সময়মতো কাজ শেষ করতে না পারায় শীর্ষ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান রানা বিল্ডার্সকে কালো তালিকাভুক্ত করেছে সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তর। দেশের গুরুত্বপূর্ণ একটি জাতীয় মহাসড়কের উন্নয়নকাজ সময়মতো শেষ করতে না পারায় প্রতিষ্ঠানটিকে অধিদপ্তরের রংপুর জোনে ছয় মাসের জন্য কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি আগামী এপ্রিলের মধ্যে কাজ শেষ করতে ব্যর্থ হলে চুক্তি বাতিলের ইঙ্গিত দিয়েছেন সওজের কর্মকর্তারা। যদিও রানা বিল্ডার্সের কর্মকর্তাদের দাবি, কালো তালিকাভুক্ত করার কাজটি আইন মেনে যথাযথভাবে করা হয়নি। অন্যদিকে কাজে ধীরগতির জন্য তারা করোনা মহামারী ও নির্মাণসামগ্রীর সংকটকে দায়ী করেছেন।

রানা বিল্ডার্সের কালো তালিকাভুক্ত হওয়ার ঘটনাটি ঘটেছে বগুড়া (জাহাঙ্গীরাবাদ)-নাটোর জাতীয় মহাসড়ক যথাযথ মান ও প্রশস্ততায় উন্নীতকরণ কাজে। মহাসড়কটির দুটি প্যাকেজে (প্যাকেজ নম্বর ৬ ও ৭) ১৫ কিলোমিটার সড়ক উন্নয়ন করছে প্রতিষ্ঠানটি, যার চুক্তিমূল্য ১৪৬ কোটি টাকা। এ টাকায় মহাসড়কটি প্রশস্ত ও শক্তিশালীকরণ, সড়ক বিভাজক ও বাস-বে নির্মাণ, বিদ্যমান কালভার্টগুলো সম্প্রসারণ, মাটি উন্নয়ন ও নিরাপত্তামূলক কাজ করে দেবে প্রতিষ্ঠানটি। দুটি প্যাকেজেই রানা বিল্ডার্সের সঙ্গে জয়েন্ট ভেঞ্চারে কাজ করছে নাটোরের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মীর হাবিবুল আলম। ধীরগতিতে কাজ বাস্তবায়নের কারণে প্রতিষ্ঠানটিকেও কালো তালিকাভুক্ত করেছে সওজ। সওজের রংপুর জোনে আগামী ছয় মাস কোনো ধরনের ক্রয়কাজে অংশ নিতে পারবে না প্রতিষ্ঠান দুটি।

সওজে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বগুড়া-নাটোর মহাসড়ক যথাযথ মান ও প্রশ্বস্ততায় উন্নীতকরণ কাজের জন্য ২০২০ সালের জুনে চুক্তিবদ্ধ হয় রানা বিল্ডার্স-মীর হাবিবুল আলমের জয়েন্ট ভেঞ্চার। চুক্তি অনুযায়ী ২০২১ সালের ১৪ অক্টোবরের মধ্যে তাদের সব কাজ বাস্তবায়ন সম্পন্ন করার কথা। কিন্তু এ সময়ে অর্ধেক কাজও রানা বিল্ডার্স-মীর হাবিবুল আলমের জয়েন্ট ভেঞ্চার সম্পন্ন করতে পারেনি বলে জানিয়েছেন প্রকল্পের কর্মকর্তারা।

বিষয়টি সম্পর্কে যোগাযোগ করা হলে বগুড়া-নাটোর মহাসড়ক যথাযথ মান ও প্রশ্বস্ততায় উন্নীতকরণ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ও সওজের রাজশাহী জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী সাদেকুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, রানা বিল্ডার্স-মীর হাবিবুল আলমের জয়েন্ট ভেঞ্চার মহাসড়কের যে দুটি অংশের কাজ বাস্তবায়ন করছে, বর্তমানে সে দুটি অংশের ভৌত অগ্রগতি মাত্র ৪০ শতাংশ। যদিও গত বছরের অক্টোবরের মধ্যেই তাদের কাজটি শেষ করার কথা। সময়মতো কাজটি শেষ না হওয়ায় সড়ক ব্যবহারকারীরা দুর্ভোগে পড়ছেন। এ দুর্ভোগ যেন সহনীয় মাত্রায় থাকে, সে লক্ষ্যে আমরা ঠিকাদারদের আগামী এপ্রিল পর্যন্ত সময় দিয়েছি। আশা করছি, এ সময়ের মধ্যে সড়কটি কিছুটা হলেও চলাচলের উপযোগী হবে এবং জনদুর্ভোগ সহনীয় মাত্রায় থাকবে। আর সার্বিকভাবে আমরা ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ারও পরিকল্পনা করছি। এরই মধ্যে তাদের কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।

