গত অর্থবছর ৩৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি পণ্য রফতানি করেছে বাংলাদেশ। এ রফতানির ৮১ শতাংশের বেশি পোশাক পণ্য। রফতানিতে পোশাক পণ্যের ওপর এখনো বড় নির্ভরতা রয়ে গেছে। দুই দশকের ব্যবধানে মোট রফতানিতে পোশাকের হিস্যা ৭৫ থেকে বেড়ে হয়েছে ৮১ শতাংশ। অন্যদিকে একই সময়ে পোশাক পণ্যবহির্ভূত বা নন-আরএমজি পণ্যের হিস্যা ২৪ দশমিক ৮৪ থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ১৮ শতাংশে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০০০-০১ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে রফতানি হয় ৪৮৬ কোটি ৫ লাখ ৬০ হাজার ডলারের পোশাক পণ্য। মোট রফতানিতে পোশাকের অংশ ছিল ৭৫ দশমিক ১৬ শতাংশ। একই সময়ে নন-আরএমজি পণ্য রফতানি ২০০০-০১ অর্থবছরে ছিল ১৬০ কোটি ৬৭ লাখ ৪০ হাজার ডলারের। মোট রফতানিতে অংশ ছিল ২৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ।
সর্বশেষ ২০২০-২১ অর্থবছরে পোশাক রফতানি হয়েছে ৩ হাজার ১৪৫ কোটি ৬৭ লাখ ৩০ হাজার ডলারের। মোট রফতানিতে হিস্যা ছিল ৮১ দশমিক ১৬ শতাংশ। নন-আরএমজি পণ্যের রফতানির অর্থমূল্য গত অর্থবছরে ছিল ৭৩০ কোটি ডলার। মোট রফতানিতে এর অংশ দাঁড়ায় ১৮ দশমিক ৮৪ শতাংশ।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও ইপিবি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শতকরা হিসাবে রফতানি খাতে বৈচিত্র্য আনার চিত্রটি স্পষ্ট হচ্ছে না। কারণ পোশাক খাতের রফতানির আকার ও প্রবৃদ্ধির গতি অনেক বেশি। পোশাকবহির্ভূত খাতগুলোর রফতানি বাড়লেও সেগুলোর ব্যাপ্তি পোশাকের তুলনায় অনেক কম। রফতানি খাতে এরই মধ্যে বৈচিত্র্য আসতে শুরু করেছে। কিন্তু এক্ষেত্রে সরকারের উদ্যোগগুলোর সুফল রাতারাতি পাওয়া যাবে না। এগুলো সময়সাপেক্ষ। তবে রফতানি বৈচিত্র্যকরণে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদেরও এগিয়ে আসতে হবে। নীতিসুবিধা আদায়, প্রাপ্তি, কার্যকর হওয়া সাপেক্ষে পর্যায়ক্রমে রফতানি খাতকে আরো বৈচিত্র্যময় করা যাবে।
ইপিবি সংশ্লিষ্টদের মতে, গত তিন অর্থবছরের রফতানি পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে নন-আরএমজি পণ্যের অংশ ক্রমেই বাড়ছে। পোশাকের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পোশাকবহির্ভূত পণ্য বাড়ছে। কিন্তু পোশাকের রফতানি এত বেশি যে যখন শতকরা হারে দেখা হয় তখন অন্য খাতগুলোর অবদান চোখে পড়ার মতো মনে হয় না।
ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান এএইচএম আহসান বণিক বার্তাকে বলেন, আর্থিক ও নীতি থেকে শুরু করে সব ধরনের সহায়তা প্রদানের ক্ষেত্রে পোশাক ও পোশাকবহির্ভূত খাতগুলোকে একই সুবিধা নিশ্চিত করার প্রয়োজন আছে। একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এক্ষেত্রে বিবেচনায় নিতে হবে। সেটা হলো নন-আরএমজির অভ্যন্তরীণ বাজার এত বড় যে উৎপাদকরা আন্তর্জাতিক বাজারের বিষয়ে উৎসাহ পান না। উৎসাহ বাড়ানোর জন্য সহায়ক নীতিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক বাজারমুখী করতে সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তাদের জন্য ভিন্ন ধরনের নীতি সহায়তার বিষয়ে ভাবতে হবে। আন্তর্জাতিক বাজারে মান ও খরচ একটা বড় বিষয়। অভ্যন্তরীণ বাজারে মানের বিষয়ে সচেতন হওয়ার প্রয়োজন তুলনামূলক কম বলে খরচও এক্ষেত্রে কম। