আট বছরে দেশে প্রায় পাঁচ হাজার রাজনৈতিক সহিংসতায় প্রাণ গেছে আট শতাধিক মানুষের। সহিংসতার মধ্যে দুই হাজারের বেশি ঘটনা ঘটেছে নির্বাচন ঘিরে। এর মধ্যে সর্বাধিক মৃত্যুর ঘটনা ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন ঘিরে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা, প্রার্থীদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ের কারণে ইউপি নির্বাচনে সংঘাত ও সহিংসতা বেড়েছে। তাছাড়া স্থানীয় নির্বাচনকে দলীয়করণের কারণে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেন। এতে করে তৃণমূলে মতবিরোধ বাড়ছে। সেই বিরোধ পরবর্তী সময়ে সংঘাতে রূপ নিচ্ছে।
আট বছরে হওয়া জাতীয় সংসদ নির্বাচন, সিটি করপোরেশন নির্বাচন, উপজেলা পরিষদ নির্বাচন, পৌরসভা নির্বাচন ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দুই হাজারের বেশি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সর্বোচ্চ সহিংসতা ও হতাহতের ঘটনা ঘটেছে ইউপি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। অন্যদিকে সবচেয়ে কম সংঘাত হয়েছে সিটি করপোরেশন নির্বাচনে।
দেশের রাজনৈতিক সহিংসতা নিয়ে প্রতি বছর পরিসংখ্যান প্রকাশ করে আসছে মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। প্রতিষ্ঠানটির প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, আট বছরে দেশে দেশে ৪ হাজার ৭৯৯টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এতে ৫৩ হাজার ৬৩৭ জন আহত এবং ৮২৩ জন নিহত হয়েছেন। এছাড়া বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ২ হাজার ৩২৯টি সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় ২৮ হাজার ৩০৫ জন আহত এবং ৪১৭ জন নিহত হয়েছেন। শুধু ইউপি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ১ হাজার ৪২৮টি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। যাতে ১৭ হাজার ২৮১ জন আহত এবং ২৭৪ জন প্রাণ হারিয়েছেন।
আসকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইউপি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সবচেয়ে বেশি সহিংসতার ঘটনা ঘটে ২০১৬ সালে। ওই বছর সহিংসতায় ৯ হাজার ৩৮৭ জন আহত এবং ১৪৭ জন নিহত হন।
এছাড়া গত বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে ৯৩২টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় ১০ হাজার ৮৩৩ জন আহত এবং ১৫৭ জন নিহত হন। এছাড়া ২০১৪ সালের দুই ঘটনায় ৪৬ জন আহত ও একজন নিহত, ২০১৫ সালের এক ঘটনায় ৩০ জন আহত ও দুজন নিহত, ২০১৭ সালের ৩১টি সহিংসতায় ৫১৮ জন আহত ও সাতজন নিহত, ২০১৮ সালের তিনটি ঘটনায় ১১ জন আহত ও একজন নিহত, ২০১৯ সালের চারটি ঘটনায় ৪২ জন আহত ও তিনজন নিহত এবং ২০২০ সালে তিনটি ঘটনায় ৪৬ জন আহত হন।
ইউপি নির্বাচন ছাড়াও জাতীয় সংসদ নির্বাচন, সিটি করপোরেশন নির্বাচন, উপজেলা পরিষদ নির্বাচন এবং পৌরসভা নির্বাচনেও সংঘাতের ঘটনা ঘটছে। তবে অন্য নির্বাচনগুলোতে সংঘাতের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম।
আসকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দশম ও একাদশ জাতীয় সংসদের সব নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ৪৯৮টি সংঘাতের ঘটনা ঘটে। এতে ৪ হাজার ৬৬৯ জন আহত এবং ৭২ জন নিহত হন। গত আট বছরে সিটি করপোরেশন-কেন্দ্রিক নির্বাচনী সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে ৫১টি। এতে ৫৯৩ জন আহত এবং পাঁচজন নিহত হন। উপজেলা পরিষদ নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা ঘটেছে ২৬২টি। এতে আহত ও নিহতের সংখ্যা যথাক্রমে ৩ হাজার ৮৯১ এবং ৪৫ জন। গত আট বছরে পৌরসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ১৯০টি সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় ১ হাজার ৯২৫ জন আহত এবং ২১ জন নিহত হন।
