চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তলদেশে দেশের প্রথম টানেল নির্মাণকাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। এপ্রিল পর্যন্ত প্রকল্পটির কাজ প্রায় ৯৮ শতাংশ শেষ হয়েছে। তবে মূল উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) সংশোধন করে স্ক্যানার বসানোর সিদ্ধান্তে কাজ শেষ হলেও যান চলাচল চালু হতে সময়ক্ষেপণ হচ্ছে। মূলত নিরাপত্তা ইস্যুতেই বিলম্বিত হচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ায় নদীর তলদেশে নির্মিত প্রথম টানেল প্রকল্পের।
নির্মাণকাজ শেষে গত এপ্রিল কিংবা চলতি মাসের মধ্যেই শেখ মুজিবুর রহমান টানেল বা বঙ্গবন্ধু টানেল দিয়ে যানবাহন চলাচলের ঘোষণা দিয়েছিল বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ (বিবিএ)। তবে সর্বশেষ গত ২৬ এপ্রিল সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের আগামী সেপ্টেম্বরে টানেল উদ্বোধনের ঘোষণা দেন। বিশেষায়িত প্রকল্পটিতে শুরুতে যানবাহনের নিরাপত্তায় স্ক্যানার বসানোর কথা ছিল না। তবে বাংলাদেশী বাস্তবতায় যুক্ত করা হয় স্ক্যানারসহ নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট একাধিক প্রযুক্তি। যার কারণে ভৌতকাজ শেষ হওয়ার পরও অন্তত ছয় মাস যানবাহন চলাচল করবে না টানেলে।
বিবিএ বলছে, মাটি বা নদীর তলদেশে মাটির ভেতর দিয়ে যানবাহন চলাচলের জন্য নির্মিত টানেল সেতু কিংবা সড়কের চেয়ে আলাদা। সড়ক কিংবা সেতুর ভৌতকাজ শেষ হলেই যানবাহন চলাচল করতে পারে। কিন্তু টানেল নির্মাণের পর সিভিল ওয়ার্কের সঙ্গে মেকানিক্যাল, ইলেকট্রিক্যাল কাজের সমন্বয় করতে হয়। মেকানিক্যাল ও ইলেকট্রিক্যাল কাজের আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি বসানোর পর প্রি-কমিশনিং করা হয়। এরপর কমিশনিং শেষে ট্রায়ালের মাধ্যমে সর্বোত্তম সুরক্ষা নিশ্চিত করবে প্রকৌশলগত তিনটি বিভাগ। এছাড়া টানেলের অভ্যন্তরে ভেন্টিলেশন, ফায়ার ফাইটিং, মনিটরিং, ড্রেনেজ সিস্টেম সংযোজনের মাধ্যমে টানেলে সাধারণ মানুষ ও যানবাহনের প্রবেশ সুরক্ষিত করা হবে। টানেলের ভৌতকাজ শেষ হওয়ার পর বাকি কাজগুলো সম্পন্ন করা হচ্ছে। পাশাপাশি যানবাহন পরীক্ষা করতে স্ক্যানার বসানোর প্রস্তুতি চলছে। এসব কারণে শুরুতে চলতি অর্থবছরের মধ্যেই যানবাহন চলাচলের জন্য টানেল উন্মুক্ত করার কথা থাকলেও কিছুটা পিছিয়ে দেয়া হয়েছে।
বঙ্গবন্ধু টানেল নির্মাণ প্রকল্পের পরিচালক হারুনুর রশীদ চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, টানেল নির্মাণ প্রকল্পটি হাতে নেয়া হয়েছিল অন্তত ১০ বছর আগে। প্রকল্পে নতুন করে কমিউনিকেশন সিস্টেম আপগ্রেড করা হচ্ছে। এজন্য বিটিআরসি থেকে ফ্রিকোয়েন্সি বা তরঙ্গ বরাদ্দ নেয়া হয়েছে। স্ক্যানার বসানোর জন্য এরই মধ্যে জমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সব কাজ শেষ হলে তবেই টানেলটি বাণিজ্যিকভাবে সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করা হবে। তবে যোগাযোগ মন্ত্রণালয় কিংবা সরকারের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশনার ওপর টানেল দিয়ে যানবাহন চলাচলের উদ্বোধন কার্যক্রম নির্ভর করছে।
