বর্ষা মৌসুমে ঝড় কিংবা জলোচ্ছ্বাসের কারণে অনেক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপকূল। উপকূলের বিভিন্ন ইউনিয়নকে এসব ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করতে সাত বছর আগে উপকূলজুড়ে বেড়িবাঁধ নির্মাণ প্রকল্প পাস করা হয়। কিন্তু অনিয়ম, কাজের নিম্নমান কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে আজও শেষ হয়নি প্রকল্পটির কাজ। ২৯৪ কোটি টাকা ব্যয়ে নেয়া এ প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হতে চললেও নতুন করে সিসি ব্লক দেবে যাওয়ায় কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন অনেকে।
যদিও পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কর্মকর্তাদের দাবি, প্রকল্পের কাজ চলাকালেই ঘূর্ণিঝড়, জোয়ার-ভাটার কারণে কয়েক দফায় ভাঙনের মুখে পড়েছে বাঁধটির কার্যক্রম। ভাঙনের জায়গাগুলো শনাক্ত করে সময়ের আগে সংস্কার করে কাজ বুঝিয়ে দেয়ারও প্রতিশ্রুতি দেন তারা।
পাউবো সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম জেলার বাঁশখালী উপজেলার পোল্ডার নং-৬৪/১এ, ৬৪/১বি ও ৬৪/১সির সমন্বয়ে ক্ষতিগ্রস্ত অংশের স্থায়ী পুনর্বাসন প্রকল্পটি হাতে নেয়া হয় ২০১৫ সালে। সে বছরেরই ১৯ মে ২৫১ কোটি ২৯ লাখ টাকা ব্যয় ধরে প্রায় ১৪ কিলোমিটার দীর্ঘ বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পটি একনেকে পাস হয়। পরবর্তী সময়ে প্রকল্পের কাজ শুরু হলে বাঁধ ভেঙে যাওয়া, সিসি ব্লক ধসে পড়া, ঘূর্ণিঝড়ের কারণে বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি প্রবেশের কারণে কয়েক দফা সংস্কার করা হয়। তাতে প্রকল্প ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সংশোধিত ব্যয় ৪২ কোটি ৩১ লাখ টাকা বাড়িয়ে ২৯৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা করা হয়। প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয় ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত।
প্রকল্পটি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সাতটি ফেজে প্রায় ১৪ কিলোমিটার বাঁধটির নির্মাণ ও সংস্কারকাজ করা হচ্ছে। এর মধ্যে প্রথম ফেজে দুই কিলোমিটার বাঁধ পুনরাকৃতি করা, দ্বিতীয় ফেজে বাঁধের ঢাল সংরক্ষণসহ ব্রিড রেজিং ৫ দশমিক ৮০৬ কিলোমিটার, তৃতীয় ফেজে বাঁধের ঢাল সংরক্ষণসহ ব্রাঞ্চ কেজিং দশমিক ৮৬ কিলোমিটার, চতুর্থ ফেজে ঢাল সংরক্ষণসহ বাঁধ পুনরাকৃতি করা ১ দশমিক ২৬৪ কিলোমিটার, পঞ্চম ফেজে ঢাল সংরক্ষণসহ পুনরাকৃতি করা ২ দশমিক ৩৪ কিলোমিটার, ষষ্ঠ ফেজে নদীর তীর সংরক্ষণ (সাঙ্গু নদী) দশমিক ৪ কিলোমিটার এবং সপ্তম ফেজে নদীতীর সংরক্ষণ ৩ দশমিক ৪১৮ কিলোমিটার। অর্থাৎ ৬ দশমিক ২ কিলোমিটার বাঁধের ঢাল সংরক্ষণ, ভাঙন রোধ ও পুনরাকৃতি করা, ৩ দশমিক ৮ কিলোমিটার নদীর তীর সংরক্ষণ এবং ৫ দশমিক ৬ কিলোমিটার বাঁধ পুনরাকৃতি করা হচ্ছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী প্রায় ৮৯ শতাংশের বেশি কাজ সম্পন্ন হয়েছে।
