বিশ্বজুড়ে নভেল করোনাভাইরাসজনিত মহামারীর প্রভাবে ২০২০-২১ অর্থবছরে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস লিমিটেডের যাত্রীসংখ্যা কমেছে ৫২ শতাংশ। যার কারণে এক বছরের ব্যবধানে রাষ্ট্রায়ত্ত এ উড়োজাহাজ পরিবহন সংস্থাটির মোট রাজস্ব আহরণ ১৮ শতাংশ কমেছে। তবে একই সময়ে পরিচালন ব্যয় ৩০ শতাংশ অর্থাৎ প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা কমিয়েছে বিমান। এতে  আগের অর্থবছরে সংস্থাটি ৮১ কোটি টাকা লোকসান করলেও গত অর্থবছর শেষে মুনাফার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৫৮ কোটি টাকা।  

সম্প্রতি বিমানের প্রধান কার্যালয় বলাকায় সংস্থাটির ১৪তম বার্ষিক সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হয়। এ সভার কার্যপত্র সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

কার্যপত্রে দেখা গেছে, ২০২০-২১ অর্থবছরে বিমান বাংলাদেশ যাত্রী পরিবহন করেছে নয় লাখ, যা আগের অর্থবছরে ছিল ২০ লাখ। অর্থাৎ এক বছরে যাত্রী পরিবহন কমেছে প্রায় ৫২ শতাংশ। একই সময়ে এ খাত থেকে সংস্থাটি আয় করেছে ২ হাজার ৪১৯ কোটি টাকা, যা আগের অর্থবছরে ছিল ৩ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা। সে হিসেবে আয় কমেছে ৩২ শতাংশ। তবে গত অর্থবছরে সংস্থাটির কার্গো পরিবহন বেড়েছে ২৪ শতাংশ। এ সময়ে বিমান কার্গো পরিবহন করেছে ২৮ হাজার ১৫৯ টন। আগের অর্থবছরে যার পরিমাণ ছিল ২২ হাজার ৬৫১ টন।

কার্যপত্র অনুযায়ী সংস্থাটির গত অর্থবছরের মোট আয় ৪ হাজার ১২৮ কোটি টাকা, যা আগের অর্থবছর ছিল ৫ হাজার ৪৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ আগের বছরের তুলনায় গত অর্থবছর আয় কমেছে প্রায় ১৮ শতাংশ।

২০২০-২১ অর্থবছরে সার্বিক লোকসানের পরিমাণও ১৪ শতাংশ কমিয়ে এনেছে বিমান। এ সময়ে সংস্থাটির সার্বিক লোকসানের পরিমাণ কমে দাঁড়িয়েছে ৯৪১ কোটি টাকা। ২০১৯-২০ অর্থবছরে যা ছিল ১ হাজার ১০৬ কোটি টাকা।

সরকারি সংস্থাটি পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী গত অর্থবছর আগের অর্থবছরের চেয়ে প্রায় ৩০ শতাংশ পরিচালন ব্যয় কমিয়েছে। তাই আয় কমলেও ২০২০-২১ অর্থবছর শেষে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ১৫৮ কোটি টাকা লাভ করতে সক্ষম হয়েছে। এর আগের অর্থবছরে সংস্থাটির লোকসানের পরিমাণ ছিল ৮১ কোটি টাকা। সে হিসেবে লাভের প্রবৃদ্ধি ২৯৫ শতাংশ। গত অর্থবছরে বিমান বাংলাদেশের পরিচালন ব্যয় কমে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৩৭৭ কোটি টাকা। ২০১৯-২০ অর্থবছরে যা ছিল ৪ হাজার ৭৯২ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে পরিচালন ব্যয় কমেছে ১ হাজার ৪১৫ কোটি টাকা।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস বলছে, সংস্থাটি করোনা মহামারীতে বিভিন্ন দেশে আটকে থাকা বাংলাদেশী নাগরিকদের দেশে ফিরিয়ে এনেছে। বিশেষ করে চীন ও ইতালি থেকে প্রবাসীদের দেশে নিয়ে এসেছে। এছাড়া অনেক নন-শিডিউল ফ্লাইটের মাধ্যমে চীন থেকে ভ্যাকসিন ও সিরিঞ্জ নিয়ে এসেছে। বিমানের অত্যাধুনিক চারটি ড্রিমলাইনারের মাধ্যমে জাতিসংঘ মিশন ও চার্টার্ড ফ্লাইট পরিচালনা করার মাধ্যমে সংস্থাটি লাভজনক অবস্থায় পৌঁছেছে।

