বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্পের আওতায় নির্মিত টঙ্গী ফ্লাইওভারের পিচে (পেভমেন্ট) দেখা দিয়েছে ‘রাটিং’ বা চাকার চাপে সড়কের পিচ ডেবে যাওয়ার সমস্যা। উত্তরার হাউজ বিল্ডিং প্রান্তে ফ্লাইওভারটি শুরুর মাত্র ৫০ মিটার পর থেকেই দৃশ্যমান হচ্ছে এ ত্রুটি। প্রায় এক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিটুমিনের বিভিন্ন অংশ ডেবে গিয়ে তৈরি হয়েছে অসংখ্য অনাকাঙ্ক্ষিত খাঁজ। এতে ফ্লাইওভারে যানবাহন চলাচলে ঝুঁকি বাড়ার পাশাপাশি ধীরগতির কারণে তৈরি হচ্ছে তীব্র যানজট। ফ্লাইওভারটি চালু হয়েছিল ২০২২ সালের নভেম্বরে। মাত্র চার বছরের মধ্যে পিচ ডেবে যাওয়ার ঘটনাকে অস্বাভাবিক মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ফ্লাইওভারের পিচ ডেবে যাওয়ার জন্য নিম্নমানের নির্মাণকাজ ও উপকরণ ব্যবহার এবং অতিরিক্ত পণ্যবোঝাই যানবাহন চলাচলকে দায়ী করছেন অবকাঠামো বিশেষজ্ঞরা। ঢাকার বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত নির্মিত বিআরটি করিডোরের ফ্লাইওভারগুলো নির্মাণ করেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না গেজৌবা গ্রুপ কোম্পানি (সিজিজিসি) এবং জিয়াংসু প্রভিনশিয়াল ট্রান্সপোর্টেশন ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রুপ (জেটিইজি)। প্রকল্পটির মূল বাস্তবায়নকারী সংস্থা সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তর। অন্যদিকে প্রকল্পের আওতায় নির্মিত টঙ্গী ফ্লাইওভারসহ অন্য ফ্লাইওভারগুলো গড়ে উঠেছে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে।

টঙ্গী সেতু থেকে হাউজ বিল্ডিং পর্যন্ত ২ দশমিক ৩ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এ ফ্লাইওভারে সরজমিনে দেখা যায়, বিশেষ করে প্রবেশপথ ও র‍্যাম্পের অংশে চাকার চাপে বিটুমিন সরে গিয়ে গভীর খাঁজ তৈরি হয়েছে। এসব স্থানে যানবাহন ব্রেক করায় কিংবা ধীরগতিতে চলায় চাপ আরো বেশি পড়ছে। কোথাও কোথাও ডেবে যাওয়া অংশ এতটাই গভীর যে দ্রুতগতির গাড়িগুলো যাওয়ার সময় দুলে উঠছে, ফলে নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে চালকদের বেগ পেতে হচ্ছে।

পরিবহন চালকরা বলছেন, ফ্লাইওভারের কার্পেটিং ডেবে গিয়ে খাঁজ ও খানাখন্দ তৈরি হওয়ায় গাড়ি চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। চাকা আটকে গিয়ে প্রায়ই নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা এড়াতে বাধ্য হয়েই গতি একদম কমিয়ে দিতে হয়। এতে ব্যস্ত সময়ে যানবাহনের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হয়ে ফ্লাইওভারে কৃত্রিম যানজট তৈরি হচ্ছে, যা পুরো রুটের পরিবহন সময়সূচি এলোমেলো করে দিচ্ছে।

প্রকৌশলীদের ভাষায়, চাকার চাপে সড়কের বিটুমিন বা পেভমেন্ট ডেবে গিয়ে খাঁজ তৈরি হওয়াকে ‘রাটিং’ বলা হয়। এটি মূলত অতিরিক্ত পণ্য বহনের পাশাপাশি বিটুমিন ও পাথরের অনুপযুক্ত মিশ্রণ, অপর্যাপ্ত কমপ্যাকশন বা রোলিং এবং নির্মাণসামগ্রীর মানহীনতার কারণে ঘটে। তবে ফ্লাইওভারের ক্ষেত্রে নিচে মাটির পরিবর্তে শক্ত কংক্রিট স্ল্যাব থাকায় এত দ্রুত রাটিং দেখা দেয়াকে বেশ অস্বাভাবিক হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. সামছুল হক এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘যানবাহনের অতিরিক্ত বোঝাইয়ের পাশাপাশি বিটুমিনের মিশ্রণ ও কমপ্যাকশনের ত্রুটি এবং ধীরে গাড়ি চলার (ক্রিপ স্পিড) কারণেও রাটিং হতে পারে। তবে সাধারণ সড়কের মতো ফ্লাইওভারের নিচে মাটি থাকে না, বরং একটি শক্ত কংক্রিট স্ল্যাব থাকে। ফলে বিটুমিন ও এগ্রিগেটের (পাথর) সঠিক মিশ্রণ এবং ঠিকমতো কমপ্যাকশন হলে টঙ্গী ফ্লাইওভারে এত দ্রুত রাটিং হওয়ার কোনো সুযোগই নেই।’

