পাহাড়, নদী ও সমুদ্রের মিলনস্থলে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম। নদী দখল, পাহাড় কেটে বসত ও শিল্প স্থাপনে এখানকার প্রাণ-প্রকৃতিতে বিরূপ প্রভাব পড়ছে। সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রামের বড় সংকট হিসেবে দেখা দিয়েছে নদী ও সমুদ্র থেকে বালি উত্তোলনের ঘটনা। সুবিধাভোগী শ্রেণী ছাড়াও এ অনিয়মে জড়িয়ে পড়ছেন জনপ্রতিনিধিরা।
সম্প্রতি বেশ কয়েকটি অভিযানে বঙ্গোপসাগরের সন্দ্বীপ চ্যানেল থেকে অনুমোদন ছাড়াই বালি উত্তোলনের প্রমাণ পেয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর। প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ছাড়াও এসব অনিয়মে জড়িয়ে পড়ছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। নিয়মবহির্ভূতভাবে বালি উত্তোলনের কারণে দেশের গুরুত্বপূর্ণ নৌ-রুটের ক্ষতি হওয়ার পাশাপাশি ভাঙনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তর অভিযুক্ত বেশ কয়েকজন জনপ্রতিনিধির শাস্তি প্রদান করেছে অবৈধ পথে সমুদ্র চ্যানেল থেকে বালি উত্তোলনের দায়ে।
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলা চেয়ারম্যান এসএম আল মামুন, একই উপজেলার বাড়বকুণ্ড ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাদাকাত উল্লাহ মিয়াজি ও বাঁশবাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শওকত আলী জাহাঙ্গীর এ তিন জনপ্রতিনিধির নির্বাচনী এলাকা চট্টগ্রাম বন্দরের সন্নিকটে কুমিরা-সীতাকুণ্ড-মিরসরাই সমুদ্র চ্যানেলসংলগ্ন। দেশের প্রধান জাহাজ ভাঙা শিল্পাঞ্চল এ সমুদ্র তীরে। সমুদ্রের তীর রক্ষা ও জেগে ওঠা চর অপসারণের অজুহাতে এ তিন জনপ্রতিনিধি তাদের নিজস্ব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নামে ভুয়া আদেশ সৃজন করে রাতের আঁধারে বালি উত্তোলন ও বিক্রি করছেন। অভিযোগের ভিত্তিতে সরজমিনে গিয়ে সত্যতাও পায় পরিবেশ অধিদপ্তর। অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় অর্থদণ্ড দেয়া হয়েছে এসব জনপ্রতিনিধির। অপরাধের দায়ে দণ্ডিত হলেও এ জনপ্রতিনিধিরা এখনো বহাল রয়েছেন।
পরিবেশ অধিদপ্তরের নথিপত্রে দেখা গেছে, ২০২২ সালের ২৪ মার্চ সীতাকুণ্ডের ছলিমপুর উপকূল থেকে চার লাখ ঘনফুট বালি উত্তোলন করার দায় স্বীকার করে নেয়ায় উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এসএম আল মামুনকে ২০ লাখ টাকা জরিমানা করে পরিবেশ অধিদপ্তর, চট্টগ্রাম। অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিচালক মফিদুল আলম অভিযুক্ত জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে এ আদেশ দেন। এর আগে অর্থাৎ একই বছরের ৬ মার্চ উপজেলার বাঁশবাড়িয়ার আকিল সমুদ্রসৈকত এলাকায় ৫০ হাজার ঘনফুট বালি তোলার দায়ে বাড়বকু্ল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাদাকাত উল্লাহ মিয়াজি, বাঁশবাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শওকত আলী জাহাঙ্গীর ও মাদার স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডের মালিক আবুল কাশেম মাস্টারকে ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেয় পরিবেশ অধিদপ্তর। তবে পরিবেশের ক্ষতি করে পরিবেশ আইনে দণ্ডিত হওয়ার পরও পদে বহাল রয়েছেন এ তিন জনপ্রতিনিধি।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সীতাকুণ্ড উপজেলা চেয়ারম্যান এসএম আল মামুন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমি কখনই বালির ব্যবসা করিনি। আমাদের শিপব্রেকিং ইয়ার্ডের মুখে সমুদ্রে চর উঠে যাওয়ায় বন্দর ও শিপ ব্রেকিং অ্যাসোসিয়েশনের অনুমোদন নিয়েই বালি অপসারণ করেছি মাত্র। এর পরও পরিবেশ অধিদপ্তর অভিযান পরিচালনার সময় আমরা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখিয়েছি। অধিদপ্তর জরিমানা করেছে আমাদের প্রতিষ্ঠানকে। আমরা এর বিরুদ্ধে আপিল করেছি।’
