বাংলাদেশ থেকে গত ২০২২-২৩ অর্থবছরে বিশ্ববাজারে ৫ হাজার ৫৫৫ কোটি বা সাড়ে ৫৫ বিলিয়নের বেশি ডলারের পণ্য রফতানি হয়। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) গত আগস্টে প্রকাশিত পরিসংখ্যানে এ তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। তবে গতকাল ‘অ্যানুয়াল এক্সপোর্ট রিসিপ্ট অব গুডস অ্যান্ড সার্ভিসেস ২০২২-২৩’ শীর্ষক হালনাগাদ পরিসংখ্যান প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তাতে গত অর্থবছরে পণ্য রফতানি বাবদ ব্যাংকিং চ্যানেলে পাওয়া অর্থের পরিমাণ দেখানো হয়েছে ৪ হাজার ৩৫৭ কোটি ২০ লাখ বা সাড়ে ৪৩ বিলিয়ন ডলারের কিছু বেশি। সে অনুযায়ী বাণিজ্য মন্ত্রণালয় অধীনস্থ সংস্থা ইপিবির চেয়ে প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার কম। এ হিসাবে ইপিবি ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিসংখ্যানের পার্থক্য ২১ দশমিক ৫৭ শতাংশ।
জাতীয় রফতানি আয়ের তথ্য নিয়ে সরকারেরই দুই সংস্থার পরিসংখ্যানে গরমিল বা ভিন্নতা কোনোভাবেই কাম্য নয় বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, জাতীয় হিসাব-নিকাশ থেকে শুরু করে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান পর্যায়ের প্রয়োজনের কারণেই ভিন্নতা দূর করা জরুরি। পাশাপাশি বাণিজ্যে সুশাসন নিশ্চিতের জন্যও এর বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। কারণ ওভার ও আন্ডার ইনভয়েসিং চর্চায় বাণিজ্যের আড়ালে অর্থ পাচারের ঘটনা বৈশ্বিকভাবে স্বীকৃত। বাংলাদেশেও এ ধরনের চর্চার প্রতিফলন সরকারি সংস্থার মাধ্যমেই প্রমাণিত। তাছাড়া বর্তমান ডলার সংকট ও বৈদেশিক মুদ্রায় রিজার্ভের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত রাখতে সরকারি সংস্থার পরিসংখ্যানগত পার্থক্য দূর হওয়া প্রয়োজন।
এ বিষয়ে এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মজিদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘যারা বাণিজ্য করছে, তারা ওভার-আন্ডার ইনভয়েসের মাধ্যমে অর্থ দেশের বাইরেই রাখছে। এগুলো শনাক্ত করার যথেষ্ট পথ বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে রয়েছে, কিন্তু তারা তা করে না। বলা হলো রফতানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে। কিন্তু তা আসলে অর্থমূল্যে। যদিও এখানে দেখার প্রয়োজন কী পরিমাণ পণ্য রফতানি হয়েছে। ভিন্নতার কারণে হিসাবের গ্রহণযোগ্যতা বা আস্থা এবং এর সঠিকতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।’
কেন্দ্রীয় ব্যাংকসংশ্লিষ্টরাও এ বিষয়ে একমত পোষণ করছেন। তারা বলছেন, কোন উৎস থেকে প্রাপ্ত পরিসংখ্যানকে রফতানি আয় বলা উচিত, সে বিষয়টির সুরাহা হওয়া প্রয়োজন। আর এর জন্য রফতানি সম্পর্কিত তথ্য-উপাত্তের সংজ্ঞাও নির্ধারণ হওয়া জরুরি। পাশাপাশি অবৈধ বাণিজ্যচর্চা শনাক্ত ও বন্ধের জন্য এর জরুরিত্ব রয়েছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে গত আগস্টে একটি টেকনিক্যাল কমিটিও গঠন করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।