তার মতে, ফ্লাইওভারের ওপর পেভমেন্ট বসে যাওয়ার মূল কারণ হতে পারে নির্মাণকাজের সময় ভেতরে প্রচুর ফাঁকা স্থান (ভয়েড) থেকে যাওয়া, যা গাড়ির চাপে এখন সংকুচিত হচ্ছে। আবার সঠিক কোণাযুক্ত (অ্যাঙ্গুলার) পাথরের পরিবর্তে সস্তা ও গোলাকার পাথর ব্যবহার করলেও বিটুমিনের মিশ্রণ চাপ সামলাতে না পেরে পাশে সরে যায়।

নির্মাণকাজ যথাযথভাবে তদারক না করাকেও রাটিংয়ের জন্য দায়ী করছেন ড. সামছুল হক। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বিটুমিন তৈরির প্লান্ট থেকে শুরু করে তা ফ্লাইওভারে পরিবহন ও রোলিং করা পর্যন্ত সার্বক্ষণিক প্রকৌশলী উপস্থিত থেকে ডেনসিটি পরীক্ষা করার নিয়ম রয়েছে। এ ধরনের তদারকি যথাযথভাবে না হলেই নির্মাণসামগ্রীর মানে আপস করার সুযোগ তৈরি হয়।’

রাটিং বা সড়কের পিচ ডেবে যাওয়ার পাশাপাশি বিআরটি প্রকল্পের এ ফ্লাইওভারের তদারকি ও রক্ষণাবেক্ষণ নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। সরজমিনে দেখা যায়, ফুটপাত ও আইল্যান্ডের পাশে আবর্জনা, প্লাস্টিক ও ধুলোর স্তূপ জমে আছে। কোথাও কোথাও ড্রেনেজ ব্লক হয়ে জমা হয়ে আছে পানি, যা বিটুমিন ঢালাইয়ের স্থায়িত্বের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এ ক্ষয় আরো দ্রুত বাড়ছে।

সড়ক ও মহাসড়কের নির্মাণসামগ্রীর মান যাচাইয়ে কাজ করে সওজ অধিদপ্তরের আওতাধীন প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় সড়ক গবেষণাগার। প্রতিষ্ঠানটির প্রকৌশলীরা জানান, বিটুমিন ও পাথরের মিশ্রণ সঠিক না হলে কিংবা যানবাহনের অতিরিক্ত বোঝাই থাকলে রাটিং হতে পারে। তবে টঙ্গী ফ্লাইওভারের ক্ষেত্রে স্ল্যাব বেইজ থাকায় মাটির রোলিংয়ের বিষয়টি আসছে না; বরং মিশ্রণের অনুপাত, পাথরের মান ও রোলিং তদারকিতে গাফিলতি ছিল কিনা তা খতিয়ে দেখা জরুরি।

এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে সওজ অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. মনিরুজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘টঙ্গীর ফ্লাইওভারটি বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ (বিবিএ) নির্মাণ করেছে। রাটিংয়ের বিষয়টির গুরুত্ব বিবেচনা করে আমি তাদের প্রকল্প পরিচালককে জানাচ্ছি।’

বিআরটি প্রকল্পের এ ফ্লাইওভারটির কিছু অংশ ২০২২ সালের নভেম্বরে যান চলাচলের জন্য খুলে দেয়া হয়। চালুর অল্প সময়ের মধ্যেই বিআরটি প্রকল্পের মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় পিচ ডেবে যাওয়ার ঘটনায় নির্মাণসামগ্রীর মান, তদারকি ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থার সার্বিক সক্ষমতা এখন প্রশ্নের মুখে।

প্রসঙ্গত, ২০ দশমিক ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ দেশের প্রথম বিআরটি করিডোর নির্মাণ প্রকল্পটি অনুমোদন হয় ২০১২ সালে। যদিও মাঠ পর্যায়ে পূর্ত কাজ শুরু হয় ২০১৭ সালে। মূল করিডোর নির্মাণের কাজ সম্পন্ন হলেও এখন পর্যন্ত স্টেশনসহ বিআরটি পরিষেবা পরিচালনার জন্য কিছু অবকাঠামো তৈরির কাজ বাকি। এ করিডোরে বিআরটি পরিষেবা আদৌ চালু হবে কিনা, তা নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি সরকার।