দেশে জনসংখ্যা যে হারে বাড়ছে, সে হারে বাড়ছে না কৃষি উৎপাদন। এর পেছনে খাতটিতে অপ্রতুল ঋণপ্রবাহ বড় একটি কারণ হিসেবে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। তাই প্রান্তিক পর্যায়ের দরিদ্র কৃষকদের কৃষি ও পল্লীঋণ সহজলভ্য করা এবং ব্যাংক ও কৃষকদের মধ্যকার দূরত্ব কমিয়ে আনার কৌশল নির্ধারণে গত মাসে কৃষি মন্ত্রণালয়ে একটি বৈঠক হয়। সেখানে জানানো হয়, প্রকৃত প্রান্তিক কৃষকদের সঠিক কোনো ডাটাবেজ নেই। ফলে কৃষিঋণের চাহিদা রয়েছে—এমন কৃষক নির্বাচন বেশ কষ্টসাধ্য। কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সায়েদুল ইসলামের সভাপতিত্বে হওয়া বৈঠকের কার্যবিবরণীতে এ তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।

বৈঠকে জানানো হয়, সঠিক ডাটাবেজ না থাকায় প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রান্তিক কৃষকদের কৃষিঋণের সুবিধা দেয়া যথেষ্ট কষ্টসাধ্য। ঋণের আবেদন প্রক্রিয়াও গ্রামীণ কৃষকদের জন্য বেশ কঠিন। অন্যদিকে এনজিওর মাধ্যমে ঋণ দিতে গেলে সুদের হার অনেক বেড়ে যায়। প্রকৃত কৃষকের জন্য তখন সেই কৃষিঋণ উল্টো বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। এছাড়া ঋণ প্রক্রিয়ায় মধ্যস্বত্বভোগীদের অবস্থান কৃষিঋণের সুফল পাওয়ার ক্ষেত্রে একটি বড় অন্তরায় বলে সভায় অভিমত ব্যক্ত করেন সংশ্লিষ্টরা।

মন্ত্রণালয়ের ওই সভায় বেশকিছু সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এর মধ্যে রয়েছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর প্রকৃত প্রান্তিক কৃষকদের ডাটাবেজ তৈরি করে ঋণ প্রদানকারী ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে সরবরাহ করবে। ওই ডাটাবেজ অনুযায়ী বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো প্রকৃত কৃষকদের চিহ্নিত করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ঋণ দেবে। ব্যাংকিং সেবাকে কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে হবে। এজন্য ঋণের আবেদন প্রক্রিয়া সহজ করাসহ হাটবাজারে প্রকাশ্যে ঋণ দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। উপজেলা বা ইউনিয়ন পর্যায়ে কৃষকদের নিয়ে অনুষ্ঠেয় সভা কিংবা প্রশিক্ষণে ব্যাংক কর্মকর্তাদের আমন্ত্রণ জানাতে হবে এবং কৃষিঋণ বিষয়ে আলোচনা রাখতে হবে। কৃষিঋণকে কৃষকের কাছে সহজলভ্য করার উদ্দেশ্যে জেলা বা উপজেলা পর্যায়ে আয়োজন করতে হবে কৃষিঋণ মেলা। এ উদ্দেশ্যে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর একটি বার্ষিক কৃষিঋণ মেলাবিষয়ক ক্যালেন্ডার তৈরি করবে এবং ব্যাংক ও জেলা বা উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে তা আয়োজন করবে। এসব বিষয়ে ঋণ প্রদানকারী বাংলাদেশ ব্যাংক বা আর্থিক ব্যাংক কিংবা সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে ব্যাপক প্রচারণার ব্যবস্থা নিতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা জারি করতে পারে। এছাড়া কৃষিঋণ বিতরণ লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী স্বচ্ছতার সঙ্গে প্রকৃত প্রান্তিক কৃষকের কাছে তা বিতরণের বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংক নিবিড়ভাবে মনিটর করবে বলে বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

এদিকে ২০২২-২৩ অর্থবছরের কৃষি এবং পল্লীঋণ নীতিমালা ও কর্মসূচি শীর্ষক বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, দেশের অর্থনীতি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কৃষি খাতের ওপর নির্ভরশীল। বিবিএসের প্রভিশনাল হিসাবায়ন অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) কৃষি খাতের অবদান ১১ দশমিক ৫০ শতাংশ। শিল্প ও সেবা খাতের প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রেও কৃষি খাতের পরোক্ষ অবদান রয়েছে। এছাড়া দেশের মোট শ্রমজীবীর ৪০ দশমিক ৬০ শতাংশ (লেবার ফোর্স সার্চে ২০১৬-১৭-এর তথ্যানুযায়ী) প্রত্যক্ষভাবে কৃষির সঙ্গে জড়িত। কৃষি খাত খাদ্য উৎপাদনের পাশাপাশি পুষ্টি সমস্যা সমাধান, রফতানি আয় বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সর্বোপরি দেশের অভ্যন্তরীণ মোট উৎপাদন বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। এমনকি পরিবেশ বিপর্যয় ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বিরূপ প্রভাব মোকাবেলায়ও কৃষির ভূমিকা ব্যাপক। তাই দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য কৃষি খাতের চলমান অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখা অত্যাবশ্যক।

বিষয়টি নিয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. বেনজীর আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘শতকোটি টাকার বেশি ব্যয়ে একটি প্রকল্পের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, সেখানে কৃষকদের জন্য মাঠকার্ড তৈরি করা হবে। প্রাথমিকভাবে এটি ১ কোটি ৯ লাখ কৃষকের জন্য তৈরি হবে। এতে কৃষকদের বিষয়ে আনুমানিক ১৪৫-১৭৯ ধরনের তথ্য থাকবে। তবে এ নিয়ে এখনো কাজ চলছে। মাঠকার্ড তৈরি হলে একজন কৃষককে বীজ-সার থেকে শুরু করে সব ধরনের সহায়তা দেয়ার সুযোগ তৈরি হবে। স্বচ্ছতাও আসবে এসব কাজে। এ কার্ডের মাধ্যমে কৃষকদের ব্যাংকঋণ পাওয়ারও সুযোগ তৈরি হবে। পরবর্তী সময়ে এ কার্ড তৈরির আওতা আরো বাড়ানো হবে।’