আর মাত্র একদিনের অপেক্ষা। আগামীকাল মেট্রোরেলের যুগে প্রবেশ করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। উত্তরা-মতিঝিল-কমলাপুরের মধ্যে গড়ে উঠছে এমআরটি লাইন-৬। এর মধ্যে উত্তরা-আগারগাঁওয়ে প্রথমে শুরু হচ্ছে বাণিজ্যিক চলাচল। পরিবেশবান্ধব, নিরাপদ ও যানজটমুক্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলার যে উদ্দেশ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হচ্ছে, তার পুরো সুফল পেতে মেট্রো ব্যবহারকারীসহ সমগ্র রাজধানীবাসীর সহযোগিতা সবচেয়ে জরুরি বলে মনে করেন পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. এসএম সালেহউদ্দিন। মেট্রোরেল প্রকল্পটি যখন কেবল পরিকল্পনা পর্যায়ে, তখন তত্কালীন ঢাকা পরিবহন সমন্বয় বোর্ড (ডিটিসিবি) ও পরবর্তী সময়ে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) নির্বাহী পরিচালক হিসেবে সার্বিক কাজে নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি।

‘অনেকেই বলেন মেট্রো হলো আধুনিক গণপরিবহন। কিন্তু মেট্রোর ইতিহাস তো প্রায় ২০০ বছরের পুরনো। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কেবল মেট্রোর ব্যবস্থাপনা আর সুযোগ-সুবিধায় পরিবর্তন এসেছে। মেট্রোর পুরো সুফল পেতে প্রয়োজন একটি আদর্শ নেটওয়ার্ক। আমরা কেবল একটি মেট্রো চালু করতে যাচ্ছি। পর্যায়ক্রমে আরো পাঁচটি মেট্রো চালু হবে। আর সবক’টি মেট্রো চালু হওয়ার পরও তা দিয়ে কেবল ঢাকার ১৭ শতাংশ যাত্রী পরিবহন করা যাবে। যাত্রীদের সিংহভাগকেই ব্যবহার করতে হবে পাবলিক বাস। মেট্রোর সঙ্গে সমন্বয় করে একটি আধুনিক বাস ব্যবস্থা যতদিন পর্যন্ত না গড়ে উঠছে, ততদিন রাজধানীবাসীকে ধৈর্য ধরতে হবে, সহযোগিতা করতে হবে। মেট্রো ব্যবহারে আমাদের নিয়ম-কানুন মেনে চলতে হবে। কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা করা যাবে না’— মেট্রোর সুফল নিয়ে বণিক বার্তাকে এসব কথা বলেন ড. সালেহউদ্দিন, যিনি বর্তমানে ঢাকার জন্য গঠিত বাস রুট র্যাশনালাইজেশন কমিটিতে পরামর্শক হিসেবে কাজ করছেন।


মেট্রোরেলের সঙ্গে সমন্বয় করে আধুনিক বাস ব্যবস্থা গড়ে তোলার কাজটি এরই মধ্যে গতি পেয়েছে। ঢাকার একাধিক রুটে চালু হয়েছে কোম্পানিভিত্তিক বাসসেবা। এ বাসসেবাকে মেট্রোর সঙ্গে সমন্বয় করা হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা যে বাস রুট র্যাশনালাইজেশন করছি, সেটার সঙ্গে মেট্রোরেলের একটা সমন্বয় করা হচ্ছে। মেট্রোর স্টেশনগুলোয় একসঙ্গে প্রচুর যাত্রী নামবে। সেই যাত্রীদের একটা অংশের আরো কোনো গন্তব্যে যাওয়ার প্রয়োজন হবে এবং গন্তব্যগুলো ভিন্নও হতে পারে। বিষয়টি মাথায় রেখে আমরা পরিকল্পনা করছি কোম্পানিভিত্তিক বাসসেবাকে মেট্রোর স্টেশনগুলোর সঙ্গে সংযুক্ত করার।’

