২০১২ সাল-পরবর্তী তিন বছর সোনালী ব্যাংক ইউকে লিমিটেডের শীর্ষ নির্বাহীর দায়িত্বে ছিলেন মো. আতাউর রহমান প্রধান। ওই সময় সংঘটিত অনিয়ম-দুর্নীতি আর পরিচালন ব্যর্থতায় বন্ধ হয়ে যাচ্ছে ব্যাংকটি। বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের মালিকানার একমাত্র ব্যাংকটি ডুবে গেলেও আতাউর রহমান প্রধান পুরস্কৃত হয়েছেন। রাষ্ট্রায়ত্ত বৃহৎ ব্যাংক সোনালীর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) পদে দায়িত্ব পেয়েছেন তিনি। এর আগে পেয়েছিলেন রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংকের এমডি পদও।
আতাউর রহমানের ব্যর্থতায় যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের ব্যাংকটি কেবল বন্ধ হওয়ার পথেই যায়নি, বরং বড় জরিমানার মুখেও পড়েছে। ২০১৬ সালে সোনালী ব্যাংক ইউকে-কে ৩২ লাখ ৫০ হাজার পাউন্ড জরিমানা করে যুক্তরাজ্যের আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফাইন্যান্সিয়াল কন্ডাক্ট অথরিটি (এফসিএ)। বাংলাদেশী মুদ্রায় যার পরিমাণ ৩৫ কোটি টাকারও বেশি। জরিমানার এ অর্থ রাষ্ট্রের কোষাগার থেকেই পরিশোধ করতে হয়েছে। শীর্ষ নির্বাহী হিসেবে দায়িত্বে অবহেলা, সুপারভাইজরি ঘাটতি ও অন্যান্য কারণে ৭৬ হাজার ৪০০ পাউন্ড জরিমানার মুখে পড়েন আতাউর রহমান প্রধানও।
যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের ব্যাংকটি পথ হারায় ২০১০ সাল-পরবর্তী সময়ে। এর মধ্যে ২০১২ সালের মার্চ থেকে ২০১৫ সালের মে পর্যন্ত ব্যাংকটির শীর্ষ নির্বাহীর দায়িত্বে ছিলেন আতাউর রহমান প্রধান। ওই সময় একের পর এক দুর্ঘটনা ও আর্থিক অপরাধ সংঘটিত হয় ব্যাংকটিতে। শেষ পর্যন্ত ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের সিদ্ধান্তে আগামী ১৬ আগস্ট বন্ধ হয়ে যাচ্ছে সোনালী ব্যাংক ইউকে।
বিদেশে বাংলাদেশের মালিকানাধীন গর্বের ব্যাংকটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার কুশীলব আতাউর রহমান প্রধান কীভাবে দেশের ব্যাংক খাতে পুনর্বাসিত হলেন, সেটি নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের আর্থিক খাতের প্রভাবশালী একটি অংশের আশীর্বাদে আতাউর রহমান প্রধান তিরস্কৃত হওয়ার পরিবর্তে পুরস্কৃত হয়েছেন। যুক্তরাজ্যের এফসিএ কর্তৃক জরিমানার মুখে পড়ার বিষয়টি ২০১৮ সালের ৪ ডিসেম্বর প্রকাশ করা হয়। এর পরও ২০১৯ সালে আতাউর রহমান প্রধান পদোন্নতি পেয়ে রূপালী ব্যাংক থেকে সোনালী ব্যাংকের এমডি হয়েছেন। বিনিময়ে তিনি প্রভাবশালী গোষ্ঠীকে রাষ্ট্রায়ত্ত এ দুটি ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ পাইয়ে দিতে সহযোগিতা করেছেন।
নিয়ন্ত্রক সংস্থা কর্তৃক কোনো ব্যাংক কর্মকর্তা শাস্তিপ্রাপ্ত হলে তিনি শীর্ষ নির্বাহী হতে পারবেন না বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি প্রজ্ঞাপন রয়েছে। তা সত্ত্বেও আতাউর রহমান প্রধান কীভাবে রূপালী ও সোনালী ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী হলেন, সেটি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকে দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা বলেন, যুক্তরাজ্যের ফাইন্যান্সিয়াল কন্ডাক্ট অথরিটির সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আতাউর রহমান প্রধান আপিল করেছেন। আপিল নিষ্পত্তি না হওয়ায় তাকে এমডি পদে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্য হলো, আপিল নিষ্পত্তি হওয়ার আগেই আতাউর রহমান প্রধান দুটি ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীর পদে মেয়াদ শেষ করতে চলেছেন।
