বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রাইম কোয়ালিটির (উন্নত মানের) ইস্পাত কাঁচামাল আমদানি করেছেন বাণিজ্যিক খাতের ব্যবসায়ীরা। যদিও রাজস্ব ফাঁকি দিতে কাস্টমস নথিতে এসব চালানের পণ্য সেকেন্ডারি কোয়ালিটি ঘোষণা দিয়ে খালাস নিয়ে যেতে চাইছেন তারা। প্রাইম কোয়ালিটির চেয়ে সেকেন্ডারি কোয়ালিটির প্রতি টনে দামের পার্থক্য প্রায় অর্ধেক। ফলে সরকারের রাজস্ব সুরক্ষায় পণ্য যথাযথ এইচএস কোডে শুল্কায়ন ছাড়া ছাড় দিতে রাজি নয় কাস্টমসও। এ বিরোধে গত এক মাসের বেশি সময়ে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে বের হয়নি ইস্পাত পণ্যবাহী ২৫০ ট্রাক-ট্রেইলার। এতে গাড়ির জট বেড়ে এখন পরিচালন কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দরের অভ্যন্তরে।
এমন পরিস্থিতিতে আইন অনুযায়ী খালাস না হওয়া ইস্পাত পণ্য নিলামে তোলার পদক্ষেপের কথা জানিয়েছে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। কাস্টমস বলছে, শুরু থেকেই আমদানিকারকরা শুল্ক কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করায় বুয়েট থেকেও কিছু চালানের পরীক্ষা করে আনা হয়েছে। তাতে এসব চালানে প্রাইম কোয়ালিটির ইস্পাত পণ্য আনার বিষয়টি প্রমাণিত। এর পরও আমদানিকারকদের প্রযোজ্য শুল্ক-করাদির সমপরিমাণ ব্যাংক গ্যারান্টি দিয়ে খালাস নেয়ার সুযোগ দেয়া হয়েছে। পরবর্তী সময়ে কেউ যদি নিজের দেয়া ঘোষণা অনুযায়ী পরীক্ষণ ফলাফল দেখাতে পারেন, তবে তিনদিনের মধ্যে এ গ্যারান্টির অর্থ ফেরত দেয়া হবে। এখন পর্যন্ত হাতে গোনা কয়েকজন ব্যবসায়ী এটি মেনে পণ্য খালাস করে নিয়েছেন।
চট্টগ্রাম কাস্টমস নথি পর্যালোচনায় দেখা গিয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজার অনুযায়ী প্রাইম কোয়ালিটির ইস্পাত পণ্যে প্রতি টন ভ্যালু গড়ে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ১০০ ডলার। আর সেকেন্ডারির ক্ষেত্রে এ ভ্যালু প্রতি টনে গড়ে ৪০০-৫২০ ডলার। চলতি বছর ১ কোটি ৩৬ লাখ টাকার একটি চালানে প্রতি টন ৫২০ ডলার ঘোষণায় সেকেন্ডারি পণ্য আনে ঢাকার আমদানিকারক এ কে ট্রেডার্স। অথচ বাস্তবে আনা এ প্রাইম কোয়ালিটির ইস্পাতের ভ্যালু হওয়ার কথা প্রতি টনে ১ হাজার ডলারের বেশি। একই কোয়ালিটির ও একই সাইজের কাঁচামাল দেশের শীর্ষ এমএস রড উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর চালানে ১ হাজার ৯৫ ডলার ভ্যালু হিসাব করে শুল্কায়ন করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কম ভ্যালু দেখিয়ে রাজস্ব ফাঁকি দেয়ার পাশাপাশি বাকি টাকা অসাধু আমদানিকারকরা হুন্ডি কিংবা ভিন্ন কোনো উপায়ে বিদেশে পরিশোধ করছেন।