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে মান উন্নত হতে হয়, সেজন্য খরচও বেশি করতে হয়। আমাদের উৎপাদনশীলতা ও দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে। এ মুহূর্তে দক্ষতা উন্নয়নের কোনো বিকল্প নেই।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রফতানি খাতকে বৈচিত্র্যময় করতে উদ্যোক্তা উন্নয়নের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। কৃষি, চামড়াজাত পণ্যে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। এছাড়া মত্স্যসহ অন্যান্য অপ্রচলিত পণ্য রফতানিতে সহায়তা ও পৃষ্ঠপোষকতা দেয়া হবে। লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং ও প্লাস্টিক পণ্য খাতকে এরই মধ্যে পৃষ্ঠপোষকতা দেয়া হচ্ছে। এ-সংক্রান্ত দক্ষতা বৃদ্ধিতে প্রকল্প চালু আছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (রফতানি) মো, হাফিজুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, রফতানি খাত আন্তর্জাতিক ক্রেতানির্ভর। দাম, মানের মতো অনেক বিষয় রফতানি খাতে প্রভাবকের ভূমিকা পালন করে। নীতি বৈষম্যের বিষয়গুলো এরই মধ্যে বিবেচনায় নেয়া শুরু হয়েছে। পোশাকের মতো অন্যান্য খাতের জন্য নীতিকাঠামো গড়ে তোলা হচ্ছে পর্যায়ক্রমে। হঠাৎ করে কোনো কিছু হয় না। পোশাক এমন একটা পর্যায়ে গেছে যে তাদের ওপর নির্ভর করা যাচ্ছে। অন্যান্য খাতে সুবিধা দেয়ার পর নজরদারি বৃদ্ধির প্রয়োজন হচ্ছে। এ ধরনের বিষয়গুলো অনেক বেশি কাজ করার বিষয় আছে।
দেশের পণ্যভিত্তিক রফতানি পর্যালোচনায় দেখা যায়, আটটি পণ্য মোট রফতানির বৃহৎ অংশজুড়ে আছে। এসব পণ্যের মধ্যে আছে ওভেন পোশাক, নিটওয়্যার, হোম টেক্সটাইল, হিমায়িত খাদ্য, কৃষিজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত দ্রব্য, চামড়া-চামড়াজাত পণ্য ও পাদুকা এবং প্রকৌশল পণ্য। মোট রফতানির ৯৫ শতাংশের বেশি অবদান রাখছে এ পণ্যগুলো। পণ্যভিত্তিক রফতানির এ পরিসংখ্যানই বলছে, রফতানি বৈচিত্র্যকরণ উদ্যোগের প্রতিফলন সেভাবে নেই। বরং রফতানিতে তৈরি পোশাকের ওপর নির্ভরতা ক্রমেই বাড়ছে। সম্ভাবনাময় হওয়ার পরও গতি পাচ্ছে না অন্যান্য খাতের রফতানি।
রফতানি খাতসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা বলছেন, পরিমাণে আরএমজি যেভাবে বেড়েছে অন্য খাতগুলো সেই পরিমাণে বাড়তে পারেনি। সরকারের পক্ষ থেকে করপোরেট কর থেকে শুরু করে বন্ডেড ওয়্যারহাউজের মতো সুযোগ-সুবিধাগুলো নিশ্চিত করা হচ্ছে। আবার পোশাক পণ্য রফতানি গন্তব্যগুলোয় শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকারসহ অন্য যে সহায়তা পায়, অন্য খাতগুলো তা পায় না। দেশের বাইরে ও অভ্যন্তরে রফতানি পণ্যগুলোর মধ্যে এক ধরনের নীতি বৈষম্য রয়েছে।
