সরকারি নিয়োগ মানে দীর্ঘসূত্রতা। জনবল সংকট সামাল দিতে তাই টেম্পোরারি লেবার রিক্রুটমেন্ট (টিএলআর) পদ্ধতিতে অস্থায়ী কর্মচারী দিয়ে দৈনন্দিন সেবা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছিল বাংলাদেশ রেলওয়ে। বর্তমানে দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে (কাজ নেই, মজুরি নেই বা কানামনা পদ্ধতি) রাষ্ট্রায়ত্ত বৃহৎ পরিবহনসেবা সংস্থাটির বিভিন্ন দপ্তরে কাজ করছেন প্রায় সাত হাজার টিএলআর শ্রমিক। তবে এ পদ্ধতি থেকে সরে এসে রেলওয়ে এবার আউটসোর্সিংয়ে লোকবল নিয়োগ দিতে চাইছে, তাতেই তৈরি হয়েছে অস্থিরতা। লোকবল ছাঁটাই করে আউটসোর্সিং পদ্ধতি চালু হলে রেলওয়ের সেবা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।

টিএলআর কর্মীদের বাদ দিয়ে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে লোকবল নিয়োগে রেলওয়ে ২০১৮ সালে একটি নীতিমালা প্রণয়ন করে। যদিও এখন পর্যন্ত সেটি বাস্তবায়ন করতে পারেনি তারা। এর মধ্যে ২০২০ সালের ২২ নভেম্বরের রেলওয়ে নিয়োগ বিধিমালা প্রণয়ন করে। সে অনুযায়ী অত্যাবশ্যকীয় পদগুলোয় সরাসরি বা পদোন্নতির মাধ্যমে লোকবল নিয়োগের কথা। আর অন্যান্য টিএলআর পদে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে লোক নেয়ার কথা বলা রয়েছে। সর্বশেষ ১ জুলাই থেকে সব টিএলআর কর্মী বাদ দিয়ে আউটসোর্সিং চালুর প্রক্রিয়া শুরু করায় নিয়োগবিধি লঙ্ঘন ছাড়াও রেলের জরুরি সেবা কার্যক্রম ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

রেলওয়ে নিয়োগবিধি অনুযায়ী, পি-ম্যান (পয়েন্টস ম্যান), গেটম্যান বা গেটকিপার, পোর্টার, খালাসি, ওয়েম্যান, ক্যারেজ খালাসি পদগুলো অত্যাবশ্যকীয়। এগুলোয় সরাসরি কিংবা পদোন্নতির মাধ্যমে নিয়োগের নির্দেশনা রয়েছে। আর অ্যাম্বুলেন্স ক্লিনার, হসপিটাল ক্লিনার, স্ট্রেচার বেয়ারার, নিরাপত্তা প্রহরী, কনজার্ভেন্সি ক্লিনার, ডিসপেন্সারি ক্লিনার, প্যাথলজি ক্লিনার, বাগান মালি, মালি, বাবুর্চি, রেস্টহাউজ বেয়ারার, আয়া, পরিচ্ছন্নতা কর্মী, বাবুর্চি কাম বেয়ারার (রেস্টহাউজ) নিয়োগের বিধান আউটসোর্সিং নীতিমালা-২০১৮-এর অনুসারেই রাখা হয়েছে। কিন্তু রেলওয়েতে কর্মরত অত্যাবশ্যকীয়সহ সব টিএলআর কর্মীকেই বাদ দিয়ে তিন মাসের মধ্যে এসব পদে আউটসোর্সিংয়ের লোকবল নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে রেলওয়ে। এক্ষেত্রে দরপত্র আহ্বানের প্রস্তুতি নিচ্ছে রেলওয়ের সংস্থাপন শাখা। বিভিন্ন দপ্তরে কর্মরত টিএলআরদেরও অবশ্য আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগে সুপারিশের আশ্বাস মিলেছে। সেক্ষেত্রে আগামী তিন মাস তাদের কাজ করতে হবে একেবারে বিনাবেতনে! এরই ধারাবাহিকতায় সারা দেশে বিভিন্ন সেকশনে কর্মরত টিএলআর কর্মীদের কাছ থেকে হাজিরা শিট নিয়ে নেয়া হচ্ছে। শ্রমিকরা নিজে ইস্তফা দিলে সেটিকেও স্বাগত জানানো হচ্ছে। রেলওয়ের এমন সিদ্ধান্তে টিএলআর কর্মীদের অনেকেই আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।

রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, রেলওয়েতে ৫০০ জনের মতো পি-ম্যান টিএলআর কর্মরত ছিলেন। এরই মধ্যে তাদের চাকরি থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। এছাড়া পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়েতে কর্মরত সাড়ে তিন হাজারের অধিক গেটম্যান, এক হাজারের অধিক পোর্টার, প্রায় ৪০০ খালাসি, পাঁচ শতাধিক ওয়েম্যান, প্রায় দুই হাজার ক্যারেজ খালাসিকেও সরিয়ে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগের কাজ শুরু করেছে রেলওয়ে। দীর্ঘ সময় কাজ করার পর অনিশ্চিত কর্মজীবনের ভয়ে সেই কর্মীরা এখন কাজ বন্ধ করে দিলে রেলওয়ের পরিচালনসেবায় বড় ধরনের জটিলতা তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন রেলওয়ে পরিবহন বিভাগের কর্মকর্তারা। 