যুক্তরাজ্যের আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা কর্তৃক শাস্তিপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে দেশের বৃহৎ ব্যাংকের এমডি নিয়োগ দেয়া দুঃখজনক বলে মন্তব্য করেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, এটি দুর্নীতিবাজদের সুরক্ষা দেয়ার পাশাপাশি পুরস্কৃত করার শামিল। প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতির সঙ্গেও সাংঘর্ষিক। দেশের মাটিতেই ব্যাংক খাতে দুর্নীতির অভিযোগের শেষ নেই। দেশের বাইরে গিয়েও যদি ব্যাংকাররা দুর্নীতিতে জড়ান সে অভিযোগ আরো ভয়ংকর। এর মাধ্যমে বিদেশীদের কাছে বাংলাদেশের মানুষ সম্পর্কে আরো বেশি নেতিবাচক বার্তা যাবে।
ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বিলম্বে হলেও এখনই সরকারের দায়িত্ব হবে, সোনালী ব্যাংক ইউকের বিপর্যয়ের সঙ্গে যুক্তদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা নেয়া। যাদের কারণে বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের একমাত্র ব্যাংকটি বন্ধ হয়ে গেল, তারা ছাড় পেয়ে গেলে দুর্নীতিবাজরা আরো বেশি উৎসাহিত হবে। ব্যাংক অব ইংল্যান্ড কর্তৃক সোনালী ব্যাংক ইউকে বন্ধ করে দেয়ার সিদ্ধান্তটি বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের বিষয়ে বহির্বিশ্বে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বাংলাদেশ সরকার ও রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকের জোগান দেয়া মূলধনে প্রতিষ্ঠিত হয় সোনালী ব্যাংক ইউকে। এর মধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়ের মালিকানা রয়েছে ৫১ শতাংশ। বাকি ৪৯ শতাংশ শেয়ারের মালিক সোনালী ব্যাংক লিমিটেড। ২০০১ সালে পূর্ণাঙ্গ ব্যাংক হিসেবে যুক্তরাজ্যে কার্যক্রম শুরু করে ব্যাংকটি। প্রতিষ্ঠার পর কয়েক দফায় দেশ থেকে মূলধন জোগান দেয়ায় এখন সোনালী ব্যাংক ইউকে লিমিটেডের মূলধনের পরিমাণ ৬ কোটি ৩৮ লাখ পাউন্ড। বাংলাদেশী মুদ্রায় যার পরিমাণ ৬৯৫ কোটি টাকা। অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সোনালী ব্যাংক ইউকে লিমিটেডকে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ৬ কোটি ডলার ঋণও দেয়া হয়েছে। যদিও শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের সব বিনিয়োগই মুখ থুবড়ে পড়েছে যুক্তরাজ্যের মাটিতে।
ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের প্রুডেন্সিয়াল রেগুলেশন অথরিটি (পিআরএ) এবং ফাইন্যান্সিয়াল কন্ডাক্ট অথরিটির (এফসিএ) সিদ্ধান্তে বন্ধ হচ্ছে সোনালী ব্যাংক ইউকে। গত ২৭ জানুয়ারি বিষয়টি সোনালী ব্যাংক ইউকে-কে জানিয়েও দেয়া হয়েছে। এ অবস্থায় যুক্তরাজ্যে অবস্থিত ব্যাংকটিকে বাঁচাতে তত্পর হয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। এজন্য সোনালী ব্যাংক ইউকের পরিবর্তে যুক্তরাজ্যে দুটি অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার প্রস্তাব দেয়া হচ্ছে। মোট চারটি প্রস্তাব দিয়ে এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে সারসংক্ষেপ পাঠাচ্ছে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ।