ধীরগতিতে কাজ বাস্তবায়নের জন্য কঠোর ব্যবস্থা হিসেবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান রানা বিল্ডার্স-মীর হাবিবুল আলমের জয়েন্ট ভেঞ্চারের সঙ্গে চুক্তি বাতিলের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন সওজের রংপুর জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ও প্রকল্পটির সাবেক প্রকল্প পরিচালক মো. মনিরুজ্জামান। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, রানা বিল্ডার্সের কাজ শেষ করার কথা ছিল ২০২১ সালের অক্টোবরের মধ্যে। কিন্তু তারা নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করতে ব্যর্থ হয়েছে। তাদের কাজ বাস্তবায়নে গড়িমসি পরিলক্ষিত হয়েছে। এ কারণে রংপুর জোনে প্রতিষ্ঠানটিকে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি কাজ শেষ করার জন্য তাদের আগামী এপ্রিল পর্যন্ত সময় বেঁধে দেয়া হয়েছে। এ সময়ে কাজ শেষ না হলে আমরা তাদের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করব।

অন্যদিকে সওজ কালো তালিকাভুক্ত করার কাজটি আইন অনুযায়ী যথাভাবে করেনি বলে দাবি করেছেন রানা বিল্ডার্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আলম। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, বাংলাদেশের পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন অনুযায়ী, কোনো ঠিকাদারের সঙ্গে আগে চুক্তি বাতিল করতে হবে। তারপর সেই ঠিকাদারকে কালো তালিকাভুক্ত করতে হবে। কিন্তু এক্ষেত্রে উল্টোটি করা হয়েছে। সওজ আগে আমাদের কালো তালিকাভুক্ত করেছে। এখন তারা বলছে, এপ্রিলের মধ্যে কাজটি শেষ করতে না পারলে তারা আমাদের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করবে। ঘটনাটিকে পুরোপুরি আইনের ব্যত্যয় বলে দাবি করেছেন তিনি।

ধীরগতিতে নির্মাণকাজের বিষয়টির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বলেন, মহাসড়কটির উন্নয়নকাজে আমাদের (রানা বিল্ডার্স-মীর হাবিবুল আলমের জয়েন্ট ভেঞ্চার) অংশের কাজে কিছুটা ধীরগতি আছে এটা সত্য। কিন্তু এটা হয়েছে করোনা মহামারীর কারণে। শুধু আমাদের এ প্রকল্প নয়, দেশের প্রায় সব উন্নয়নকাজ একই কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর পরও বর্তমান অবস্থার চেয়ে আমরা কাজের অগ্রগতি ২০ শতাংশ বেশি রাখতে পারতাম। কিন্তু এটা করতে বাধা হয়ে দাঁড়ায় পাথর ও বিটুমিনের তীব্র সংকট। এখনো আমরা এ দুটি নির্মাণ উপকরণ প্রয়োজন অনুযায়ী পাচ্ছি না, যা নির্মাণকাজকে বাধাগ্রস্ত করছে।

প্রসঙ্গত, বর্তমানে সওজের সবচেয়ে বড় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান রানা বিল্ডার্স। গতকাল পর্যন্ত তাদের চলমান কাজের চুক্তিমূল্য ছিল ৩ হাজার ২৬০ কোটি টাকা। সওজের চলমান সবচেয়ে বেশি টাকার কাজ একাই বাস্তবায়ন করছে প্রতিষ্ঠানটি।