টানা বর্ষণ ও উজানের ঢলে ৭ জুলাই ফেনীতে ভারি বর্ষণ শুরু হয়। মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ৪১টি স্থানে ভাঙন দেখা দেয়। ফুলগাজী, পরশুরাম, ছাগলনাইয়া, ফেনী সদর ও দাগনভূঞা উপজেলার ১৩৭টি গ্রাম প্লাবিত হয়। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে কয়েক লাখ মানুষ। তলিয়ে গেছে ফসলের খেত ও মাছের ঘের। বিশেষ করে বন্যাকবলিত এলাকায় আবাদকৃত আউশ, আমন বীজতলা, গ্রীষ্মকালীন সবজি ও আদাখেত পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। ফসল হারিয়ে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন ২৯ হাজার কৃষক।

কৃষি বিভাগ বলছে, বন্যায় অন্তত ৩৮ কোটি ৭ লাখ টাকার ফসল নষ্ট হয়ে গেছে, যা থেকে প্রায় ১০ হাজার টন খাদ্যশস্য উৎপাদন করা সম্ভব হতো।

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ভারি বৃষ্টিতে ৮ জুলাই নদী রক্ষা বাঁধে ভাঙন শুরু হয়। একপর্যায়ে ফুলগাজী ও পরশুরাম উপজেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদী রক্ষা বাঁধের বিভিন্ন স্থান ভেঙে লোকালয়ে পানি ঢুকতে থাকে। একের পর এক গ্রাম তলিয়ে যেতে থাকে। রাস্তাঘাট, বিদ্যুৎ সংযোগ ও যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। অবস্থা বেগতিক দেখে মানুষ ঘরবাড়ি রেখে আশ্রয় কেন্দ্রে চলে যায়। বন্যার পানিতে জেলায় ১২৬টি সড়কের প্রায় ৩০০ কিলোমিটারে বড় বড় গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। খামারে পানি ওঠায় অন্তত ১৫-১৭ হাজার হাঁস-মুরগি মারা গেছে। শতাধিক ঘর ধসে পড়েছে। অন্তত আড়াই হাজার পুকুর থেকে ৮ কোটি টাকার মাছ ভেসে গেছে।

এদিকে ফুলগাজী ও পরশুরামে নদী রক্ষা বাঁধের কয়েকটি স্থানে জরুরি মেরামত শুরু করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। এখনো বন্যাকবলিত অনেক গ্রাম থেকে পানি নামেনি। জলাবদ্ধতায় বেড়েছে জনদুর্ভোগ। রাস্তা ভেঙে যাওয়ায় অনেক এলাকা এখনো জেলা ও উপজেলা শহর থেকে বিচ্ছিন্ন রয়েছে। বসতভিটা পানির নিচে তলিয়ে থাকায় আশ্রয় কেন্দ্র ছাড়তে পারেনি ৮৮টি পরিবার।

ফেনী পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আক্তার হোসেন মজুমদার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘উজান থেকে নেমে আসা পানির চাপে মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ৪১টি স্থান ভেঙে ১৩৭টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এখন পানি বিপৎসীমার নিচে প্রবাহিত হচ্ছে। পানি কমে আসায় বাঁধের কয়েকটি স্থানে জরুরি মেরামত শুরু হয়েছে। বৃষ্টি বন্ধ থাকলে স্বল্প সময়ের মাঝেই ভাঙনকবলিত স্থানগুলো মেরামত শেষ করা হবে।

কৃষি বিভাগের তথ্য বলছে, ফেনীর সব উপজেলার ফসলি জমি কম বেশি আক্রান্ত হয়েছে। শুধু কৃষিতেই অন্তত ৩৮ কোটি ৭ লাখ টাকার ক্ষতি হয়। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে আমন বীজতলার। চলতি মৌসুমে ১ হাজার ৩২২ হেক্টর জমিতে বীজতলা তৈরি করেন কৃষক। এর মধ্যে ৬৯৪ হেক্টর বীজতলা বন্যার পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। পানিতে তলিয়ে ১৯৭ হেক্টর বীজতলা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। বাকি ৪৯৭ হেক্টর বীজতলার আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে কৃষকের অন্তত ২ কোটি ২৪ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে ৫৫৭ হেক্টর জমির গ্রীষ্মকালীন সবজি। এর মধ্যে ৩২৭ হেক্টর জমির সবজি নষ্ট হয়ে গেছে। ২৩০ হেক্টর জমির সবজি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ৩৪৬ হেক্টর জমির আউশ ধান তলিয়ে গেছে। বন্যাকবলিত এলাকায় গ্রীষ্মকালীন মরিচ, আদা, হলুদ, টমেটো, আদাখেতের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

পরশুরাম উপজেলার মির্জানগর ইউনিয়নের কৃষক আবদুস সামাদ বলেন, ‘ঋণ করে ৫০ শতক জমিতে সবজি চাষ করেছি। বাজারে সবজির দামও ভালো পাচ্ছিলাম। এর মধ্যে বন্যায় সবকিছু ধ্বংস করে দিয়েছে। কীভাবে ঋণ পরিশোধ করব বুঝতে পারছি না। আশ্রয় কেন্দ্র থেকে বাড়ি এসে দেখি ঘরের সব আসবাব নষ্ট হয়ে গেছে। থাকব কোথায়, যাব কোথায় তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছি।’

চিথলিয়া ইউনিয়নের মোস্তফা মিয়া বলেন, ‘২০২৪ সালের বন্যায় আমার এক একর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। পরে উপজেলা অফিস থেকে আমাকে কিছু সার ও বীজ দেয়া হয়, যা ক্ষয়ক্ষতির তুলনায় নগণ্য। সরকার শুধু ক্ষয়ক্ষতির তালিকাই করে। কাজের কাজ তেমন কিছুই হয়নি। এবারো তা-ই হবে।’

ফেনী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ আতিক উল্লাহ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চলতি মাসের বন্যায় ফেনীতে ২৮ হাজার ৮৩৫ কৃষকের অন্তত ৩৮ কোটি টাকার ফসলের ক্ষতি হয়েছে। এসব ফসল থেকে অন্তত সাড়ে নয় হাজার টন খাদ্যশস্য উৎপাদন হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। আমরা মাঠ পর্যায়ে পাওয়া এ-সংক্রান্ত ক্ষয়ক্ষতির একটি প্রতিবেদন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠিয়েছি। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের প্রণোদনার বিষয়ে পরবর্তী নির্দেশনার আলোকে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

তিনি জানান, বন্যায় বিভিন্ন উপজেলায় সবজিখেত নষ্ট হয়েছে। এতে জেলার বিভিন্ন হাটবাজারে সবজির দাম কিছুটা বেড়েছে। অন্য জেলা থেকে সবজি সরবরাহ শুরু হলে এ সংকট কেটে যাবে।

সার্বিক বিষয়ে জেলা প্রশাসক সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘এখনো ফেনীর সাতটি গ্রাম পানিতে নিমজ্জিত রয়েছে। বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হলেও পানি এখনো সব জায়গা থেকে নামেনি। এরই মধ্যে বিভিন্ন দপ্তর থেকে পাওয়া ক্ষয়ক্ষতির প্রতিবেদন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন ও প্রণোদনার বিষয়ে পরবর্তী নির্দেশনার আলোকে পদক্ষেপ নেয়া হবে।’