সিলেটের বিয়ানীবাজার গ্যাসক্ষেত্রের একটি কূপ ওয়ার্কওভার (পুনঃখনন) করে গ্যাসের সন্ধান পেয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি তেল-গ্যাস অনুসন্ধানকারী প্রতিষ্ঠান বাপেক্স। গ্যাসকূপটির তত্ত্বাবধান করছে সিলেট গ্যাস ফিল্ড কোম্পানি লিমিটেড (এসজিএফসিএল)। পরিত্যক্ত এ কূপে পুনঃখনন চালিয়ে পুনরায় গ্যাস পাওয়ার কথা নিশ্চিত করেছে কোম্পানিটি। এর মধ্য দিয়ে দীর্ঘ ছয় বছর পর পরিত্যক্ত কূপটি পুনরায় উৎপাদনে যাচ্ছে। গ্যাসকূপটি থেকে দৈনিক সাত-আট মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে বলে আশা করছেন এসজিএফসিএল ও পেট্রোবাংলাসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

তাদের হিসাব অনুযায়ী, কূপটি উৎপাদনে গেলে জাতীয় গ্রিডে বিয়ানীবাজার গ্যাস ফিল্ড থেকে দৈনিক ১৫-১৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে। বর্তমানে এ গ্যাস ফিল্ডের একটি কূপ থেকে (বিয়ানীবাজার-২) দৈনিক সাত মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করছে এসজিএফসিএল।

পেট্রোবাংলার পরিচালক এবং এসজিএফসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) প্রকৌশলী মো. শাহীনুর ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, পরিত্যক্ত একটি কূপ ওয়ার্কওভার করে গ্যাস পাওয়া গিয়েছে। গ্যাসে ফ্লো এখন ভালো দেখা যাচ্ছে। আগামী তিনদিন পর্যন্ত এটি পরীক্ষামূলক উৎপাদনে থাকবে। আশা করছি, এ কূপ থেকে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক সাত-আট মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ দেয়া যাবে।

এসজিএফসিএল সূত্রে জানা গিয়েছে, বিয়ানীবাজার গ্যাস ফিল্ডের ১ নম্বর কূপটি চার দশক আগের। ১৯৮১ সালে এ গ্যাস ফিল্ডে কূপ খনন শুরু হয়। এরপর গ্যাস ফিল্ডটি থেকে গ্যাস তোলা শুরু হয় ১৯৯১ সালে। ২০১৪ সালে কূপটির সরবরাহ কমলে একপর্যায়ে গ্যাস উত্তোলনও বন্ধ হয়ে যায়। ২০১৬ সালে কূপটি পুনরায় উৎপাদনে এলেও ওই বছরের শেষ নাগাদ তা আবারো বন্ধ হয়ে যায়। এরপর ২০১৭ সাল থেকে কূপটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে ছিল।

দেশে পুরনো ও নতুন কূপ খননের মাধ্যমে গ্যাসের অস্তিত্ব পাওয়ার বিষয়টিকে ইতিবাচক চোখে দেখছেন জ্বালানিসংশ্লিষ্টরা। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, দেশে জ্বালানির তীব্র সংকটকালীন মুহূর্তে গ্যাস পাওয়ার বিষয়টি আশাব্যঞ্জক। যদিও এ ধরনের উদ্যোগ আগে নেয়া গেলে আরো আগেই হয়তো ভালো খবর পাওয়া যেত।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ইজাজ হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, দেশে বিভিন্ন গ্যাসক্ষেত্রে গ্যাস পাওয়ার যে খবর পাওয়া যাচ্ছে সেটি আশাব্যঞ্জক। আমদানিনির্ভরতা না বাড়িয়ে স্থানীয় গ্যাস অনুসন্ধানেও আরো জোর দেয়া দরকার। পরিমাণে স্বল্প হলেও এ সংকটে এটুকু গ্যাস অনেক গুরুত্বপূর্ণ।

দেশে গ্যাস সরবরাহ সংকট কাটাতে নতুন কূপ খনন, উৎপাদনে থাকা কূপের সংস্কার এবং পরিত্যক্ত কূপ পুনঃখননের উদ্যোগ নিয়েছে পেট্রোবাংলা। এরই আওতায় বিয়ানীবাজার-১ কূপটির ওয়ার্কওভারের কাজ শুরু হয়। পরে বাপেক্সের ওই কূপে অনুসন্ধান কাজ চালিয়ে গ্যাসের মজুদ পায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১০ সেপ্টেম্বর ওই কূপে নতুন করে পুনঃখনন কাজ শুরু করে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানটি।

বাপেক্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আলী বণিক বার্তাকে বলেন, বিয়ানীবাজারের কূপটি চার দশক আগের। দীর্ঘ সময় কূপটি উৎপাদনে থাকলেও ছয় বছর ধরে পরিত্যক্ত অবস্থায় ছিল। এ কূপে বাপেক্স পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে গ্যাসের অস্তিত্ব পায়। এরপর মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে কূপটি থেকে গ্যাসের সন্ধান মিলল। এখন পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। গ্যাসের ফ্লো অনুযায়ী এটি থেকে দৈনিক সাত-আট মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ পাওয়া যাবে।

