ঢাকায় সাধারণ মানুষের যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম বাস। মালিক সমিতির হিসাবে রাজধানী শহরে কম-বেশি পাঁচ হাজার বাস চলাচল করে। ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত টানা ১৪ ঘণ্টার যাত্রী পরিষেবায় নিয়োজিত থাকে সেগুলো। তবে দীর্ঘ সময় রাস্তায় থাকলেও খুব বেশি পথ পাড়ি দিতে পারে না ঢাকার বাস। যানজট আর দাঁড়িয়ে যাত্রী তোলা-নামানোর কারণে কমে যায় গড় গতি।

ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) এক সমীক্ষায় উঠে এসেছে, দেশের এ প্রধান শহরে বাসের গড় গতি ঘণ্টায় ৯ দশমিক ৭ কিলোমিটার, যা একটি সাইকেল বা রিকশার স্বাভাবিক গতির সমান। পিক আওয়ারে (অফিস শুরু ও শেষের সময়) এ গতি ঘণ্টায় ৫ থেকে ৭ কিলোমিটারে নেমে আসে। আবার যানজটে দীর্ঘক্ষণ এক স্থানে আটকে থাকলে গড় গতি নেমে যায় পাঁচ কিলোমিটারের নিচে। পৃথিবীর উন্নত শহরগুলোর তুলনায় ঢাকায় বাসের গড় গতি এক-তৃতীয়াংশ কম। উন্নত বিশ্বের শহরগুলোয় বাসের গড় গতি ঘণ্টায় ১৪ কিলোমিটার।

ডিটিসিএর তথ্য বলছে, গতি কম হওয়ায় বাসের প্রতি ব্যবহারকারীদের আকর্ষণ কমে যাচ্ছে। তারা মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন বিকল্প যানবাহনের দিকে ঝুঁকছেন। আর পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ছোট ছোট যেসব বাহন বাসের বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, সেগুলোর কারণে ঢাকার যানজট আরো প্রকট আকার ধারণ করছে। শহরের গণপরিবহন ব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলাও বাড়ছে।

ঢাকার জন্য প্রণীত ২০ বছর মেয়াদি সংশোধিত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা হালনাগাদ করছে ডিটিসিএ। পরিকল্পনার খসড়া প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজধানীতে মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম পাবলিক বাস। ঢাকায় মেট্রোরেল, বিআরটির মতো প্রকল্প বাস্তবায়নের পরও বাসের ওপর মানুষের নির্ভরশীলতা কমবে না। প্রধান গণপরিবহন হলেও যানজটের কারণে চলাচলের গতি কম হওয়ায় ঢাকার বাসের উৎপাদনশীলতা যেমন কম, তেমনি এখানে বাস পরিচালনা খুব একটা লাভজনকও নয়।

আরো বলা হয়েছে, স্বল্প উৎপাদনশীলতার কারণে প্রত্যাশিত মুনাফা না হওয়ায় ঢাকায় পুরনো বাস পরিচালনা করেন মালিকরা। আর চালক-শ্রমিকরা গাদাগাদি করে যাত্রী তোলেন, অন্য বাসের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হন। অন্যদিকে লক্কড়-ঝক্কড় বাস, অতিরিক্ত ভিড়, স্বল্প গতির কারণে ব্যবহারকারীরা বাসের প্রতি আকর্ষণ হারাচ্ছেন। অনেক ব্যবহারকারী বাসের বদলে মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন বিকল্প পরিবহনের দিকে ঝুঁকছেন, এর প্রভাবে ঢাকায় ভ্রমণে বাসের ব্যবহারও ধারাবাহিকভাবে হ্রাস পাচ্ছে। এর প্রভাবে ঢাকার পরিবহনের মোডাল শেয়ারে।

