সিলেটের কোম্পানীগঞ্জের পর্যটন কেন্দ্র সাদাপাথর থেকে লুট হওয়া পাথর উদ্ধারে অভিযান চালিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। বুধবার রাত থেকে শুরু করে গতকাল বিকাল পর্যন্ত প্রায় ৩৫ হাজার ঘনফুট পাথর উদ্ধার করা হয়েছে। পরে এসব পাথর ভোলাগঞ্জ থেকে নৌকায় করে সাদাপাথরে ফেলা হচ্ছে। জেলা প্রশাসন বলছে, লুট করা সব পাথর উদ্ধার করে সাদাপাথরে প্রতিস্থাপন করা হবে।

এদিকে পাথর লুটের ঘটনায় স্থানীয় এক ইউপি চেয়ারম্যানকে গ্রেফতার করেছে গোয়েন্দা পুলিশ। জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শের মাহবুব মুরাদ জানিয়েছেন, যারা এ কাজে জড়িত, তাদের গ্রেফতারসহ আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে। সাদাপাথর এলাকা পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের তিনি এ কথা বলেন।

জেলা প্রশাসনের একটি সূত্র জানায়, উদ্ধারকৃত পাথরের বড় অংশ ধলাই নদীতে পুনরায় ফেলে দেয়ার কাজ চলছে, যাতে নদীর প্রাকৃতিক প্রবাহ ও পরিবেশ ফিরিয়ে আনা যায়। একই সঙ্গে দ্রুততম সময়ের মধ্যেই পাথর লুটে জড়িতদের গ্রেফতারের জন্যও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মাঠে রয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে সাদাপাথর এলাকায় প্রভাবশালী চক্র পাথর উত্তোলন ও পাচার করে আসছে। সম্প্রতি লুটপাটের মাত্রা এতটাই বেড়েছে যে ধলাই নদীর তীরবর্তী প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে।

তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অবৈধভাবে উত্তোলিত সব পাথর উদ্ধার ও জড়িতদের আইনের আওতায় না আনা পর্যন্ত অভিযান চলবে।

অভিযান প্রসঙ্গে সিলেটের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ফারজানা আক্তার মিতা বলেন, ‘অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন, মজুদ বা পাচারে জড়িতদের কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। বিভিন্ন স্থানে বসানো চেকপোস্টে বুধবার রাত থেকে গতকাল বিকাল পর্যন্ত প্রায় ১৩০টি গাড়ি তল্লাশি করা হয়। এ সময় প্রায় ৭০টি গাড়িতে সাদাপাথর এলাকার পাথর শনাক্ত হলে সেগুলো পুনরায় প্রতিস্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। ট্রাকগুলো জব্দ রয়েছে।’

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শের মাহবুব মুরাদ গতকাল সাদাপাথর এলাকা পরিদর্শন করেছেন। এ সময় তিনি বলেন, ‘আশা করছি, শিগগিরই লুট হওয়া পাথরগুলো উদ্ধার করে আবার প্রতিস্থাপন করতে পারব। এটা সময়সাপেক্ষ বিষয়। আমরা সেজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছি। এছাড়া এখানের যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে, সেই ক্ষতি যেন আর কেউ করতে না পারে এবং যারা এ কাজে জড়িত ছিল তাদের গ্রেফতারসহ আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

পাথর প্রতিস্থাপনের বিষয়ে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আজিজুন্নাহার বলেন, ‘যৌথ বাহিনীর সহায়তায় বিভিন্ন স্থান থেকে প্রায় ১২ হাজার ঘনফুট পাথর পর্যটন কেন্দ্র সাদাপাথরসহ ধলাই নদের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দেয়া হয়েছে।’

স্থানীয়রা বলছেন, ধলাই সিলেটের সীমান্তবর্তী একটি নদ। এর উৎসমুখে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে সাদা পাথর। সবুজ পাহাড়, মেঘের হাতছানি আর বর্ষার পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে নেমে আসা পাথর নদের বুকে মিলেমিশে ভোলাগঞ্জের সৌন্দর্য বাড়িয়েছে বহু গুণ। তবে পাথর লুটপাটের কারণে আজ বিবর্ণ প্রকৃতির এ লীলাভূমি। গত বছরের ৫ আগস্ট থেকেই শুরু হয়েছিল সিলেটের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র সাদাপাথর ও জাফলংয়ের পাথর লুট। এ অবস্থায় হুমকির মুখে পড়েছে অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র দুটি। স্থানীয় প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতাদের যোগসাজশে লুটপাট চলছে বলে অভিযোগ পরিবেশ কর্মীদের।

কোটি টাকার পাথর লুট হয়েছে সিলেটের এ দুই পর্যটন এলাকা থেকে। এ ঘটনায় মামলাও হয়েছে থানায়। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেও কার্যত পর্যটন কেন্দ্রগুলো এখনো অরক্ষিত। এর পেছনে প্রশাসনের ব্যর্থতাকে দায়ী করছেন পরিবেশবাদীরা। এ অবস্থা চলতে থাকলে দেশের পর্যটকদের কাছে পরিচিত সাদাপাথর ও জাফলং পর্যটন কেন্দ্র বিলীন হয়ে যেতে পারে বলে জানিয়েছেন তারা।

পরিবেশবাদী সংগঠন ভূমি সন্তান বাংলাদেশ-এর সংগঠক শুয়াইবুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জাফলং কিংবা সাদাপাথর বলেন, সংঘবদ্ধ চক্র সমানতালে লুটপাট করছে। প্রশাসন কঠোর হলে এ লুটপাট ঠেকানো যেত। প্রকৃতিকে কীভাবে ধ্বংস করছে অসাধু চক্র তা দেখতে চাইলে সাদাপাথর ঘুরে আসা যায়। আমরা মনে করি, প্রশাসন কঠোর না হলে যতই চিৎকার করি না কেন, কোনো কাজে আসবে না।’