পেট্রোবাংলার গ্যাস মজুদের তথ্য অনুযায়ী, বিয়ানীবাজার গ্যাস ফিল্ডে ৯২ বিসিএফ (ডিসেম্বর-২০২১ পর্যন্ত) গ্যাস মজুদ রয়েছে। গ্যাসক্ষেত্রটিতে ২০৩ বিসিএফ গ্যাসের মজুদ আবিষ্কার হলেও এখন পর্যন্ত কূপটি থেকে ১১১ বিসিএফ গ্যাস উত্তোলন করা হয়েছে।

দেশে আইওসির (আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানি) কাছ থেকে কেনা প্রতি এমএমবিটিইউ গ্যাসের দাম ৩ ডলার মূল্য হিসাব ধরলে ৯২ বিসিএফ গ্যাসের বর্তমান বাজার মূল্য ২ হাজার ৭৬০ কোটি টাকা। এসজিএফসিএলের একটি নির্ভরযোগ সূত্র জানিয়েছে, মোট তিনটি কূপ খননে এসজিএফসিএলের সঙ্গে বাপেক্সের ২৬০ কোটি টাকার চুক্তি হয়। সে হিসেবে কূপটি খননে প্রায় ৮৭ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। বাপেক্সে বিজয়-১১ রিগ দিয়ে কূপটি ওয়ার্কওভারের কাজ করেছে।

পেট্রোবাংলা ২০২২-২৩ অর্থবছরের মধ্যে মোট ১৬টি কূপ খনন, উন্নয়ন ও সংস্কারের পরিকল্পনা নিয়েছিল। এর মধ্যে বিয়ানীবাজার-১ কূপটিও রয়েছে। এ কূপ থেকে দৈনিক পাঁচ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়ার আশা করা হয়েছিল যদিও এখন তা বেড়ে সাত-আট মিলিয়ন ঘনফুট হবে বলে আশা করছেন পেট্রোবাংলা ও বাপেক্সসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

দেশের জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ করছে দেশী-বিদেশী মিলিয়ে পাঁচ উৎপাদন কোম্পানি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অর্থাৎ মোট মজুদের অর্ধেকই রয়েছে এসজিএফসিএলের। যদিও পাঁচ বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন সবচেয়ে কম। মূলত নতুন কূপ খনন না করা, পুরনো কূপ সংস্কার না হওয়ায় এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে দাবি এসজিএফসিএলের কর্মকর্তাদের।

পেট্রোবাংলার গ্যাস মজুদের তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত দেশে মজুদকৃত গ্যাস ছিল নয় ট্রিলিয়ন কিউবিক ফিটের (টিসিএফ) কিছু বেশি। এর মধ্যে সিলেট গ্যাস ফিল্ডের আওতায় পাঁচটি গ্যাসক্ষেত্রে মজুদকৃত গ্যাস ছিল প্রায় সাড়ে চার টিসিএফের মতো। কোম্পানিটির আওতায় দুটি গ্যাস ফিল্ড—রশিদপুর ও কৈলাসটিলায় ৩ হাজার ৭৫৭ বিসিএফ গ্যাস মজুদ রয়েছে। অথচ পেট্রোবাংলার দৈনিক গ্যাস উৎপাদন প্রতিবেদন অনুযায়ী, জাতীয় গ্রিডে ৯-১০ নভেম্বরের এসজিএফসিএলের গ্যাস সরবরাহ ছিল দৈনিক ৮৮ মিলিয়ন ঘনফুট। একই সময়ে বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ড কোম্পানি লিমিটেডের (বিজিএফসিএল) সরবরাহ ছিল যেখানে ৬০৪ মিলিয়ন, বাপেক্সের ১২০ মিলিয়ন, শেভরনের ১ হাজার ৩১৩ মিলিয়ন ও তাল্লোর সরবরাহ ছিল ৪৮ মিলিয়ন ঘনফুট।

জ্বালানি বিভাগের তথ্য থেকে জানা যায়, এসজিএফসিএলের আওতায় যেসব গ্যাস ফিল্ড রয়েছে, সেগুলো ছয় দশক আগের পুরনো। ১৯৬০ সালের শুরুর দিকে এগুলো উৎপাদনে আসে। তাই জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘদিন একটি কূপ উৎপাদনে থাকলে তার গ্যাসের চাপ কমে যায়। কম্প্রেসার বসিয়ে গ্যাসের চাপ তৈরি করতে হয়, তাহলেই উৎপাদন বাড়ে। কিন্তু স্থানীয় কোম্পানিগুলোর আওতায় গ্যাস ফিল্ডগুলোর কূপ সংস্কারে বড় আকারে কিছু দেখা যায়নি। যেখানে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো তাদের আওতাধীন গ্যাস ফিল্ডে কম্প্রেসার বসিয়ে গ্যাস উৎপাদন আগের অবস্থায় রেখেছে।