রফতানি আয় হিসেবে কোন পরিসংখ্যানটি বিবেচনায় নেয়া উচিত—এমন প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মো. মেজবাউল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের প্রসিড রিয়েলাইজেশনটা হলো প্রকৃত। এর মধ্যে কোনো ফাঁক নেই। কিন্তু যখন অর্ডার আসে তখন এক্সপোর্ট অর্ডার হিসেবেই হিসাব করা হচ্ছে। কোনটা করলে সবচেয়ে বেশি ভালো হবে সেটা নিয়েই কাজ চলছে। আমাদের ডাটা ডেফিনেশনগুলো আসবে।’
তথ্যে পার্থক্যটা থাকা উচিত নয় বলে জানালেও ডাটা ডেফিনেশনের একটা গ্যাপ থেকেই যাবে বলে মন্তব্য করেছেন মেজবাউল হক। বাংলাদেশ ব্যাংকের এ মুখপাত্র বলেন, ‘আমি যখন এক্সপোর্ট অর্ডারটা পাচ্ছি, তখন একটা ভ্যালু। আবার আমি যখন প্রকৃত জাহাজীকরণ করছি তখন আরেকটা ভ্যালু। হয় আন্ডার শিপমেন্ট বা ওভার শিপমেন্ট হবে অথবা একজ্যাক্ট অ্যামাউন্ট করব। এখানে নিয়ন্ত্রণের কিছু নেই। এটা মানতেই হবে। ব্যবসা করতে গেলে কখনো কম পাঠাবেন, কখনো বেশি। আবার যখন প্রসিড রিয়েলাইজ হয়, তখন আরেকটা ঘটনা ঘটে। অনেক সময় ডিসকাউন্ট খাচ্ছে, অনেক সময় ক্রেতার খোঁজ পাওয়া যায় না। সবগুলোরই একটা রিয়েল ফ্যাক্টর আছে।’
পণ্য রফতানি ও প্রাপ্ত অর্থের পার্থক্যের মধ্যে কোনো অবৈধ অর্থপ্রবাহ রয়েছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে মেজবাউল হক বলেন, ‘বিস্তারিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করে এ বিষয়ে কোনো কমেন্ট করা যাবে না। কমিটি রিপোর্ট দিলে বিষয়গুলো পরিষ্কার হবে। এ জায়গাগুলোই আমরা খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি। কমিটি যদি সুন্দরভাবে কাজ করে একটা ভালো রিপোর্ট দিতে পারে, তাহলে কেন এত বড় গ্যাপ হচ্ছে, তার প্রকৃত কারণ শনাক্ত করা যাবে। যতদিন পর্যন্ত রফতানি বাবদ অর্থ না আসে, ততদিন রফতানিকারকের দায় থেকে যায়। কিছু বাস্তবতা আছে যেমন অনেক কোম্পানির সন্ধান না পাওয়ায় আমরা অনেক মিলিয়ন ডলার হারিয়েছি। বাণিজ্য করতে গেলে এ বাস্তবতা মানতে হবে। বড় পার্থক্যের কারণ খুঁজে বের করতে হবে।’
ইপিবি ও বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানে যৌক্তিক কিছু কারণ রয়েছে বলে দাবি করছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তাদের মতে, দেশের রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের (ইপিজেড) যে রফতানি, তা দেশের ভেতরেই বা ইনল্যান্ড হয়। ফলে সেটা একাধিকবার বা ডাবল কাউন্টিং হয়। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডাবল কাউন্টিং করে না। আবার ফেরত আসা পণ্য পুনরায় বা রি-এক্সপোর্টও হয়। আবার পদ্মা ব্রিজের যে ইকুইপমেন্ট এসেছে, সেগুলো রি-এক্সপোর্ট হয়েছে। এক্ষেত্রে যে ভ্যালু ধরা থাকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তা বাদ দেয়। ওগুলোর কোনো প্রসিড আসে না, শুধু রফতানি হয়। তারপর কিছু শর্ট শিপমেন্ট তো আছেই, পাশাপাশি নন-পেমেন্ট কিছু থাকে। এ সবকিছু নিয়েই কাজ চলছে যাতে করে জাহাজীকরণ ও রফতানি বাবদ প্রত্যাবাসিত পণ্যের পরিমাণ কাছাকাছি নিয়ে আসা যায়।