প্রস্তাবে যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বাংলাদেশীদের রেমিট্যান্স পাঠানোর জন্য ‘সোনালী পে ইউকে লিমিটেড’ এবং বাংলাদেশী ব্যাংকগুলোর ঋণপত্রের নিশ্চয়তা দেয়ার জন্য ‘সোনালী বাংলাদেশ (ইউকে) লিমিটেড’ নামে কোম্পানি তৈরির পরামর্শ দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে সোনালী পে ইউকের লাইসেন্সের জন্য বাংলাদেশ থেকে আরো ১০ লাখ পাউন্ড মূলধন জোগান দেয়ার কথা বলা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানোর জন্য প্রস্তুতকৃত অর্থ মন্ত্রণালয়ের সারসংক্ষেপে বলা হয়, ২০১৬ সালে নন-কমপ্লায়েন্স ইস্যুতে ব্যাংক অব ইংল্যান্ড সোনালী ব্যাংক ইউকের পাশাপাশি ব্যাংকটির তত্কালীন সিইও মো. আতাউর রহমান প্রধানকে (বর্তমানে তিনি সোনালী ব্যাংক লিমিটেডের সিইও এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্বে রয়েছেন) তার দায়িত্বে অবহেলা, সুপারভাইজরি ঘাটতি ও অন্যান্য কারণে ৭৬ হাজার ৪০০ পাউন্ড জরিমানা করে। ২০১৮ সালের ৪ ডিসেম্বর আতাউর রহমান প্রধানের বিরুদ্ধে আরোপিত শাস্তির সিদ্ধান্ত এফসিএর ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। ২০১৬ সালের ২২ সেপ্টেম্বর থেকেই সোনালী ব্যাংক ইউকের ব্যাংকিং কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়া হয়। এর পর থেকে ব্যাংকটি কেবল ট্রেড ফাইন্যান্স ও রেমিট্যান্স হাউজ হিসেবে সচল রয়েছে।
ব্যাংক অব ইংল্যান্ড কর্তৃক সোনালী ব্যাংক ইউকে বন্ধ করে দেয়ার সিদ্ধান্তকে বাংলাদেশের জন্য বেইজ্জতি হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদ ড. মইনুল ইসলাম। তিনি বলেন, অনিয়ম-দুর্নীতি হওয়ার কারণেই ব্যাংক অব ইংল্যান্ড সোনালী ব্যাংক ইউকে বন্ধ করে দিয়েছে। এর মাধ্যমে বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশ বেইজ্জতি হয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের উচিত হবে তদন্ত করে ব্যাংকটির বিপর্যয়ের জন্য কারা দায়ী সেটি খুঁজে বের করা। তদন্তে দোষী সাব্যস্ত হলে সোনালী ব্যাংকের বর্তমান এমডি আতাউর রহমান প্রধানের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেয়া দরকার।
আতাউর রহমান প্রধান সোনালী ব্যাংক ইউকের প্রধান নির্বাহী থাকার সময় ২০১৩ সালের ২ জুন ব্যাংকটির ওল্ডহ্যাম শাখা থেকে সুইফট কোড জালিয়াতির মাধ্যমে ২ লাখ ৫০ হাজার ডলার হাতিয়ে নেয়া হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর শাখাটি বন্ধ করে দেয় ব্যাংক অব ইংল্যান্ড। ২০১৭ সাল থেকে চালু আছে শুধু লন্ডন ও বার্মিংহাম শাখা। ২০১০ সালের ২০ আগস্ট থেকে ২০১৪ সালের ২১ জুলাই সময়ে অর্থ পাচার প্রতিরোধ ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে সোনালী ব্যাংক ইউকে লিমিটেডকে ৩২ লাখ পাউন্ড জরিমানা করে দেশটির আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা এফসিএ। বন্ধ করে দেয় নতুন হিসাব খোলা। এছাড়া সোনালী ব্যাংক ইউকের মুদ্রা পাচার প্রতিরোধ বিভাগের প্রধান স্টিভেন স্মিথকে এ ধরনের চাকরিতে নিষিদ্ধ ও ১৮ হাজার পাউন্ড জরিমানা করা হয়। আতাউর রহমান প্রধানের আগে ব্যাংকটির শীর্ষ নির্বাহী ছিলেন খোন্দকার মো. ইকবাল। পরবর্তী সময়ে তিনিও রাষ্ট্রায়ত্ত বেসিক ব্যাংকের এমডি পদে নিয়োগ পেয়েছিলেন।
সামগ্রিক বিষয়ে জানতে চাইলে আতাউর রহমান প্রধান বণিক বার্তাকে বলেন, আমার বিরুদ্ধে যুক্তরাজ্যের এফসিএ যে জরিমানা করেছে, সেটি কোনো অনিয়ম-দুর্নীতির জন্য নয়। সেটি ছিল পদ্ধতিগত ব্যর্থতার জন্য। তার পরও আমি এফসিএর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করেছি। আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে মন্তব্য করতে নিষেধাজ্ঞা আছে।










