প্রতিদিন হাজারো দর্শনার্থীর ভিড় জমত এখানে। তবে সেই শিমুলিয়া ঘাটে এখন ভিন্ন চিত্র। মাত্র আধা কিলোমিটার ব্যবধানে দুই দফা টোল আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। এতে ক্ষুব্ধ পর্যটকরা ঘাটটি বয়কটের ডাক দিয়েছেন। দর্শনার্থী কমার কারণে ঘাটের বাণিজ্যিক কার্যক্রমে প্রভাব পড়েছে। লোকসানে পড়েছেন স্থানীয় হোটেল ব্যবসায়ীরা।
সরজমিনে দেখা গেছে, ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ে থেকে শিমুলিয়া ঘাটে ঢুকতেই ব্যক্তিগত যানবাহন থামানো হচ্ছে। লাঠি হাতে চার থেকে পাঁচজন গাড়ি ঘিরে ধরছে। এরপর নগদ টাকা আদায় করা হচ্ছে। মোটরসাইকেল থেকে হলুদ ও আকাশি রঙের টোকেন দিয়ে দুইবারে ৬০ টাকা নেয়া হচ্ছে। প্রাইভেট কারসহ অন্যান্য বাহন থেকে রসিদ ছাড়াই ১০০-৩০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে। রসিদ চাইলে আদায় করা টাকার চেয়ে কম অংকের রসিদ দেয়া হচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় একটি প্রভাবশালী চক্র বিআইডব্লিউটিএর রসিদে এসব টাকা তুলছে। চক্রটি জানায়, ইজারাদার হাজী আলমগীরের নেতৃত্বে এ টোল আদায় চলছে।
অতিরিক্ত টোল আদায়কে কেন্দ্র করে সম্প্রতি রাজধানী থেকে আসা চার পর্যটককে মারধরের অভিযোগ উঠেছে। এর আগে ১৬ জুলাই রাতেও প্রতিবাদ করায় ইজারাদারের লোকজনের হামলায় চার থেকে পাঁচজন পর্যটক আহত হন।
ঢাকা থেকে আসা সুমনা আক্তার জানান, ঢাকা থেকে মাওয়া পর্যন্ত ৩৫ কিলোমিটার রাস্তায় টোল দিয়েছেন ১৮০ টাকা। কিন্তু ঘাট এলাকায় মাত্র আধা কিলোমিটারে দিতে হয়েছে ২০০ টাকা।
আরেক দর্শনার্থী সাইফুল আলম বলেন, ‘১০ টাকা মহাসড়ক টোল দিয়ে এসে ঘাটেই দুইবারে ৬০ টাকা দিতে হয়েছে। প্রতিবাদ করলে লাঠি নিয়ে মারতে আসে ইজারাদারের লোকজন।’
পর্যটকদের মতে, এ ধরনের হয়রানি এলাকাটির পর্যটন সম্ভাবনা ধ্বংস করছে।
স্থানীয়রা জানান, দ্বৈত টোল আদায়ের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে পর্যটননির্ভর ব্যবসা-বাণিজ্য কার্যক্রমে। হোটেল ব্যবসায়ীদের দাবি, গত দুই সপ্তাহে শিমুলিয়া ঘাটে পর্যটকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। ঘাট এলাকার হোটেল ব্যবসায়ী নাজমুল হাসান পিন্টু ও শরীফ মোল্লা জানান, অতিরিক্ত টোলের কারণে পর্যটক অনেক কমে গেছে। বিকালে যেখানে উপচে পড়া ভিড় থাকত, সেখানে এখন সুনসান নীরবতা।
ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেন, বন্দর কর্মকর্তা শাহ নেওয়াজ স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিদের যোগসাজশে এ টোল ব্যবস্থা চালু করেছেন। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বন্দর কর্মকর্তা শাহ নেওয়াজ বলেন, ‘মানুষ যেটাকে চাঁদাবাজি বলছে সেটা চাঁদাবাজি নয়। সরকারি রাজস্ব বৃদ্ধির লক্ষ্যে টেন্ডারের মাধ্যমে ঠিকাদার নিয়োগ করা হয়েছে।’ কোন যানবাহন থেকে কী পরিমাণ টাকা নিতে হবে বিআইডব্লিউটিএর পক্ষ থেকে সে বিষয়ে সুস্পষ্টভাবে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে কিনা—জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটা ইজারাদারের বিষয়।’ সুনির্দিষ্ট কোনো পার্কিং ব্যবস্থা আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘পর্যটক ও দর্শনার্থীরা যেখানে গাড়ি পার্কিং করবে ঘাট এলাকায়, সেখানেই তাকে টাকা দিতে হবে।’
ইজারাদার আলমগীর হোসেন জানান, তারা প্রায় ২ কোটি টাকা দিয়ে ঘাট ইজারা নিয়েছেন। বিআইডব্লিউটিএর নির্দেশ মতোই তারা টাকা তুলছেন। ১ জুলাই বিআইডব্লিউটিএ ১ কোটি ৪৭ লাখ ৬৬ হাজার টাকায় আলমগীর হোসেনকে ঘাটটি ইজারা দেয়।
মুন্সিগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপি কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট আব্দুস সালাম আজাদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘একটি কুচক্রী মহল বিএনপি ও সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করার জন্য মাত্র আধা কিলোমিটার সড়কে দুইবার টোলের টাকা নিচ্ছে।’ ঘাট এলাকায় পর্যটক হয়রানিসহ নানা অনিয়ম চলছে দাবি করে তিনি জানান, বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে অভিযোগ জানানো হয়েছে।
লৌহজং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফারজানা ববি মিতু জানান, দুটি কাছাকাছি টোল নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। এটি বাতিলের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসকের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে। দ্রুতই জটিলতার সমাধান হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।










