বিশ্ববাজারে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) দাম ক্রমেই বাড়ছে। জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ ঠিক রাখতে বর্তমানে বাড়তি মূল্যেই পণ্যটি আমদানি করতে হচ্ছে পেট্রোবাংলাকে। তাই সংস্থাটির এ বাবদ ব্যয়ও বেড়েছে কয়েক গুণ। এ পরিস্থিতিতে সম্প্রতি এলএনজি আমদানিতে বাজেট থেকে ভর্তুকি বাবদ ৩২ হাজার কোটি টাকারও বেশি চায় পেট্রোবাংলা। তবে বাজেট থেকে এ পরিমাণ অর্থ দেয়া সম্ভব না হওয়ায় তাদের চাওয়ায় সাড়া দেয়নি অর্থ বিভাগ। এমন পরিস্থিতিতে গত সপ্তাহে পেট্রোবাংলার পক্ষ থেকে জরুরি ভিত্তিতে ১ হাজার ১৯০ কোটি টাকা চাওয়া হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত বুধবার ১ হাজার কোটি টাকা ছাড় করেছে অর্থ বিভাগ। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। 

চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরে এলএনজি আমদানির জন্য বাজেট থেকে ভর্তুকি বাবদ ৩২ হাজার ২১৯ কোটি টাকা চেয়ে গত ১৩ জানুয়ারি জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে প্রস্তাব পাঠায় পেট্রোবাংলা। প্রশাসনিক বিভাগ হিসেবে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ সেই প্রস্তাবটি অর্থ বিভাগে পাঠায়।

এ প্রসঙ্গে নাম না প্রকাশের শর্তে অর্থ বিভাগের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, এবারের বাজেটে এলএনজি আমদানিতে ভর্তুকি বাবদ ৪ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। সেখান থেকে গত জানুয়ারি পর্যন্ত ৩ হাজার কোটি টাকা ছাড় করা হয়। তারপর পেট্রোবাংলা ১৩ জানুয়ারি মোট ভর্তুকি বাবদ ৩২ হাজার ২১৯ কোটি টাকা চাহিদা পাঠায়। এর মধ্যে এলএনজি ভর্তুকি বাবদ চাওয়া হয় ২৫ হাজার ২১৯ কোটি এবং এনবিআরের পাওনা পরিশোধ বাবদ ৭ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু বাজেট থেকে এত টাকা কোনোভাবেই ছাড় করা সম্ভব নয় বিধায় এ বিষয়ে কোনো উদ্যোগ নেয়নি অর্থ বিভাগ।

পরবর্তী সময়ে গত সপ্তাহে জরুরি ভিত্তিতে ১ হাজার ১৯০ কোটি টাকা চায় পেট্রোবাংলা। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত বুধবার তাদের অনুকূলে ১ হাজার কোটি টাকা ছাড় করা হয়েছে। ছাড়পত্রে বলা হয়, গ্যাসের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে এ অর্থ ছাড় করা হলো। সব মিলিয়ে চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরে ভর্তুকি বাবদ পেট্রোবাংলাকে ৪ হাজার কোটি টাকা দেয়া হলো। এর আগে ২০২০-২১ অর্থবছরে দেয়া হয়েছিল সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা। তার আগের অর্থবছরে সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা ও ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এ খাতে দেয়া হয়েছিল আড়াই হাজার কোটি টাকা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটেও এ খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হয়নি। ফলে এ খাতে আর অর্থ দেয়ার কোনো সুযোগও নেই। তবে যদি খুব বেশি প্রয়োজন হয় এবং সরকার চায়, তাহলে হয়তো কিছু টাকা দেয়া যেতে পারে। তবে স্বাভাবিকভাবে এ খাতে আর ভর্তুকি বাড়ানোর সুযোগ নেই। 