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ-সংক্রান্ত কমিটি রফতানি পরিসংখ্যানের পার্থক্যের বেশকিছু কারণ শনাক্ত করেছে। প্রকৃত সেই কারণগুলো বাদ দিয়েও যদি দেখা যায় পার্থক্য থেকে যাচ্ছে, রফতানিকারকরা অর্থ আনছেন না তাহলে সেক্ষেত্রে ভিন্ন কিছু ভাবার অবকাশ রয়েছে। এ বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব তপন কান্তি ঘোষ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কমিটি তথ্য-উপাত্ত যাচাই করছে। প্রাথমিক কিছু কারণ শনাক্তও হয়েছে। আরো খতিয়ে দেখার জন্য নির্দেশনা দিয়েছি। পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন তৈরিতে আরো কিছু সময় লাগবে। প্রকৃত কারণ শনাক্তে দীর্ঘ সময়ের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করাও প্রয়োজন। সময়গত পার্থক্যের কারণে হোক বা অন্য যে কারণেই, রফতানি আয় সেটিই ধরতে হবে যেটি আসছে।’
জানা গেছে, ইপিবি মূলত কাস্টম হাউজগুলোয় ইস্যুকৃত বিল অব এক্সপোর্টের ভিত্তিতে রফতানির তথ্য প্রস্তুত করে। অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রস্তুত করে বিল অব লেডিংয়ের ভিত্তিতে। কাস্টমস থেকে কোনো বিল অব এক্সপোর্ট পরে বাতিল হলে সে তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংকের সিস্টেমে সমন্বয় করা হয়। কিন্তু এ তথ্য ইপিবির কাছে থাকে না। এছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংক সিএমটির (কাটিং, মেকিং ও ট্রিমিং) ভিত্তিতে রফতানির ক্ষেত্রে কেবল মূল্য সংযোজনের পরিমাণকে রফতানি হিসেবে গণ্য করে। অন্যদিকে ইপিবি গণ্য করে সম্পূর্ণ অর্থমূল্যকে (ইনভয়েস ভ্যালু)। এর পরও রফতানি তথ্যের এত বড় ব্যবধানকে স্বাভাবিক হিসেবে দেখছেন না সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে রক্ষিত তথ্য অনুযায়ী, সিএমটি রফতানির সম্পূর্ণ মূল্য হিসাব করলে ২০২২-২৩ অর্থবছরে রফতানির পরিমাণ ১১০ কোটি ডলার বাড়বে। এছাড়া বিল অব এক্সপোর্ট বাতিল হয়েছে ৩০ কোটি ডলারের। সাধারণত এর পরিমাণ ৫০ কোটি ডলারের আশপাশে থাকে। এছাড়া বিল অব এক্সপোর্ট ইস্যু হয়েছে অথচ ব্যাংকগুলো এখনো বিল অব লেডিংয়ের তথ্য দেয়নি এমন সম্ভাব্য রফতানির অর্থমূল্য সাড়ে ৭৪ কোটি ডলারের মতো। সামগ্রিক পর্যালোচনায় ২০২২-২৩ অর্থবছরে ব্যাংকিং চ্যানেলে সর্বোচ্চ ৪ হাজার ৮০০ কোটি ডলারের পণ্য রফতানির সুযোগ রয়েছে।
দেশের সবচেয়ে বড় বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত পোশাক পণ্যের রফতানিকারকরা বলছেন, তথ্যে গরমিলের বিষয়টি তাদের কাছে পরিষ্কার না। সরকারের পরিসংখ্যানের সঙ্গে ক্রয়াদেশ পরিস্থিতির তুলনামূলক বিশ্লেষণে হিসাব মিলছে না। সরকারের পক্ষ থেকে পাওয়া পরিসংখ্যান নিয়ে খোদ রফতানিকারকদের অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন। কিন্তু চ্যালেঞ্জ করা যাচ্ছে না। কারণ রফতানিকারকদের নিজস্ব কোনো পরিসংখ্যান নেই। রফতানির প্রকৃত পরিমাণ যাচাইয়ের নিজস্ব কোনো ব্যবস্থাও নেই।
