ফলে প্রচলিত আমদানি উৎসের বাইরে নতুন নতুন দেশের সঙ্গে আলোচনা চালালেও এখনো চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়নি।
দেশে গ্যাস সংকটের কারণে আগে থেকেই পাঁচটি ইউরিয়া সার কারখানা বন্ধ রয়েছে। এবার সে প্রভাব পড়েছে ডিএপি (ডাইঅ্যামোনিয়াম ফসফেট) সারের একমাত্র দেশীয় উৎপাদনকারী কারখানায়। কাঁচামাল অ্যামোনিয়ার ঘাটতির কারণে শনিবার রাতে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে ডিএপি ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএপিএফসিএল) উৎপাদন। চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার রাঙ্গাদিয়ায় অবস্থিত রাষ্ট্রায়ত্ত এ কারখানায় অ্যামোনিয়া সরবরাহ করত একই এলাকার চিটাগং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (সিইউএফএল) ও কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (কাফকো)। গত ৪ মার্চ গ্যাস সংকটের কারণে ওই দুই কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অ্যামোনিয়া উৎপাদনও থেমে যায়।
মজুদ থাকা অ্যামোনিয়া দিয়ে প্রায় দেড় মাস উৎপাদন কার্যক্রম চালু রাখা হয় ডিএপিএফসিএলের। তবে মজুদ কমে আসায় গত কয়েকদিন একটি ইউনিট চালু রেখে অন্যটি বন্ধ রাখা হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত মজুদ সম্পূর্ণ শেষ হয়ে গেলে অবশিষ্ট ইউনিটটিও বন্ধ করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। এ অবস্থায় দেশের সার সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
ডিএপিএফসিএলের উপমহাব্যবস্থাপক (বাণিজ্যিক) রবিউল আলম খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অ্যামোনিয়া সংকটে বিগত কয়েকদিন একটি ইউনিট চালু ছিল। কাঁচামাল পেলে আবার উৎপাদন শুরু হবে। কাফকো ও সিইউএফএল চালু হলেও অ্যামোনিয়া পেতে চার-পাঁচদিন লেগে যায়। সেজন্য ওই দুই কারখানা চালুর ওপর নির্ভর করছে আমরা কবে চালু করতে পারব।’
ডিএপিএফসিএল, সিইউএফএল ও কাফকো পরিচালিত হয় বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) অধীনে। সংস্থাটির বাণিজ্যিক, উৎপাদন ও গবেষণা শাখার পরিচালক মো. মনিরুজ্জামান সম্প্রতি বণিক বার্তাকে জানিয়েছিলেন, আগামী মে মাসের শুরুতেই সিইউএফএল ও কাফকোতে গ্যাস সরবরাহের বিষয়ে জ্বালানি বিভাগের পক্ষ থেকে আশ্বস্ত করা হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশে সারের চাহিদা দাঁড়াবে ৬৭ লাখ ৭০ হাজার ৫০০ টনে। এর মধ্যে ডিএপির চাহিদা ১৩ লাখ ৫৫ হাজার ৭০০ টন। ডিএপিএফসিএলের দৈনিক উৎপাদন সক্ষমতা ৮০০ টন। চলতি অর্থবছরে কারখানাটিতে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছিল এক লাখ টন।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, গতকাল পর্যন্ত দেশে ইউরিয়া, ডিএপি, টিএসপি ও এমওপি সারের মজুদ ছিল ১৫ লাখ ৩৮ হাজার টন, যা ন্যূনতম নিরাপদ মজুদসীমারও নিচে। বর্তমানে ডিএপির মজুদ ৪ লাখ ৮৫ হাজার টন, ইউরিয়া ৩ লাখ ৪৩ হাজার, টিএসপি ৩ লাখ ৩৯ হাজার ও এমওপি ৩ লাখ ১০ হাজার টন।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের সার ব্যবস্থাপনা ও উপকরণ বিভাগের নথি অনুযায়ী, ডিএপির ন্যূনতম নিরাপদ মজুদ ধরা হয় পাঁচ লাখ টনকে। ইউরিয়া ও টিএসপি চার লাখ ও এমওপির জন্য ন্যূনতম নিরাপদ মজুদ ধরা হয় তিন লাখ টনকে। এ হিসাবে ইউরিয়া, ডিএপি ও টিএসপির বর্তমান মজুদ ন্যূনতম মজুদসীমার নিচে।
দেশের ডিএপি সারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সৌদি আরব থেকে আমদানি করা হয়। চলতি বছর মধ্যপ্রাচ্যের দেশটি থেকে ছয় লাখ টন আমদানির চুক্তি রয়েছে। এর আওতায় প্রতি মাসে ৪০ হাজার টন করে সার আনার কথা থাকলেও ফেব্রুয়ারিতে আমদানি করা হয়েছে কেবল এক লট। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংকটের কারণে মার্চ-এপ্রিলের দুই লট আনা যায়নি। এছাড়া চীন ও মরক্কো থেকেও ডিএপি আমদানি করা হয়।
ডিএপি আমদানির কাজটি করে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)। সংস্থাটির মহাব্যবস্থাপক (ক্রয়) আহমেদ হাসান আল মাহমুদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মরক্কো থেকে ডিএপি আনার প্রক্রিয়া চলমান আছে। মে মাসের চাহিদার এক লট জুনের প্রথম সপ্তাহেই পাব বলে আশা করছি। সৌদি আরবের সঙ্গে অনলাইনে মিটিং হয়েছে। তারা জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি স্বাভাবিক হলে মাসে দুই লট করে (এক লটে ৪০-৪৪ হাজার টন) সরবরাহ করবে। এছাড়া আরো কয়েকটি উৎসের সঙ্গে চুক্তির বিষয়ে আলোচনা চলছে।’
আগামী মে মাসে সারের চাহিদা তুলনামূলক কম। সামনে আমন মৌসুম আসছে, যা জুলাইয়ে শুরু হবে। দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম এ ধান উৎপাদনের মৌসুমে সারের বড় চাহিদা রয়েছে। ক্রমাগত সার কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং আমদানিতে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় কৃষি খাত নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে স্থানীয় উৎপাদন বন্ধ রেখে আমদানির ওপর অতিনির্ভরতা বড় বিপর্যয় তৈরি করতে পারে।
কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এমন বৈশ্বিক অস্থিরতার মধ্যে সার কারখানাগুলো বন্ধ রাখা সঠিক সিদ্ধান্ত নয়। কম গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে হলেও দেশীয় সার কারখানাগুলোয় জ্বালানি দিয়ে চালু রাখতে হবে। এতে আমদানিনির্ভরতা কমবে। পাওয়ার নিশ্চয়তাও থাকবে।’