অন্যদিকে পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, জাতীয় গ্রিডে দৈনিক ৮৫ কোটি ঘনফুট এলএনজি সরবরাহের মাত্রা ঠিক রাখতে হলে বছরে ৮ হাজার ৭৮৫ এমএমসিএম (মিলিয়ন ঘনমিটার) গ্যাস আমদানির প্রয়োজন পড়বে। চলতি অর্থবছরে এ পরিমাণ এলএনজি আমদানি করতে মোট ব্যয় হবে ৩২ হাজার ২৩৬ কোটি টাকা। সে হিসেবে প্রতি এমএমসিএম এলএনজির দাম পড়বে ৩৬ টাকা ৬৯ পয়সা। এর সঙ্গে পরিচালন ব্যয়, কর, ব্যাংক চার্জ, রিগ্যাসিফিকেশনসহ আনুষঙ্গিক সব খরচ যোগ হলে এলএনজিতে মোট ব্যয় দাঁড়াবে ৪৪ হাজার ২৬৫ কোটি টাকা।

এ পরিমাণ এলএনজি আমদানি করে দেশে বিক্রির পর যে অর্থ পাওয়া যাবে তা বাদ দিয়ে ভর্তুকি বাবদ ২৫ হাজার ২১৯ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। এছাড়া জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) ৭ হাজার কোটি টাকা বকেয়া থাকায় এ বছর সব মিলিয়ে এলএনজিতে ভর্তুকি বাবদ প্রয়োজন হবে ৩২ হাজার ২১৯ কোটি টাকা। চলতি বাজেটে এ পরিমাণ অর্থের সংস্থান রাখতে অনুরোধও জানায় পেট্রোবাংলা। ২০২০ সালের অক্টোবরে স্পট মার্কেটে প্রতি এমএমবিটিইউ (মেট্রিক মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট) এলএনজির মূল্য ৪ মার্কিন ডলারের কাছাকাছি থেকে বেড়ে বর্তমানে প্রায় ৩০ ডলারে পৌঁছেছে। তাই অতিরিক্ত ভর্তুকির প্রয়োজন পড়ছে বলেও জানানো হয়।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান নাজমুল আহসান বণিক বার্তাকে বলেন, আমাদের এনবিআরে বেশকিছু বকেয়া রয়েছে, সেগুলোসহ ৩২ হাজার কোটি টাকা চাওয়া হয়েছিল। তবে বর্তমানে অর্থ বিভাগ থেকে যে অর্থ পাওয়া গেছে তা দিয়ে চলতি মার্চ পর্যন্ত চলবে। এপ্রিল, মে ও জুনের জন্য আবার অর্থ চাইতে হবে। যখন প্রয়োজন হবে তখনই অর্থ বিভাগে আমরা চিঠি দেব।

তবে বাজেট থেকে ভর্তুকি বাবদ আর অর্থ দেয়া সম্ভব নয় বলে অর্থ বিভাগের যে বক্তব্য পাওয়া গেছে সে প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সিনিয়র সচিবসহ সরকারের অন্যান্য সংস্থা মিলে আলোচনা করে ঠিক করবেন।

পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, দেশে বর্তমানে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কাতার ও ওমান থেকে এলএনজি আমদানি করা হচ্ছে। এর বাইরে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি আমদানি করা হয়। দেশে গ্যাসের সরবরাহ সংকট ক্রমেই জোরালো হয়ে উঠছে। এ সংকট মোকাবেলার জন্য এলএনজি আমদানির ওপরই নির্ভরশীল বাংলাদেশ। স্পট মার্কেটে পণ্যটির দাম আকাশচুম্বী হয়ে ওঠায় গত বছর স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনা কমিয়ে দেয়া হয়। এতেই দেশের শিল্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে শুরু করে পরিবহনসহ অন্যান্য খাত অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে উচ্চমূল্যেই স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কিনতে বাধ্য হয় বাংলাদেশ। বর্তমানে স্পট মার্কেট থেকে উচ্চমূল্যে জ্বালানি পণ্যটি ক্রয়ের সুযোগ একেবারে সংকুচিত করে ফেলেছে ইউক্রেন সংকট। বাংলাদেশের জন্য পরিস্থিতি আরো কঠিন করে তুলেছে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় সরবরাহ কমে আসার খবর। বর্তমান প্রেক্ষাপটে সামনের দিনগুলোয় দেশের শিল্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ গোটা অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি খাতেই বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে এলএনজি বাজারের বর্তমান পরিস্থিতি।