পোশাক রফতানিকারকদের ভাষ্যমতে, অসাধু বাণিজ্যিক চর্চার কারণেও পরিসংখ্যানে ভিন্নতা দেখা যেতে পারে। বিশ্বের অন্য অনেক স্থানের মতো বাংলাদেশেও অর্থ পাচারের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র আন্তর্জাতিক বাণিজ্য। পণ্য রফতানি করে অর্থ দেশে না আনার অভিযোগ রয়েছে অনেক। এ ধরনের ঘটনা বাংলাদেশ ব্যাংকের নজর এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ কম। এর পরও নানা ফাঁক-ফোকর গলে এমন হওয়ার সুযোগ রয়েছে। এজন্য ব্যাংকের নজরদারি ব্যবস্থা আরো শক্ত হওয়া প্রয়োজন। যে কারণই থাকুক না কেন, পরিসংখ্যানগত ভিন্নতার বিষয়টিকে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার এক্সপোর্টার্স অ্যান্ড ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) নির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রফতানি করে যে অর্থ আসে সেটিকেই ধরতে হবে রফতানি আয়। এ হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যটিই প্রকৃত রফতানি আয়। ইপিবি ও বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানের পার্থক্যটা বাড়বে এটা অস্বাভাবিক না, কারণ রফতানি যত বাড়বে, পার্থক্যও তত বাড়বে। এবারের পার্থক্যটা প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলারের হওয়ার কারণ দুটি। একটা হলো রফতানি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে পার্থক্য বাড়বে। এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে ক্রেতারা অনেক দেরি করে আমদানি করা পণ্যের অর্থ পরিশোধ করছেন। স্টক বেড়ে যাওয়া, বিক্রি কমে যাওয়ার কারণে তারা দেরি করছেন অর্থ পরিশোধে। প্রকৃত হিসাব বা যথার্থ হিসাব আমরা কখনই দিতে পারব না যতক্ষণ পর্যন্ত পুরো ব্যবস্থাটি স্বয়ংক্রিয় না হবে আর সেখানে রফতানিকারকদের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা না যাবে। তবে ইপিবি যে রফতানির হিসাব দেয় সেটার সঙ্গে আমরা একমত নই। সেই তুলনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনেকটাই গ্রহণযোগ্য।
প্রসঙ্গত, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে গত তিন অর্থবছরে পণ্য রফতানির বিপরীতে আসা অর্থের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। এতে দেখা যাচ্ছে, ২০২০-২১ অর্থবছরে এসেছে ৩ হাজার ৩৯৬ কোটি ডলারের বেশি। যদিও ইপিবির প্রতিবেদন অনুযায়ী ওই অর্থবছরে ৩ হাজার ৮৭৫ কোটি ৮৩ লাখ ডলারের পণ্য রফতানি হয়েছিল। এ হিসেবে ইপিবি ও বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানে পার্থক্য ১২ দশমিক ৩৫ শতাংশ বা ৪৭৮ কোটি ৯৩ লাখ ডলারের।
ইপিবির পরিসংখ্যান বলছে, ২০২১-২২ অর্থবছরে পণ্য রফতানি হয় ৫ হাজার ২০৮ কোটি ২৬ লাখ ডলারের। ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ওই অর্থবছরে পণ্য রফতানি বাবদ প্রাপ্ত অর্থের পরিমাণ ৪ হাজার ৩৬০ কোটি ২০ লাখ ডলার। এ হিসেবে ওই অর্থবছরে সরকারের দুই প্রতিষ্ঠানের পরিসংখ্যানে রফতানি তথ্যের তারতম্য ৮৪৮ কোটি ৬ লাখ ডলারের বা ১৬ দশমিক ২৮ শতাংশ।