বাংলাদেশের প্রথম মেট্রোর রুট নির্ধারণকাজে ডিটিসিবির নির্বাহী পরিচালক হিসেবে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন ড. সালেহউদ্দিন। কাজটি করতে পদে পদে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রথমদিককার পরিকল্পনায় মেট্রোরেলের গতিপথ ছিল ক্যান্টনমেন্টের ভেতর দিয়ে। তখন সেনাবাহিনীর সঙ্গে আমাদের একটা মিটিং হয়। তাদের পক্ষ থেকে বলা হলো সেখানে তাদের একটা আবাসন প্রকল্প হবে। এজন্য আমরা এটাকে একটু পূর্ব দিকে নিয়ে এখন যে লাইনটা, সেটা করেছি। অন্যদিকে পুরনো বিমানবন্দরের সামনে দিয়ে সেটা যাওয়ার কথা ছিল ফার্মগেটের দিকে। তাতে বিমানবাহিনী একটা আপত্তি দিল। তখন লাইনটা খামারবাড়ির দিকে আনা হয়। আবার আমরা ধাক্কা খেলাম কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকায়। আবার মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারের কারণে লাইনটি সায়েদাবাদ পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। তখন আমরা টিএসসির সামনে দিয়ে রুটটি ঘুরিয়ে নিলাম। সেখানেও বিপত্তি। শিক্ষার্থীরা আপত্তি তুললেন। শেষমেশ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, ছাত্রনেতাদের সঙ্গে আমরা একাধিক মিটিং করি। তাদের বোঝাতে সমর্থ হই, রুটটা সেদিক দিয়ে গেলে বহু শিক্ষার্থী উত্তরা থেকে মেট্রোতে ভ্রমণ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাতায়াত করতে পারবে। আবার পিজির সামনে এলাম, তখনো অবজেকশন এল। প্রাণ গোপাল সাহেব ছিলেন ভাইস চ্যান্সেলর। তার সঙ্গেও আমরা মিটিং করি এবং বোঝাতে সক্ষম হই, রুটটি সেদিক দিয়ে গেলে রোগীদের যাতায়াত সহজ হয়ে যাবে। শেষমেশ আমরা রুটটি উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত নির্ধারণ করতে সক্ষম হই।’

তিনি বলেন, ‘তখন ডিটিসিবিতে পর্যাপ্ত জনবল ছিল না। অর্থ বরাদ্দও ছিল সীমিত। এমন প্রেক্ষাপটে আমরা সায়েদাবাদ বাদ দিয়ে মতিঝিল পর্যন্ত মেট্রো নিয়ে যাওয়ার জন্য একটা সমীক্ষা করি। এ কাজগুলো আমাদের জন্য সে সময় অনেক চ্যালেঞ্জিং ছিল।’

শুধু ঢাকার মেট্রোরেল নয়, ড. সালেহউদ্দিন কাজ করেছেন দেশের গণপরিবহন ও পরিবহন অবকাঠামোর বিভিন্ন প্রকল্পেও। পেশাগত জীবনে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনে (বিআরটিসি)। ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের প্রকল্পে পরামর্শক হিসেবে কাজ করেছেন। কাজ করেছেন তেজগাঁও বিমানবন্দর সড়কে ইউলুপ নির্মাণ প্রকল্পেও। অন্যদিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রয়াত মেয়র আনিসুল হকের আহ্বানে বাস রুট র্যাশনালাইজেশন প্রকল্পে কাজ শুরু করেন, যা এখনো অব্যাহত রেখেছেন তিনি।

১৯৫৪ সালে শরীয়তপুরে জন্মগ্রহণ করেন ড. সালেহউদ্দিন। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেছেন রাজশাহী ক্যাডেট কলেজ থেকে। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ থেকে ১০০ মেধাবী শিক্ষার্থীকে বিভিন্ন দেশে পাঠানোর উদ্যোগ নেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এ দলে সালেহউদ্দিনও ছিলেন। তিনি পড়তে যান রাশিয়ার মস্কো অটোমোবাইল রোডস অ্যান্ড হাইওয়েজ ইনস্টিটিউটে (বর্তমানে মস্কো অটোমোবাইল রোডস অ্যান্ড হাইওয়েজ ইউনিভার্সিটি)। সেখান থেকে ট্রান্সপোর্ট ও অটোমোবাইল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ওপর স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। অটোমোবাইল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ওপর লাভ করেন পিএইচডি। এরপর কিছুদিন যুক্তরাষ্ট্রে কাটিয়ে দেশে ফিরে আসেন। যোগ দেন বিআরটিসিতে। এর মধ্যে ২০০৪ সালে ডিটিসিবির অতিরিক্ত নির্বাহী পরিচালক, ২০০৯-১০ সালে নির্বাহী পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। ২০১২ সালে ডিটিসিবি পুনর্গঠন করে ডিটিসিএ গড়ে তোলা হয়। ডিটিসিএতেও নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।