পরিবেশ দূষণের দায়ে ২০১৯ সালে মিরপুর বেড়িবাঁধ এলাকায় অবস্থিত তিনটি রেডিমিক্স কারখানাকে ২ লাখ করে মোট ৬ লাখ টাকা জরিমানা করেছিল পরিবেশ অধিদপ্তর। সে সময় সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানানো হয়, মাইশা কনস্ট্রাকশন লিমিটেড, এবিসি বিল্ডিং প্রডাক্টস এবং করিম এক্সপোর্ট অ্যান্ড রেডিমিক্স লিমিটেডকে এ জরিমানা করা হয়েছে। এ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর প্রতিক্রিয়া দেখান বড় শিল্প মালিকরা। তাদের অভিযোগ, এভাবে দূষণকারী শিল্পপ্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশ করলে প্রতিষ্ঠানের সুনাম নষ্ট হয়। তাই মান বাঁচাতে নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানান তারা। বিষয়টি আমলে নিয়ে দূষণকারী প্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশ না করার মৌখিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর।

দেশীয় ও আন্তর্জাতিক একাধিক গবেষণা বলছে, বাংলাদেশের সার্বিক পরিবেশ সুস্থ জীবনধারণের জন্য সন্তোষজনক নয়। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য বাণিজ্যিক এলাকার বায়ু, পানি, নদ-নদী দূষণে জর্জরিত। দূষণ নিয়ন্ত্রণের সার্বিক দেখভালের দায়িত্ব পরিবেশ অধিদপ্তরের। পরিবেশ দূষণের বড় একটি কারণ শিল্প-কারখানাগুলো। যাচাই-বাছাই করে এগুলোকে ছাড়পত্র দেয়া এবং দূষণকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া এ অধিদপ্তরের অন্যতম কাজ। একইভাবে দূষণের সঙ্গে কারা জড়িত এবং তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে, তার তথ্য বিস্তারিতভাবে জনসম্মুখে প্রকাশ করাও পরিবেশ অধিদপ্তরের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। আগে নিয়মিত তা করলেও সম্প্রতি দূষণকারী বড় প্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশ করছে না অধিদপ্তর।

১৩ এপ্রিল পরিবেশ অধিদপ্তরের এনফোর্সমেন্ট শাখা ঢাকা ও গাজীপুরে সাতটি প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ৩ লাখ টাকা জরিমানা করে। অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্যে প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ও জরিমানার অংক উল্লেখ থাকলেও প্রতিষ্ঠানগুলোর নাম প্রকাশ করা হয়নি। এর আগে ৭ এপ্রিল শব্দ দূষণের দায়ে একটি হাসপাতালকে ২ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ ধার্য করলেও হাসপাতালটির নাম ওয়েবসাইটে দেয়া হয়নি। এমনকি কিছুদিন ধরে পরিবেশ অধিদপ্তরের এনফোর্সমেন্ট শাখা থেকে প্রকাশিত প্রেস রিলিজ ও খবরে কোনো প্রতিষ্ঠানের নামই উল্লেখ করা হচ্ছে না।

জানা গেছে, শিল্প মালিকদের আপত্তির কারণেই দূষণকারী প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করছে না পরিবেশ অধিদপ্তর। আগে নাম উল্লেখ করা হলেও তাতে মান ক্ষুণ্ন হচ্ছে বলে আপত্তি জানান বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিকরা। তাদের আপত্তির পরিপ্রেক্ষিতেই দূষণকারী প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করা হবে না বলে সিদ্ধান্ত নেয় অধিদপ্তর। তবে মহাপরিচালক অথবা তার অনুমতি সাপেক্ষে অন্য কর্মকর্তারা দূষণকারী প্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশ করতে পারবেন বলেও সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

অধিদপ্তরের একটি সূত্র জানায়, বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের মৌখিক নির্দেশে সদস্যদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এ সিদ্ধান্ত নেন। বৈঠক থেকে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, প্রেস রিলিজ, ওয়েবসাইটের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও দূষণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর নাম প্রকাশ করা যাবে না। এ নির্দেশ জেলা পর্যায়ের কার্যালয়গুলোকেও জানিয়ে দেয়া হয়। তবে বৈঠকে এ বিষয়ে কোনো লিখিত সিদ্ধান্ত হয়নি। যেহেতু সমন্বিত উদ্যোগে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে, তাই লিখিত আদেশের মতোই মেনে চলা হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, দূষণকারী প্রতিষ্ঠানের নাম গোপন করার মতো কোনো বিষয় নয়। ফলে পরিবেশ অধিদপ্তর কেন এটি গোপন রাখছে তা খতিয়ে দেখা দরকার। এছাড়া পরিবেশ অধিদপ্তর যখন অভিযান চালায়, তখন তো গণমাধ্যম কর্মীরাও উপস্থিত থাকেন। তাই ইচ্ছা করলেও দূষণকারী প্রতিষ্ঠানের নাম গোপন রাখা সম্ভব নয়।

তবে নাম প্রকাশ না করার বিষয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (মনিটরিং অ্যান্ড এনফোর্সমেন্ট) মোহাম্মাদ মাসুদ পাটোয়ারী। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, দেশে অসংখ্য প্রতিষ্ঠান পরিবেশ দূষণ করছে। সবার নাম প্রকাশ করলে তো ওয়েবসাইটে জায়গার সংকুলান হবে না। তাই আমরা শুধু সংক্ষেপে সংখ্যা উল্লেখ করছি।

প্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশে কোনো বাধা আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, কোনো বাধা নেই। তবে আমরা আপাতত শিল্পপ্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করছি না।

দূষণকারী শিল্পপ্রতিষ্ঠানের নাম জানানো পরিবেশ অধিদপ্তরের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, দূষণকারী প্রতিষ্ঠানের সুনাম রক্ষার জন্য তাদের নাম প্রকাশ করা হচ্ছে না, এটি ন্যক্কারজনক। যে প্রতিষ্ঠান পরিবেশ দূষণ করছে, তাদের সুনাম কেন পরিবেশ অধিদপ্তরকে রক্ষা করতে হবে সে প্রশ্ন রাখেন তিনি। রিজওয়ানা হাসান বলেন, পরিবেশ অধিদপ্তর একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান। তাদের কার্যক্রম সুস্পষ্ট হওয়া উচিত। দূষণকারী প্রতিষ্ঠানের নাম গোপন করার অধিকার তাদের নেই।

কোনো প্রতিষ্ঠান পরিবেশ দূষণ করলে তা সাধারণ মানুষকে ক্ষতিগ্রস্ত করে উল্লেখ করে এ সমাজকর্মী বলেন, সে হিসেবে দেশের মানুষের অধিকার আছে এসব প্রতিষ্ঠানের নাম জানার। পরিবেশ অধিপ্তরের কাজ দূষণকারীদের শাস্তি নিশ্চিত করা, তাদের মান বাঁচানো নয়। অধিদপ্তরের এমন সিদ্ধান্তের কারণে বড় প্রতিষ্ঠানগুলো আরো বেশি দূষণপ্রবণ হয়ে উঠবে। এসব প্রতিষ্ঠান সারা বছর দূষণ করবে, বছর শেষে কিছু টাকা জরিমানা দিয়ে পার পেয়ে যাবে। আবার নামটাও গোপন থাকবে। এটা তো তাদের জন্য রীতিমতো সুবর্ণ সুযোগ। দেশের পরিবেশের জন্য এটিকে বড় দুঃখজনক ঘটনা বলে মন্তব্য করেন তিনি।