ডিটিসিএর তথ্য বলছে, ২০০৯ সালে ঢাকার পরিবহন খাতের মোট ট্রিপের ২৮ দশমিক ৫ শতাংশ হতো বাসে। ২০২৩ সালে মোট ট্রিপে বাসের পরিমাণ কমে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ২ শতাংশে। অন্যদিকে ঢাকায় প্রতিদিনকার মোট ট্রিপের ৩৫ শতাংশ হচ্ছে পায়ে হেঁটে। ৩০ শতাংশ ট্রিপ হচ্ছে রিকশায়। প্রায় ১৪ শতাংশ ট্রিপ হচ্ছে সিএনজি অটোরিকশা, প্রাইভেট কারের মতো ছোট ছোট যানবাহনে। ছোট যানবাহনের আধিক্যের কারণে ঢাকায় যানজট আরো প্রকট হয়ে উঠছে বলে জানিয়েছেন পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান। এ প্রসঙ্গে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌সরকার ঢাকার জন্য ভালো বাসের ব্যবস্থা করতে পারছে না। ভাড়াও নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। বাস ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সরকারের ভুল নীতির কারণে ঢাকায় অসংখ্য ছোট ছোট পরিবহন ঢুকে পড়েছে। ছোট ছোট এসব যানবাহন ঢাকায় যানজট আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং গণপরিবহন খাতে নতুন নতুন সমস্যা তৈরি করছে।’

এ অবস্থার পরিবর্তনে গণপরিবহনকে প্রাধিকার দেয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘‌ঢাকায় এখনো বাসের গতিবেগ বাড়ানোর সুযোগ আছে। এজন্য প্রধান শহরগুলোতে বাসের জন্য আলাদা লেন তৈরি করা যেতে পারে। নির্দিষ্ট সময় পর পর প্রয়োজনীয়সংখ্যক উন্নতমানের বাস পরিচালনা করতে হবে। আলাদা লেনে চললে বাসের গতি স্বাভাবিকভাবেই বৃদ্ধি পাবে। এর সঙ্গে উন্নত সেবা পেলে যাত্রীরাও ছোট ছোট যানবাহন ছেড়ে এসব বাসের দিকে আকৃষ্ট হবে।’

অন্যদিকে ঢাকায় বাসসহ সব ধরনের যানবাহনের ধীরগতি ও তীব্র যানজটের জন্য সামগ্রিক বিশৃঙ্খলাকে দায়ী করেছেন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান। এ প্রসঙ্গে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ঢাকায় যানবাহনের গতি কম থাকার প্রধান কারণ বিশৃঙ্খলা। কিছুদিন আগে আমি সরাইল গিয়েছিলাম। ওখানে গিয়ে কিছু ইঞ্জিনিয়ারিং সলিউশন এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার কিছু ছোট ছোট সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেই। এর প্রভাবে সরাইলে যেখানে ৪ ঘণ্টার যানজট হতো, সেখানে এখন ১৫ মিনিটে পার হওয়া যাচ্ছে।’

ঢাকার সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর উদ্যোগ গ্রহণের কথা জানিয়ে উপদেষ্টা বলেন, ‘‌এর অংশ হিসেবে নির্ধারিত স্টপেজে বাস থামানোর ব্যবস্থা চালু করতে যাচ্ছি। আগামী মাস থেকেই হয়তো এটা চালু হয়ে যাবে। যত্রতত্র বাস থামা বন্ধ হলে ঢাকার যানজট অনেকটাই কমে আসবে। সড়কে বিশৃঙ্খলার আরেকটি বড় কারণ চালকদের অদক্ষতা, অসচেনতা এবং আইন না মানার প্রবণতা। আমরা এ বিষয়টি নিয়েও কাজ করছি। এখন থেকে চালকদের বাধ্যতামূলক ৬০ ঘণ্টা প্রশিক্ষণ দেয়ার পর ড্রাইভিং লাইসেন্স দেয়া হবে। আমরা আশা করছি, এ প্রশিক্ষিত চালকদের হাত ধরে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরতে শুরু করবে। ফিটনেসবিহীন যানবাহনও ঢাকার রাস্তায় বিশৃঙ্খলার আরেকটি কারণ। আমরা প্রতিদিন ২০-৩০টি ফিটনেসবিহীন যানবাহন আটক করে ডাম্পিংয়ে পাঠাচ্ছি।’