ঢাকার সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালের ভিড় কমাতে এবং যাত্রীসেবা বাড়াতে নতুন উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে প্রায় ৩ হাজার ৪০০ কোটি টাকা ব্যয়ে এক প্রকল্পের অধীনে সদরঘাট থেকে এক কিলোমিটার দূরে পোস্তগোলার শ্মশানঘাটে আরেকটি লঞ্চ টার্মিনাল বানানোর পরিকল্পনা নেয়া হয় সংস্থাটির পক্ষ থেকে। কিন্তু গত বছরের ২৫ জুন পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পর থেকে দিন দিন কমেছে লঞ্চ ও যাত্রীর পরিমাণ। ফলে নতুন টার্মিনালের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিআইডব্লিউটিএ বলছে, নতুন বাস্তবতায় দ্বিতীয় টার্মিনাল নির্মাণ হলে এটি যাত্রীবাহী এবং বর্তমান সদরঘাটটি পণ্যবাহী টার্মিনাল হিসেবে ব্যবহার করার কথা ভাবা হচ্ছে। কিন্তু নৌ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঘাট পর্যন্ত নির্বিঘ্নে যাত্রীদের পৌঁছার মতো অবকাঠামো নির্মাণ না হলে শুধু টার্মিনাল নির্মাণ অপ্রয়োজনীয় হবে।
বিআইডব্লিউটিএ সূত্রে জানা গেছে, সদরঘাটের পাশাপাশি দেশের গুরুত্বপূর্ণ আরো তিনটি—চাঁদপুর, বরিশাল ও নারায়ণগঞ্জ নদীবন্দরের অবকাঠামোও বড় করা হবে। ক্রমবর্ধমান চাহিদা ও যাত্রী চাপের কারণে এ চার বন্দরের বিদ্যমান অবকাঠামো অপ্রতুল। বিশেষ করে এসব বন্দর এলাকা অত্যন্ত ঘনবসতি ও যানজটে পূর্ণ। ফলে যাত্রীসেবা বাড়ানোর লক্ষ্যে এ চার নদীবন্দরের অবকাঠামো বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয় বিআইডব্লিউটিএ। প্রকল্প অনুযায়ী ঢাকা নদীবন্দরের যাত্রী চাপ কমাতে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে শ্মশানঘাটে একটি নতুন যাত্রী টার্মিনাল নির্মাণ করে সদরঘাটের যাত্রী পরিষেবা বাড়ানোর পরিকল্পনা নেয়া হয়। নতুন টার্মিনালে থাকবে আধুনিক সব সুবিধা। এ টার্মিনালসহ বাকি তিনটি এবং অন্যান্য টার্মিনাল নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৩৪৯ কোটি ৪২ লাখ টাকা। এর মধ্যে বিশ্বব্যাংক দেবে ৩ হাজার ৫২ কোটি ৮০ লাখ টাকা। বাকি ২৯৬ কোটি টাকা দেবে বাংলাদেশ সরকার। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছে বিআইডব্লিউটিএ।
প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয় ২০১৬ সালে। কিন্তু গত বছর পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পর সে বাস্তবতা পুরোপুরি বদলে যায়। বর্তমানে সদরঘাটে নেই যাত্রী চাপ। চাঁদপুর-ভোলার লঞ্চগুলোয় কিছু যাত্রী থাকলেও বরিশালের যাত্রী একেবারেই কমেছে। লঞ্চ মালিকরা জানিয়েছেন, সেতু চালুর আগে প্রতিদিন রাত ৮টা থেকে ১২টা পর্যন্ত অন্তত ২৫-৩০টি লঞ্চ দক্ষিণাঞ্চলের উদ্দেশে ছেড়ে যেত। সেখানে পদ্মা সেতুর প্রভাবে যাত্রী এতই কমেছে যে বর্তমানে দৈনিক মাত্র চারটি লঞ্চ ছেড়ে যাচ্ছে বরিশালের উদ্দেশে। ফলে অনেক লঞ্চ বন্ধ করার পাশাপাশি অনেকগুলো নৌ-রুটও বন্ধ করে দিয়েছে বিআইডব্লিউটিএ। এমনকি লঞ্চ কেটে স্ক্র্যাপ আকারে বিক্রিও করে দিচ্ছেন লঞ্চ মালিকরা।