প্রকল্প কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, টানেল দিয়ে সুষ্ঠুভাবে যানবাহন চলাচলের জন্য এরই মধ্যে ট্রাফিক নির্ধারণসংক্রান্ত একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি টানেলের উভয় পাশে যানবাহন নিয়ন্ত্রণের জন্য ট্রাফিক অফিস, ডাম্পিং স্টেশন, রেকার, অ্যাম্বুলেন্স, ফায়ার সার্ভিস অফিসসহ চেকপোস্ট ও ফাঁড়ি নির্মাণের প্রস্তাব করেছে। কিন্তু টানেলের উভয় প্রান্তে এসব অবকাঠামো নির্মাণের জন্য ভূমি রাখা হয়েছে মাত্র ২ দশমিক ৪ একর। যার কারণে স্ক্যানারসহ নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণে আরো সাত একর জমি অধিগ্রহণের কার্যক্রম শুরু করেছে সেতু বিভাগ। শুরুতে উভয় প্রান্তে দুটি করে চারটি স্ক্যানার বসানো হবে। পরে উভয় প্রান্তে যানবাহন প্রবেশের আগেই পরীক্ষা করতে আরো চারটি স্ক্যানার বসানো হবে।
শুরুতে কর্ণফুলী নদীর তলদেশে বহু লেন টানেল নির্মাণ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ৮ হাজার ৪৪৬ কোটি টাকা। প্রকল্পের মেয়াদ ছিল ২০২০ সালের নভেম্বর পর্যন্ত। ২০১৮ সালের নভেম্বরে প্রথম সংশোধনীতে ব্যয় বাড়িয়ে ১০ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা ও মেয়াদ ২০২২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়। গত ১৭ জানুয়ারি একনেকে প্রকল্পটির দ্বিতীয় সংশোধনী পাস হয়। নতুন মেয়াদে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন ব্যয় ধরা হয়েছে ১০ হাজার ৬৮৯ কোটি ৭১ হাজার ৩৩ টাকা। অর্থাৎ দ্বিতীয় সংশোধনীতে কর্ণফুলী নদীর তলদেশে বহু লেন সড়ক টানেল নির্মাণ প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে ৩১৫ কোটি ২৮ লাখ ৯৩ হাজার টাকা। এর মধ্যে বাংলাদেশ সরকার ব্যয় করবে ৪ হাজার ৬৯৯ কোটি ৭০ লাখ ৬৬ হাজার টাকা এবং চায়না এক্সিম ব্যাংক ব্যয় করবে ৬ হাজার ৭০ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। সর্বশেষ সংশোধনীতে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।
২০২২ সালের ২৬ নভেম্বর প্রথম টানেল টিউবের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ওই সময় টানেলটি সব কাজ শেষে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে চালুর কথা ছিল। টানেলটি চালু হলে চট্টগ্রামের সঙ্গে দক্ষিণ চট্টগ্রামের সরাসরি সংযোগ ঘটবে। চীনের সাংহাই নগরীর আদলে কর্ণফুলী নদীতে বঙ্গবন্ধু টানেল ‘ওয়ান সিটি টু টাউন’ হিসেবে গড়ে উঠবে চট্টগ্রাম। টানেলটি চট্টগ্রাম তথা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করবে বলে আশা করছে সেতু কর্তৃপক্ষ।
টানেলটির মোট দৈর্ঘ্য ৩ দশমিক ৩২ কিলোমিটার, ভায়াডাক্ট ৭২৭ মিটার ও সংযোগ সড়কের দৈর্ঘ্য ৫ দশমিক ৩৫ কিলোমিটার।
টানেলসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর যানবাহনচালক ও দর্শনার্থীদের কারণে বেশকিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে। বঙ্গবন্ধু টানেল উদ্বোধনের পর যাতে সে ধরনের কোনো ঘটনা না ঘটে সে বিষয়ে বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।










