞাপন করেছে। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের জন্য পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এছাড়া নিরপেক্ষ তদন্তের জন্য সিন্ডিকেট বিচার বিভাগীয় তদন্তেরও সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’

তবে সিন্ডিকেট সভায় পোষ্য কোটা স্থগিত রাখার সিদ্ধান্তের বিষয়ে হতাশা প্রকাশ করে কমপ্লিট শাটডাউনের ঘোষণা দিয়েছেন রাবি অফিসার্স সমিতির সভাপতি মোক্তার হোসেন। তিনি বলেন, ‘এ সিদ্ধান্তে আমরা হতাশ। কারণ দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ে এ সুবিধা আছে। এটি আমাদের না দেয়ায় আগামীকাল থেকে আমরা কমপ্লিট শাটডাউনে যাচ্ছি। তবে পরিবহন, পানি, বিদ্যুৎ আর রাকসু এর আওতামুক্ত থাকবে।’

এর আগে রাবিতে আগে কর্মরতদের সন্তানদের জন্য ৪ শতাংশ পোষ্য কোটা ছিল। গত পাঁচ শিক্ষাবর্ষে মোট ৪৪২ শিক্ষার্থী এ কোটায় ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের আইসিটি সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষে ৯৬ জন, ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষে ১০০ জন, ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষে ১১৩ জন, ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষে ৩৯ জন ও ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে ৯৪ শিক্ষার্থী পোষ্য কোটায় ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে সর্বশেষ ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে মেধা তালিকায় ৭৭১তম অবস্থানে থাকা শিক্ষার্থী ভর্তির সুযোগ না পেলেও পোষ্য কোটায় ৭ হাজার ৭০০-এর ওপরের অবস্থানে থাকা শিক্ষার্থী ভর্তির সুযোগ পেয়েছিলেন। এছাড়া পোষ্য কোটায় ৫ হাজার ২৫০-এর ওপরের অবস্থান থেকে আইন বিভাগে ও ৬ হাজার ৫৫০-এর ওপরের অবস্থান থেকে অর্থনীতি বিভাগে ভর্তির সুযোগ দেয়া হয়েছিল। এ শিক্ষাবর্ষে মেধা তালিকায় পাঁচ হাজারের ওপরে থেকে মোট ৩৮ শিক্ষার্থী পোষ্য কোটায় ভর্তি হয়েছেন। পরবর্তী সময়ে শিক্ষার্থীরা পোষ্য কোটা বন্ধের দাবিতে আন্দোলন করলে গত ২ জানুয়ারি পোষ্য কোটা বাতিলের ঘোষণা দেন উপাচার্য সালেহ্ হাসান নকীব।

তবে শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ১৮ সেপ্টেম্বর জরুরি একাডেমিক সভায় ১০ শর্তে পোষ্য কোটা পুনর্বহালের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এর পর থেকেই সাধারণ শিক্ষার্থীসহ সাবেক সমন্বয়ক ও রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনের নেতারা একত্রিত হয়ে প্রতিবাদ করেন। এদিন রাত ১১টা পর্যন্ত আন্দোলন চালান তারা। পরদিন শুক্রবার বিকালেও শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করেন, এছাড়া বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী পোষ্য কোটা বাতিলের দাবিতে আমরণ অনশন শুরু করেন। পোষ্য কোটা বাতিলের দাবিতে শিক্ষার্থীরা শনিবার বেলা সাড়ে ৩টায় উপাচার্যের বাসভবন ঘেরাও করে। এ সময় তারা উপ-উপাচার্যের গাড়ি আটকান। পাশাপাছি উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মাইন উদ্দিন খানের বাসভবনেও তালা ঝুলিয়ে দেন। এতে তিনি তার বাসভবনে প্রবেশ করতে না পারায় প্রক্টর মাহবুবুর রহমানসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের জুবেরী ভবনে প্রবেশের চেষ্টা করলে আবারো শিক্ষার্থীদের বাধার সম্মুখীন হন। এ সময় কর্মকর্তা-কর্মচারী, শিক্ষক ও উপ-উপাচার্যের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের হাতাহাতি হয়। এ ধস্তাধস্তিতে শিক্ষার্থীসহ কয়েকজন সাংবাদিক আহত হন। এরপর কয়েক ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকেন উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মাঈন উদ্দিন খান, রেজিস্ট্রার ইফতেখার আলম মাসউদ, প্রক্টর মাহবুবুর রহমান, রাকসু প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক এনামুল হকসহ অনেকে। রাতভর এ আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের চাপের মুখে রাত পৌনে ২টায় পোষ্য কোটার ভর্তি কার্যক্রম স্থগিত করেন উপাচার্য অধ্যাপক সালেহ্ হাসান নকীব এবং রোববার জরুরি সিন্ডিকেট সভায় তা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আশ্বাস দেন।

অপরদিকে, শনিবার পোষ্য কোটা নিয়ে আন্দোলন কর্মসূচিতে শিক্ষার্থীদের দ্বারা শিক্ষক লাঞ্ছনার ঘটনায় ওইদিন রাতেই কমপ্লিট শাটডাউন কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছিলেন শিক্ষক-কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। লাঞ্ছিতের ঘটনায় জড়িতদের শাস্তির আওতায় না নিয়ে আসা পর্যন্ত তারা এ কর্মসূচি চালিয়ে যাবেন বলে জানিয়েছিলেন। তবে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনের (রাকসু) সব কার্যক্রম তারা এ কর্মসূচির আওতামুক্ত রেখেছেন।