উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরা শুঁটকি মাছ উৎপাদনে অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। দেশের মোট শুঁটকি উৎপাদনের প্রায় ৩০ শতাংশ জোগান দেয় সাতক্ষীরা। অথচ এখানে কোনো শুঁটকি পল্লী গড়ে ওঠেনি। জেলার ২০-২৫ হাজার সমুদ্রগামী জেলে তাদের আহরণকৃত মাছ শুঁটকি করার জন্য যেতে হয় সুন্দরবন বাগেরহাট রেঞ্জের আলোরকোল ও দুবলারচরে। এতে একদিকে যেমন পরিবহন খরচ বেড়ে যায়, তেমনি ন্যায্য দামও তারা পায় না।
সাতক্ষীরা জেলা মত্স্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, সরকারের পৃষ্টপোষকতা পেলে অন্যান্য মাছের মতো শুঁটকি উৎপাদনে সম্ভাবনাময় হতে পারে এ জেলা। সাতক্ষীরার সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকায় যদি শুঁটকি পল্লী গড়ে তোলা যায়, তাহলে এখানকার জেলেরা কম খরচে বছরে বিপুল পরিমাণ শুঁটকি মাছ উৎপাদন করতে সক্ষম হবেন।
জেলার তালা উপজেলার শ্রীমন্তকাটি গ্রামের জেলে হাফিজুল ইসলাম জানান, ১৫-১৬ বছর ধরে সাগরে মত্স্য আহরণ করে আসছেন তিনি । প্রতি মৌসুমে ২৫-৩০ লাখ টাকার শুঁটকি উৎপাদন করেন। তবে সাতক্ষীরায় কোনো শুঁটকি পল্লী না হওয়ায় জেলার সব সাগরগামী জেলেকে যেতে হয় বাগেরহাট রেঞ্জের দুবলারচরের শুঁটকি পল্লীতে। এতে উৎপাদন খরচ যেমন বেশি হয়, তেমনি সঠিক দামও পাওয়া যায় না। এ জেলার অধিকাংশ জেলে বা শুঁটকি উৎপাদনকারীরা দুবলারচরের মহাজন ও আড়তদারদের কাছে জিম্মি। কিন্তু সুন্দরবন সাতক্ষীরা রেঞ্জের মধ্যে যদি শুঁটকি পল্লী গড়ে তোলা যায়, তাহলে উৎপাদন যেমন বাড়বে, তেমনি ন্যায্য মূল্য পাবেন জেলেরা। বিকল্প কোনো উপায় না থাকায় এ জেলার সমুদ্রগামী জেলেরা বাধ্য হয়ে দুবলারচরে ব্যবসা করছেন বলে জানান শুঁটকি ব্যবসায়ী হাফিজুল ইসলাম। তিনি সরকারি উদ্যোগে সাতক্ষীরায় শুঁটকি পল্লী গড়ে তোলার দাবি জানান।
একই উপজেলার সাহাপুর গ্রামের জেলে মনিরুজ্জামান ও আব্দুর রাজ্জাক জানান, তাদের গ্রামসহ উপজেলার দুই হাজারের মতো জেলে সাগরে মত্স্য আহরণের মাধ্যমে জীবিকানির্বাহ করেন। এসব জেলে স্বল্প বেতনে মৌসুমভিত্তিক কাজ করেন সাগরে মাছ ধরা ট্রলারে। সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জ এলাকায় শুঁটকি পল্লী গড়ে উঠলে তারাও উপকৃত হবেন।
বঙ্গোপসাগরসংলগ্ন দুবলারচর শুঁটকি পল্লীর আড়তদার ও পাইকারি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রায় ফিসের স্বত্বাধিকারী দেব্রত রায় জানান, সমুদ্রগামী জেলেদের নিকট থেকে মাছ সংগ্রহ করার পর তা শুঁটকি করে পাইকারি বিক্রি করেন তিনি। এসব শুঁটকির মধ্যে রয়েছে রূপচাঁদা, তপষ্যি, ছুরি, করাত, ঘাগড়া ট্যাংরা, চিংড়ি ও লইট্টা মাছ। প্রকার ভেদে দামও ভিন্ন। রূপচাঁদা কেজিপ্রতি পাইকারি বিক্রি করেন ২ হাজার ৪০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা, ছুরি মাছ শুঁটকি কেজি ১ হাজার ১৫০ টাকা, ঘাগড়া ট্যাংরা শুঁটকি কেজিপ্রতি ৬৫০ টাকা এবং লইট্টা শুঁটকি কেজি ৫৫০ টাকা।
দেব্রত রায় আরো জানান, দুবলারচরের উৎপাদিত শুঁটকি নীলফামারীর সৈয়দপুর, রংপুর ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করেন। দেশের মোট শুঁটকির প্রায় ৩০ শতাংশই উৎপাদন করেন সাতক্ষীরার জেলেরা। তবে সাতক্ষীরায় শুঁটকি পল্লী হলে তাদের উৎপাদন খরচ কমে যাবে অনেকাংশে।
সাতক্ষীরা জেলা মত্স্য কর্মকর্তা মো. আনিছুর রহমান জানান, উপকূলীয় এ জেলায় ২০-২৫ হাজার জেলে নিয়মিত সাগরে মত্স্য আহরণ করেন। তাদের মধ্যে সরকারি তালিকাভুক্ত হয়েছেন ১৫ হাজার জেলে। এ জেলেরা বছরে বিপুল পরিমাণ সমুদ্রিক মাছ আহরণ করেন। যার সিংহভাগই শুঁটকি করা হয়। কিন্তু সাতক্ষীরা জেলায় কোনো শুঁটকি পল্লী গড়ে না ওঠায় এসব জেলে বাধ্য হয়ে বাগেরহাট রেঞ্জের দুবলারচরের শুঁটকি পল্লী ব্যবহার করেন। এতে তাদের শ্রমিক ও পরিবহন খরচ অনেক বেড়ে যায়। তাছাড়া সেখানে ন্যায্য দামও পান না।
আনিছুর রহমান বলেন, ‘সরকারি উদ্যোগে যদি সাতক্ষীরায় শুঁটকি পল্লী গড়ে তোলা যায়, তাহলে অপার সম্ভাবনাময় হতে পারে শুঁটকি উৎপাদনে। সামুদ্রিক মাছের পাশাপাশি এখানে অন্যান্য মিঠাপানির মাছও শুঁটকি করে বিদেশ রফতানি করা যায়, যা থেকে চিংড়ি বা কাঁকড়ার মতো বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব হবে।’