তবে পরিবেশ অধিদপ্তরের নথি বলছে, উপজেলা চেয়ারম্যানের মালিকানাধীন শিপব্রেকিং ইয়ার্ড মেসার্স এমএম শিপ ব্রেকার্স লিমিটেডের অবস্থান উপজেলার সোনাইছড়ি ইউনিয়নের জোড়ামতল এলাকায়। কিন্তু পরিবেশ অধিদপ্তর বালি উত্তোলনের প্রমাণ পায় উপজেলার দক্ষিণ সলিমপুর এলাকার সাগরপারে। অর্থাৎ দক্ষিণ সলিমপুর থেকে জোড়ামতল এলাকার দূরত্ব অন্তত ১০ কিলোমিটার। নিজ ইয়ার্ড ফেলে সলিমপুর এলাকার সমুদ্র চ্যানেল থেকে কেন বালি উত্তোলন করা হচ্ছে, এ বিষয়ে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি এমএম শিপ ব্রেকার্সের প্রতিনিধিরা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পরিবেশ অধিদপ্তর, চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিচালক ফেরদৌস আনোয়ার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘যেকোনো ধরনের পরিবেশবিরুদ্ধ কর্মকাণ্ডের খবর পেলেই আমরা অভিযান পরিচালনা করি। অভিযোগ প্রমাণিত হলে জরিমানাসহ তদন্ত প্রতিবেদন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়। সাম্প্রতিক সময়ে সীতাকু্ণ্ড উপজেলার উপকূলজুড়ে সমুদ্র চ্যানেল থেকে বালি উত্তোলনের ঘটনা বাড়ছে। বালি উত্তোলনের ক্ষেত্রে অনুমতি প্রদান করতে পারে জেলা প্রশাসন। কিন্তু অনুমতি না নিয়েই সীতাকুণ্ডে বেশির ভাগই শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড মালিক, ব্যবসায়ী এমনকি জনপ্রতিনিধিরাও সমুদ্র থেকে বালি উত্তোলন করছেন। তদন্তে অবৈধভাবে বালি উত্তোলন করে পরিবেশের ক্ষতি করার প্রমাণ পাওয়ার পর সীতাকু্ণ্ডের তিন জনপ্রতিনিধিকে নোটিস দেয়া হয়। শুনানিতে তারা অপরাধ স্বীকার করে নেয়ায় জনপ্রতিনিধিদের অর্থদণ্ড দেয়া হয়েছে। সাধারণ ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে বর্তমানে জনপ্রতিনিধিরাও আইন অমান্য করে পরিবেশের ক্ষতি সাধন করে বালি উত্তোলনে জড়িয়ে পড়ছেন। জেলা প্রশাসনকেও এ বিষয়ে কয়েক দফায় জানানো হয়েছে। সমুদ্র চ্যানেল থেকে বালি উত্তোলন বন্ধ করতে ব্যবস্থা গ্রহণ করার পাশাপাশি এসব জনপ্রতিনিধিকে আইনের আওতায় আনা উচিত।’
এ বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক বদিউল আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কোনো জনপ্রতিনিধি আইন অমান্য করে সমুদ্র চ্যানেল থেকে বালি উত্তোলন করছেন এমন খবর আমরা পাইনি। তাছাড়া স্থানীয় সরকার আইনে পরিবেশের ক্ষতি করে দণ্ড পাওয়ার পর জনপ্রতিনিধিদের বিষয়ে কী বলা আছে, সে বিষয়টি দেখে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’
প্রসঙ্গত, চট্টগ্রামের লোহাগড়া উপজেলার চরম্বা ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য জসিম উদ্দিনকে বালি উত্তোলনের দায়ে ২ লাখ টাকা জরিমানা করার পর সাময়িক বরখাস্ত করে সরকার। চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি অবৈধভাবে বালি উত্তোলনের দায়ে সাময়িক বরখাস্তের এই প্রজ্ঞাপন জারি করে স্থানীয় সরকার বিভাগ। ২০২২ সালের ২২ জুন উপজেলার চরম্বা ইউনিয়নের কাজির পাড়া ও জামছড়ি খালে অভিযান পরিচালনা করেন উপজেলা সরকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ শাহজাহান। এ সময় ইউপি সদস্য জসিম উদ্দিনকে জরিমানার পাশাপাশি অবৈধভাবে উত্তোলন করা ৪২ হাজার ঘনফুট বালি জব্দ ও বালি তোলার তিনটি মেশিন ধ্বংস করা হয়েছিল ওই অভিযানে।