বাঁশখালীর খানখানাবাদের প্রেমাশিয়া ও রায়ছটা এলাকার উপকূলীয় বাঁধের সংস্কার এলাকা ঘুরে দেখা যায়, লোকালয়ে পানির প্রবেশ ঠেকাতে সিসি ব্লকের মাধ্যমে বাঁধ নির্মাণের কাজ চলছে। অনেক জায়গায় সিসি ব্লক বসানোর কাজ শেষ হলেও সমুদ্রের পানির চাপে ব্লকের নিচে মাটি সরে দেবে গেছে। আবার কোথাও নিম্নমানের কাজের কারণে ব্লকগুলো উঠে নিচের দিকে ধসে পড়েছে। অনেক জায়গায় গত কয়েক বছরে কয়েক দফায় সংস্কারকাজ করেও ভাঙন থেকে রক্ষা করা যায়নি।
বাঁশখালী উপকূলজুড়ে এ বাঁধ খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলেই মনে করেন স্থানীয়রা। সঠিকভাবে সংস্কার করা না হলে আসন্ন বর্ষা মৌসুমে আরো বড় ধরনের ভাঙন দেখা যেতে পারে বলে জানান তারা। বেড়িবাঁধ এলাকার বাসিন্দা মো. মনিরুল ইসলাম বণিক বার্তাকে জানান, বেড়িবাঁধ এলাকায় যেসব সিসি ব্লক বসানো হয়েছে, তা কয়েক দফায় ধসে ভাঙনের মুখে পড়েছে। অনেক বড় এলাকা হওয়ার কারণে এক পাশে ঠিক করা শুরু করলে আরেক পাশে ভাঙন শুরু হয়। ঠিকমতো বাঁধ এলাকার মাটি সংরক্ষণ না করে সিসি ব্লক বসানোর কারণে স্থায়ীভাবে সমাধান করা যাচ্ছে না। পাউবোর ঠিকাদারদের কাজে অবশ্যই কোনো না কোনো গাফিলতি আছে। না হলে গত ছয়-সাত বছরে কেন বাঁধটি সংস্কার করে স্থায়ী রূপ দেয়া যেত।
পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী ও বেড়িবাঁধ নির্মাণের প্রকল্প পরিচালক মো. নাহিদ উজ-জামান খান বণিক বার্তাকে বলেন, শুরুর দিকের নকশা অনুযায়ী কাজ করার কারণে বেড়িবাঁধ নির্মাণে কিছুটা সমস্যা হয়েছে। সমুদ্রতীরবর্তী এলাকায় বেড়িবাঁধ নির্মাণের কারণে বারবার ভাঙন, জোয়ার-ভাটার লবণাক্ত পানির প্রবেশে মাটি ক্ষয়ের কারণে বেড়িবাঁধটি সংস্কার করতে সময় লাগছে। আশা করি প্রকল্পের মেয়াদ অনুযায়ী কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হবে। তবে কয়েক দফায় সংস্কারকাজ করা হলেও প্রকল্প ব্যয় বাড়বে না।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাঁধ নির্মাণের এ প্রকল্প নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ অনেক পুরনো। তাছাড়া পর্যাপ্ত সমীক্ষা ছাড়াই নকশা করে কাজ করার কারণে তীরবর্তী এলাকায় বারবার ভাঙন সৃষ্টি হয়েছে। বালি ও কঙ্করের মিশ্রণ ভালো না হওয়ায় প্রকল্প চলমান সময়ে বিভিন্ন স্থানে দেবে যাওয়া কিংবা ব্লক উঠে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে। সম্ভাব্যতা যাচাই করে সঠিক মানমাত্রা ব্যবহার করে কাজ করলে সিসি ব্লকের স্থায়িত্ব দীর্ঘমেয়াদি হবে। প্রকল্প বুঝিয়ে দেয়ার পর আবারো নতুন করে যেন ভাঙন সৃষ্টি না হয় সে বিষয়ে নজরদারি করতে হবে পাউবোকেই।