রেলওয়ে আইন ও শ্রম আইনের নিয়মে এরই মধ্যে ১ হাজার ২০০ জনের বেশি টিএলআর কর্মী উচ্চ আদালতে মামলার মাধ্যমে রেলওয়েতে স্থায়ী চাকরির নির্দেশনা পেয়েছেন। তবে কোনো ধরনের আইনের তোয়াক্কা না করে রেলওয়ে প্রশাসন সেই টিএলআর কর্মীদের স্থায়ী করতে রাজি হচ্ছে না। এক দশকের বেশি সময় কাজ করার পরও স্থায়ী পদে যুক্ত হতে না পেরে আন্দোলন, কর্মবিরতি ও ধর্মঘটের দিকে এগোচ্ছে টিএলআর শ্রমিকদের নিয়ে গঠিত বাংলাদেশ রেলওয়ে অস্থায়ী টিএলআর শ্রমিক পরিষদ।

সংগঠনটির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সচিব মোহাম্মদ হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘টিএলআর কর্মীরা একটি নির্দিষ্ট সময় পর স্থায়ী হওয়ার আশায় অন্যান্য চাকরি বা ভবিষ্যৎ কর্মজীবন বাদ দিয়ে রেলওয়েতে কাজ করেছেন। কিন্তু শ্রমিক আইন, রেলওয়ের নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই রেলওয়ে প্রশাসন টিএলআরদের বাদ দিয়ে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে কর্মী নিয়োগের অপচেষ্টা চালাচ্ছে। এক্ষেত্রে উচ্চ আদালতের রায়কেও উপেক্ষা করছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।’ 

এ শ্রমিক নেতা অভিযোগ করেন, ‘‌রেলওয়ের মতো স্পর্শকাতর রাষ্ট্রীয় একটি প্রতিষ্ঠানে দৈনিক মজুরিভিত্তিক শ্রমিকের মতো আউটসোর্সিং কোনোভাবে মেনে নেয়া যায় না। আবার নিয়োগবিধিতে অত্যাবশ্যকীয় পদগুলোকে আউটসোর্সিংয়ের আওতার বাইরে রাখার কথা বলা হলেও সেটি অমান্য করছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। টিএলআর কর্মীরা রেলের এসব অন্যায় কার্যক্রম প্রতিহত করা ও উচ্চ আদালতের রায় বাস্তবায়নে বৃহৎ আন্দোলন কর্মসূচিতে যাবেন।’

রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের হিসাব বিভাগ ২০২২ সালের ৩০ জুন এক চিঠিতে ‘কাজ নেই, মজুরি নেই—কানামনা’ ভিত্তিতে নিয়োগপ্রাপ্ত ১৬-২০তম গ্রেডের ৮৩ জন ও সিজিপিওয়াই শ্রমিক ৩৩ জনকে অব্যাহতি দেয়। এরই ধারাবাহিকতায় পশ্চিমাঞ্চলের সৈয়দপুর কারখানায় ৪০০ খালাসি, লালমনিরহাট ডিভিশনের ক্যারেজ খালাসি ১৬ জন, পার্বতীপুরে (পাকশী ডিভিশন) ক্যারেজ খালাসি ১২ জনকে অব্যাহতি দেয়া হয়। এরপর টিএলআর শ্রমিকদের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশনায় ছয় মাসের বাজেট বরাদ্দ দেয়া হলে সেই প্রক্রিয়া স্থগিত রাখে রেলওয়ে। পাশাপাশি টিএলআর শ্রমিকের স্থায়ীকরণের আশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে শ্রমিকরা আন্দোলন থেকে সরে এসেছিলেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে রেলের নিম্ন গ্রেডের স্থায়ী কর্মীদের দিয়ে টিএলআরদের শূন্যতা পূরণের চেষ্টা করলেও সেটি রেলের বৃহৎ কার্যক্রমকে সুষ্ঠুভাবে প্রতিপালন করতে পারবে না বলে মনে করছেন খোদ রেলকর্মীরাও। 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রেলওয়ের আইন, নীতিমালা ও বিধিমালা অনুযায়ী অস্থায়ী কর্মীর পরিবর্তে আউটসোর্সিং পদ্ধতিতে বিশেষ বিশেষ পদে কর্মী নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। এক্ষেত্রে অনুসরণ করা হচ্ছে রেলের প্রণীত নতুন বিধিমালা। আউটসোর্সিংয়ের ক্ষেত্রে টিএলআর হিসেবে কর্মরত পুরনো ও দক্ষ কর্মীদের অগ্রাধিকার দেয়া হবে। আউটসোর্সিং পদ্ধতি চালু হলে টিএলআর কর্মীরাই লাভবান হবেন।’