কাস্টমস তথ্য অনুযায়ী, স্বীকৃত শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য এমএস শিট, প্লেট (হট রোল্ড), স্টেইনলেস স্টিল শিট, সিআরসিএ শিট, সিলিকন শিট, বিপি শিট বা টিন প্লেটের আমদানি স্বত্ব অন্তর্ভুক্ত থাকলে সেকেন্ডারি কোয়ালিটির এসব পণ্য আমদানি করা যাবে এবং এসব পণ্যের প্রাইম কোয়ালিটি ও সেকেন্ডারি কোয়ালিটি বাণিজ্যিক ভিত্তিতে আমদানিযোগ্য হবে। তবে আমদানি হওয়া চালানভিত্তিক প্রতিটি সেকেন্ডারি কোয়ালিটি পণ্য বিএসটিআই কর্তৃক নির্ধারিত বাংলাদেশের মান অনুযায়ী পরীক্ষা করা হবে। এক্ষেত্রে সেকেন্ডারি কোয়ালিটির কোনো পণ্যই প্রাইম কোয়ালিটির পণ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে না।
চট্টগ্রাম কাস্টমসের যুগ্ম কমিশনার মো. জাকির হোসেন এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘খালাসের অপেক্ষায় থাকা ইস্পাতের প্রকৃতি আমরা যথাযথভাবে নির্ধারণ করেছি। এর পরও বুয়েট থেকে ল্যাব টেস্ট করিয়ে এনেছি। এতে আমদানিকারকদের মিথ্যা ঘোষণা স্পষ্ট হয়েছে। তারা কাস্টমসকে ঘোষণা দিয়েছেন সেকেন্ডারি। অথচ নিয়ে এসেছেন প্রাইম কোয়ালিটির ইস্পাত পণ্য। ইস্পাতের এসব চালানে বেশির ভাগই এইচআর কয়েল। বাণিজ্যিক আমদানিকারকদের প্রাইম কোয়ালিটির ভ্যালু অনুযায়ী ব্যাংক গ্যারান্টি দিয়ে দ্রুত পণ্য খালাস করে নিয়ে যেতে বলা হয়েছে। তারা যদি পরবর্তী সময়ে তাদের নিজ ঘোষণা প্রমাণ করতে পারেন, তবে তিনদিনের মধ্যে ব্যাংক গ্যারান্টির অর্থ ফেরত দেয়ারও প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে। কিন্তু এতেও সাড়া দেয়নি।’
বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, চট্টগ্রাম বন্দরের ১ নম্বর গেটে অন-চেসিস কয়েল পরিবাহী ট্রেইলারের জট তৈরি হয়েছে। শুল্ক-কর বাবদ ব্যাংক গ্যারান্টি দিয়ে এগুলো দ্রুত বন্দর থেকে খালাস করিয়ে নিতে হবে আমদানিকারকদের। তা না হলে প্রতি ট্রাকের ওপর দখল করে রাখা স্থানের ভিত্তিতে ১০ গুণ হারে ভাড়া আরোপের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এম শাহজাহান বলেন, ‘আমদানি হওয়া স্টিল কয়েল অন-চেসিসে বন্দরের ১ নম্বর গেটে শুল্ক বিভাগের ছাড়ের অপেক্ষায় রয়েছে। এসব অন-চেসিস কয়েলবাহী ট্রেইলার বন্দর অভ্যন্তরে জট সৃষ্টি করেছে। আমদানিকারকরা এসব পণ্যের শুল্ক-করাদির সমপরিমাণ ব্যাংক গ্যারান্টি নিয়ে খালাসের উদ্যোগ নিতে পারেন। নয়তো বন্দরকে জটমুক্ত করতে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
চট্টগ্রাম কাস্টমসের যুগ্ম কমিশনার মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন রিজভী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সরকারের রাজস্ব সুরক্ষায় আমদানিকারকের দেয়া মিথ্যা ঘোষণা অনুযায়ী পণ্য শুল্কায়নের সুযোগ নেই। আমদানিকারকরা ইস্পাতের সেকেন্ডারি কোয়ালিটি ঘোষণা দিলেও মূলত নিয়ে এসেছেন প্রাইম কোয়ালিটির অর্থাৎ ভালো মানের পণ্য। এদিকে সিদ্ধান্ত মেনে খালাসের উদ্যোগ না নেয়ায় বন্দরের পরিচালন কার্যক্রমেও ব্যাঘাত ঘটছে। ফলে পণ্য আসার এক মাসেরও বেশি সময় যারা এসব ইস্পাত পণ্য বন্দরে ফেলে রেখেছেন, সেগুলো এখন নিলামের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।