মহামারীর কারণে যে লোকসান হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে গত অর্থবছর থেকেই কর্মীদের বেতন কাটা ও ওভারটাইম সুবিধা বাতিল করে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। এ পদ্ধতি অবলম্বন করে ২০২০-২১ অর্থবছরে ৮৮ কোটি টাকা সাশ্রয় করে সংস্থাটি। বেতন কাটা, ওভারটাইম সুবিধা বাতিল করার মাধ্যমে পরিচালন ব্যয় কিছুটা কমলেও এ কারণে প্রায় বছরজুড়েই ক্ষুব্ধ ছিলেন বিমানের পাইলট, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও ড. আবু সালেহ্ মোস্তফা কামাল বণিক বার্তাকে বলেন, পরিচালন ব্যয় কমানোর জন্য আমরা অর্থবছরের শুরু থেকেই পরিকল্পনা গ্রহণ করি। সে সময়ই রুট ঠিক করার পাশাপাশি জ্বালানি সাশ্রয় করার উদ্যোগ নেয়া হয়। এছাড়া ব্যয় কমানোর জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও মন্ত্রণালয় বিভিন্ন সময় বিভিন্ন দিকনির্দেশনা দিয়েছিল। সেগুলো বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হয়েছে। এসব মিলিয়েই ব্যয় কমাতে আমরা সক্ষম হয়েছি।

জ্বালানির ব্যয়ও পরিচালন ব্যয়ের মধ্যে পড়ে, এক্ষেত্রে যথাসময়ে অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে কিনা জানতে চাইলে  তিনি বলেন, বিমান যেসব সংস্থার কাছ থেকে জ্বালানি নেয় থাকে তাদের কিছু বকেয়া রয়েছে। তবে গত অর্থবছরে যে পরিমাণ জ্বালানি কেনা হয়েছে, তার পুরো অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে। সুতরাং পাওনা অর্থ পরিশোধ না করে লাভ দেখানো হচ্ছে বিষয়টি এমন নয়। সবার যৌথ প্রচেষ্টায় লাভ করা সম্ভব হয়েছে বলেও জানান তিনি।

বিমানের আয়-ব্যয় শাখার তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯১-৯২ থেকে ২০০৩-০৪ অর্থবছর পর্যন্ত বিমান ছিল লাভজনক প্রতিষ্ঠান। এর পর থেকে টানা লোকসানে পড়ে প্রতিষ্ঠানটি। ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিমানকে পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি করে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দুই বছরই লাভ করে বিমান। ২০০৯-১০ থেকে ২০১৩-১৪ পর্যন্ত টানা পাঁচ বছর লোকসান দেয় বিমান। তারপর তিন অর্থবছর লাভ করে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে এসে আবারো লোকসান দেয় বিমান। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ২১৮ কোটি টাকা লাভ করে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে আবার ৮১ কোটি টাকা লোকসান করে সংস্থাটি। ১২ অর্থবছরের মধ্যে সাত অর্থবছরই লোকসানে ছিল বিমান। এ সময় সংস্থাটির মোট লোকসানের পরিমাণ ১ হাজার ৫৩৭ কোটি টাকা। বাকি পাঁচ অর্থবছরে লাভ হয়েছে ৯৩৫ কোটি টাকা।