কাগজে-কলমে ১০০ ফুটেরও বেশি প্রশস্ত পুরান ঢাকার ধোলাইখাল। তাছাড়া ওয়ার্ক ফর আ বেটার বাংলাদেশ ট্রাস্ট তাদের গবেষণাপত্রে বলছে, ধোলাইখালের মোট দৈর্ঘ্য ৭ দশমিক ৩ কিলোমিটার। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। দীর্ঘ এ খালের প্রায় পুরোটাই দখলের শিকার। প্রস্থের দিক থেকে কোনোমতে টিকে আছে ২৫-৩০ ফুট। আর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, খালটি দৈর্ঘ্যে টিকে রয়েছে মাত্র ৯০০ মিটার। খালের উন্মুক্ত যে অংশটুকু আছে, সেটুকুও আবর্জনায় ভরাট। খালে থাকা সামান্য পানি নোংরা আর দূষণে দুর্গন্ধময়।

এক বছরেরও বেশি সময় আগে ওয়াসার কাছ থেকে খালের দায়িত্ব বুঝে পেয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। কিন্তু এর মধ্যে এ খালের অবৈধ দখল উচ্ছেদের কোনো উদ্যোগ নেয়নি সংস্থাটি। খালের সীমানা কতটুকু তাও নির্দিষ্ট করে বলতে পারছেন না সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। জাতীয় নদীরক্ষা কমিশন দখলদারদের সুনির্দিষ্ট তালিকা প্রকাশ করেছে অনেক আগে। কিন্তু এ ব্যাপারেও কিছু জানা নেই ডিএসসিসির কর্মকর্তাদের। এসব মিলিয়ে ধোলাইখাল উদ্ধার বেশ চ্যালেঞ্জিং হলেও অসম্ভব নয় বলেই মন্তব্য করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

ঢাকার প্রথম সুবেদার ইসলাম খান ১৬০৮-১০ খ্রিস্টাব্দে ধোলাইখাল খনন করিয়েছিলেন। খালের নামে এলাকার নামও ধোলাইখাল রাখা হয়। খালটি খননের উদ্দেশ্য ছিল যাতায়াত সুবিধা বাড়ানো ও বাইরের শত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার পাশাপাশি ঢাকার জলাবদ্ধতা নিরসন করা।

স্বাধীনতা-পরবর্তী নতুন মানচিত্রেও ধোলাইখালের অস্তিত্ব ছিল। গত শতকের আশির দশকে রায়সাহেব বাজার মসজিদের পাশে ছিল নৌকার ঘাট। ১৯৯০ সালেও মানুষ নৌকা দিয়ে ঘাটে আসত। মানচিত্রে দেখা যায়, খালের একটি অংশ রায়সাহেব বাজারে চিত্রা সিনেমা হলের সামনে থেকে শুরু হয়ে টং মার্কেট, সাদেক হোসেন খোকা মাঠ, মুরগিটোলা মোড় দিয়ে খালের একটি অংশ কাঠের পুল-লোহার পুল এলাকা হয়ে বুড়িগঙ্গায় মিলিত হয়েছে। অন্য অংশটি সাদেক হোসেন খোকা মাঠের মোড় থেকে যাত্রাবাড়ী হয়ে দোলাইরপাড়ে গিয়ে মিলিত হয়।

ধোলাইখালের অংশ দুটির একটি ৫ দশমিক ১০ কিলোমিটার এবং অন্য অংশটি ১ দশমিক ৯৭ কিলোমিটার। সরেজমিনে দেখা যায়, লোহার পুল থেকে অর্থাৎ জহির রায়হান অডিটোরিয়াম থেকে শুরু করে কেশব ব্যানার্জি রোডসংলগ্ন এবং মিলব্যারাকের পাশ ঘেঁষে খালের যে উন্মুক্ত অংশ আছে, সেটুকুও আবর্জনায় ভরাট; আর দুই পাশের ভরাট জায়গাও দখল হয়ে যাচ্ছে দ্রুত।

২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের রাজস্ব সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) সালমা খাতুন ধোলাইখালে দখলদারদের একটি বিস্তারিত তালিকা প্রণয়ন করেন। সে তালিকা অনুযায়ী সাত কিলোমিটার দীর্ঘ খালটি ৯৭ ব্যক্তির দখলে রয়েছে। এর মধ্যে বহুতল ভবন থেকে শুরু করে পাকা-সেমিপাকা দোকানপাটও রয়েছে। ওই তালিকা অনুযায়ী, বর্তমান গেন্ডারিয়া ও সূত্রাপুরের বড় অংশই খালের জায়গায়।

দখলদারদের চিহ্নিত করার পরও খাল উদ্ধারে উদ্যোগ নেয়নি ডিএসসিসি কর্তৃপক্ষ। এমনকি খালটির সীমানা সম্পর্কেও জানা নেই ডিএসসিসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের। যদিও গত বছর খালের দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে ডিএসসিসি খাল উদ্ধার এবং পরিষ্কারে  জোরালোভাবে কাজ করেছে।

এরই মধ্যে ডিএসসিসি বড় আকারে চারটি খাল উদ্ধার এবং সৌন্দর্যবর্ধনে ৯৮১ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্পের ডিপিডি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছে। তবে ধোলাইখাল নিয়ে কোনো পরিকল্পনা নেই বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফরিদ আহাম্মদ। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ঢাকা শহরে অনেক খাল রয়েছে। সব খালের কাজ একসঙ্গে করা সম্ভব নয়। আমরা আপাতত চারটি খাল নিয়ে বড় করে পরিকল্পনা করছি। ধোলাইখাল নিয়ে আমাদের এখন কোনো পরিকল্পনা নেই।

তবে ধোলাইখাল উদ্ধার করা গেলে রাজধানীর জলাবদ্ধতা কমার পাশাপাশি পুরান ঢাকার নাগরিক ভোগান্তি অনেকটাই কমে আসবে বলে মনে করেন নগরবিদরা। নগরবিদ ইকবাল হাবিব বণিক বার্তাকে বলেন, পুরান ঢাকা অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছে। এখানে বসবাসরত নাগরিকদের নিয়ে কেউ তেমন একটা ভাবে না। একটু পয়সা হলেই মানুষ নতুন ঢাকায় স্থানান্তরিত হয়ে যায়। ধোলাইখালসহ পুরান ঢাকার অবৈধ দখলে থাকা জায়গাগুলো উদ্ধার করতে পারলে মানুষের ভোগান্তি অনেকটাই দূর হয়ে যাবে।