এমন পরিস্থিতিতে নতুন করে পোস্তগোলার শ্মশানঘাট নির্মাণের বাস্তবতা কী জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার মো. আইয়ুব আলী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রকল্পটি যখন নেয়া হয়েছিল তখন এক রকম বাস্তবতা ছিল। এখন আরেক বাস্তবতার মুখোমুখি আমরা। পোস্তগোলায় নতুন লঞ্চ টার্মিনাল নির্মাণের বিষয়টি এখনো বিবেচনার সুযোগ আছে। চলতি মাস শেষ হলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো যাবে। তবে আমাদের পরিকল্পনা হলো বর্তমান সদরঘাটটি পণ্যবাহী এবং নতুন টার্মিনালটি যাত্রীবাহী হিসেবে ব্যবহার করা হবে। যদিও বরিশালের যাত্রী ও লঞ্চ দুটোই কমেছে, কিন্তু চাঁদপুর-ভোলাসহ কয়েকটি রুটে এখনো চাহিদা রয়েছে।’
যদিও বিআইডব্লিউটিএর যুক্তি, বর্তমানে যাত্রী চাপ কম থাকলেও ভবিষ্যতে যাত্রী চাপ বাড়বে। তবে এ যুক্তির পক্ষে একমত নন নতুন লঞ্চ টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত একজন কর্মকর্তা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নতুন টার্মিনালটি নির্মাণের প্রয়োজন আছে না নেই সেটা গত এক বছরের যাত্রী চাপের দিকে তাকালেই পরিষ্কার হবে। টার্মিনালে যাত্রী নেই, লঞ্চের ভিড় নেই, এমন পরিস্থিতিতে নতুন টার্মিনাল বানানো বিলাসিতা ছাড়া আর কী? বলা হচ্ছে, যাত্রী বাড়তে পারে, কিন্তু যাত্রী বাড়ার যৌক্তিকতা আমরা দেখি না। তবে এটা ঠিক, নৌপথে পণ্য পরিবহন বাড়বে। সে হিসেবে সদরঘাট ঠিক আছে। কিন্তু যাত্রীবাহী অল্প কয়েকটা লঞ্চের জন্য এত ব্যয়বহুল টার্মিনাল বানানো অযৌক্তিক।’
যদিও নতুন টার্মিনাল বানানোর যৌক্তিকতা আছে বলে মনে করছেন বাংলাদেশ লঞ্চ মালিক সমিতির সভাপতি মাহবুব উদ্দিন আহমেদ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘বর্তমানে আমাদের যে জাহাজগুলো আছে সেগুলোর জন্য সদরঘাটে পর্যাপ্ত পন্টুন নেই। তাছাড়া নতুন লঞ্চঘাটে যদি আধুনিক যাত্রীসেবা দেয়া যায় তাহলে পর্যটনের নতুন দুয়ার খুলবে। যাদের তাড়া নেই তাড়া আয়েশ করে লঞ্চে যাবে। অসুস্থ-বৃদ্ধরাও লঞ্চে যাতায়াত করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। সে হিসেবে যাত্রী ও লঞ্চ দুটোই বাড়তে পারে।’
শুধু টার্মিনাল নির্মাণ করলেই হবে না, সেই সঙ্গে সড়ক অবকাঠামোও নির্বিঘ্ন হতে হবে বলে মনে করেন এ লঞ্চ মালিক নেতা। তিনি বলেন, ‘অনেক সুন্দর আধুনিক টার্মিনাল বানানো হলো কিন্তু যাত্রীরা স্বাচ্ছন্দ্যে ঘাটে আসতে পারল না বা ঘাটে এসে সুন্দর ব্যবস্থাপনা পেল না, তাহলে টার্মিনালটি তার আবেদন হারাবে। তাই আমাদের দাবি, এখানে যে ঘনবসতি ও অবৈধ স্থাপনা আছে এর সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা করতে হবে। পাশাপাশি মেট্রোরেলের একটি লাইন যেন সদরঘাট পর্যন্ত দেয়া হয় সেটাও সরকার ভেবে দেখতে পারে।’