স্থানীয় নির্বাচনে সংঘাত বৃদ্ধির কারণ প্রসঙ্গে আসকের নির্বাহী কমিটির সাধারণ সম্পাদক নূর খান বণিক বার্তাকে বলেন, সমঝোতা না থাকায় গত এক যুগে রাজনীতি একপক্ষীয় হয়ে গেছে। সরকারপক্ষীয় রাজনীতির ফলে সাম্প্রতিককালে বিভিন্ন নির্বাচনে তার প্রভাব পড়ছে। স্থানীয় নির্বাচন যখন দলীয় প্রতীকে হচ্ছে, তখন দেখা যাচ্ছে ক্ষমতাসীন দলের অভ্যন্তরীণ সংঘাতটা বেশি হচ্ছে। সংঘাত বেশি হওয়ার কারণে হতাহতের সংখ্যাও বেড়ে যাচ্ছে।
স্থানীয় রাজনীতিকে দলীয়করণ করার কারণে সংঘাতের ঘটনা বাড়ছে বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. রফিকুল ইসলাম। এ প্রসঙ্গে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে সংঘাত বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ দলগতভাবে নির্বাচন। কারণ প্রতিটা দল থেকে একজন প্রার্থী মনোনয়ন পেয়ে থাকেন। বিষয়টা একেবারে তৃণমূলের হওয়ার কারণে অনেকেই তাদের নিজের দলের সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারেন না। ফলে স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে অংশ নেন। এতে করে নিজেদের ভেতরে দ্বন্দ্বটা বেড়ে যায়। সেই দ্বন্দ্বটা সংঘাতে রূপ নেয়।
অপরাধ করলে শাস্তি হবে না এমন ধারণা একটা শ্রেণীর মধ্যে সৃষ্টির কারণে সহিংসতা বা সংঘাত বাড়ছে বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল। তিনি বলেন, দেশে নির্বাচন কমিশন বলে যে কোনো কিছু আছে সেটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না। নির্বাচনের সময় স্থানীয় যে সন্ত্রাসী বাহিনী রয়েছে তাদের কাজে লাগালে কোনো বিচার হবে, এ ধরনের ভয় কারো মধ্যে নেই। বেশির ভাগ সংঘর্ষের ঘটনা আওয়ামী লীগ এবং তাদের বিদ্রোহীদের মধ্যে ঘটেছে। ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা মনে করেন নির্বাচনে জেতার জন্য যে কোনো শক্তি প্রয়োগ করলে আমাদের কিছু হবে না। দায় মুক্তির বিশ্বাস তাদের আছে।
ঢাবির আইন বিভাগের এ অধ্যাপক বলেন, এ নির্বাচনের মাধ্যমে যারা জিতে আসেন তারা লুটপাট, জনগণের অর্থ আত্মসাৎ এবং দাপট দেখানোর সুযোগ পান। ইলেকশনে জেতা মানে শুধু ইউনিয়ন পরিষদে চেয়ারম্যান কিংবা মেম্বার হওয়া না, লুটপাটের সুযোগ পাওয়া, স্থানীয় মাস্তান চক্রের প্রভাব বিস্তার করা, দোর্দণ্ড প্রতাপে থাকা। ফলে তারা মরিয়া হয়ে ওঠে।
দলীয় প্রতীকে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কারণে সহিংসতার ঘটনা ঘটছে—এ ধারণার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন ড. তোফায়েল আহমেদ। তিনি বলেন, অনেকেই বলেন দলীয় প্রতীকে স্থানীয় নির্বাচনের কারণে সংঘাত বাড়ছে, এটা একেবারে ভুল। সংঘাতের প্রধান কারণ হচ্ছে যেকোনো মূল্যে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার লড়াই। এখানে প্রার্থীরা কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা করছেন না। এছাড়া নিয়মনীতি প্রতিষ্ঠা করার জন্য প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশন নিষ্ক্রিয়। ফলে এটা বেড়ে গেছে।