প্লাস্টিক পণ্য উৎপাদক ও রফতানিকারকদের সংগঠন বাংলাদেশ প্লাস্টিক গুডস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিজিএমইএ) সভাপতি শামীম আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, প্লাস্টিক পণ্যের প্রতিষ্ঠানগুলোর করপোরেট ট্যাক্স যেখানে ২২ থেকে ২৫ শতাংশ, সেখানে পোশাক খাতে করপোরেট ট্যাক্স ১০ শতাংশ। একদিকে বলা হচ্ছে পণ্যে বৈচিত্র্য নিয়ে আসতে, নতুন রফতানি বাজার সৃষ্টি করার কথা। অন্যদিকে করসহ নানা বোঝা চাপানো হচ্ছে অন্যান্য খাতে। এসব কারণে অন্য খাতগুলোকে প্রবৃদ্ধির সুযোগ আসলেই দেয়া হচ্ছে কিনা, সেই প্রশ্ন জাগে। যদি অন্যান্য খাতের প্রবৃদ্ধি চাওয়া হতো, তাহলে তো করের বোঝা লাঘব করা হতো। নিজেদের নীতিতে আমরা নিজেরাই বিঘ্ন ঘটাচ্ছি। নীতি বৈষম্য যেমন আছে, তেমনি নীতি থাকলেও তার প্রতিফলন নেই। নীতি বাস্তবায়নের জন্য যা করা দরকার সেটা আমরা করছি না।
পোশাক খাতের বাইরে বিলিয়ন ডলারের রফতানি খাত চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য। যদিও মোট রফতানিতে এ খাতের হিস্যা ৩ শতাংশের নিচে। একই অবস্থা তৃতীয় বৃহত্তম রফতানি পণ্য পাটেও।
রফতানিকারকরা বলছেন, প্রকৃতপক্ষে নন-আরএমজির শেয়ার ভ্যালুতে কমেনি। পোশাক ও বস্ত্র খাত বিশাল খাত। দেশের অভ্যন্তরে ও বাইরে দুদিকেই পোশাক ও বস্ত্র খাতের প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে। তবে পোশাকবহির্ভূত পণ্যগুলোর প্রবৃদ্ধি ততটা হয়নি। ফলে পার্থক্যটা বেড়ে গেছে। এছাড়া রফতানি খাতের পণ্যগুলোকে আন্তর্জাতিক বাজারে অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হয়, যেমন কভিড শেষ হতে না হতেই এখন যুদ্ধের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হচ্ছে।
রফতানিকারকদের সংগঠনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এত ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে পোশাক ও বস্ত্র খাতের হিস্যা ধরে রেখে প্রবৃদ্ধিও করতে সক্ষম হয়েছে। সাহস ও নিরলস পরিশ্রমের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তা ও শ্রমিকরা এটা সম্ভব করেছেন। অন্য খাতের উদ্যোক্তারা সাহসী ভূমিকা রাখতে পারেননি। নীতিসহায়তা কাজে লাগানোর সক্ষমতাও অর্জন করতে হয়। সেই পর্যায়ে যেতে হয় উদ্যোক্তাদের। অন্য খাতের উদ্যোক্তারা সেটা পারেননি।
পুরো রফতানি খাতই আন্তর্জাতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে এগিয়ে যাচ্ছে বলে জানান এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইএবি) সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, পোশাক ও বস্ত্র খাতের উদ্যোক্তাদের আমি স্বাগত জানাই, ধন্যবাদ জানাই তাদের সাহসী ভূমিকার জন্য। কোনো খাতে সম্ভাবনা দেখতে পেলেই সরকার সে খাতের পাশে দাঁড়ায়। আইটি খাতের সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়েই সরকার সেখানে ঋণের সুদহার কমিয়ে দিয়েছে, আবার কর সুবিধাও দেয়া হচ্ছে বিভিন্ন জায়গায়। পোশাকবহির্ভূত অন্য খাতগুলো তেমন কিছু করে দেখাতে পারছে না। অন্য খাতগুলোর রফতানি বাড়েনি তা নয়, কিন্তু পোশাক খাতের রফতানি যে হারে বেড়েছে সেই হারে বাড়তে পারেনি। ফলে অন্যান্য খাতের অবদান কম মনে হচ্ছে।










