প্রসাধনী থেকে বাতব্যথার ওষুধ তৈরিসহ নানা কাজেই ব্যবহূত হয় চন্দন কাঠ। প্রতি কেজি রক্তচন্দন কাঠ কালোবাজারে বিক্রি হয় সাড়ে ৫ থেকে ৬ হাজার টাকায়। কাঠ বহন মাদক ও অস্ত্রের মতো অবৈধ নয়। ফলে অনেকটা নির্বিঘ্নেই চলছে চন্দনের মতো নানা মহামূল্যবান কাঠের চোরাকারবার। কাঠ পাচার এখন কোটি টাকার বাণিজ্য।

বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) তথ্যমতে, গত এক বছরে দেশের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে পাচারের সময় জব্দ করা হয়েছে ২২ হাজার ৬১৯ ঘনফুট কাঠ। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি কাঠ জব্দ করা হয়েছে গত বছরের ডিসেম্বরে, ৫ হাজার ১৯৮ ঘনফুট। এ কাঠের মধ্যে রয়েছে রক্তচন্দন, শ্বেতচন্দন, সেগুন, শালসহ আরো কয়েকটি মূল্যবান প্রজাতি। এ ধরনের কাঠ সবচেয়ে বেশি পাচার হয় বেনাপোল ও উখিয়া সীমান্ত দিয়ে।

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা জানান, চোরাচালান প্রতিরোধে তাদের তীক্ষ নজরদারি থাকায় বিশেষ করে চন্দনের মতো মহামূল্যবান কাঠ খুব কম পরিমাণে বহন করা হয় এবং কাঠ বহন অবৈধ না হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে তাদের নজর এড়িয়ে যায়। তবে বন অধিদপ্তর থেকে তথ্য দেয়া হলে অভিযান পরিচালনা করা হয়।

র্যাবের অভিযানে গত বছরের ডিসেম্বরে আড়াই কোটি টাকার রক্তচন্দন কাঠের বড় একটি চালান ধরা পড়ে। ঢাকার টঙ্গীবাজার এলাকা দিয়ে পাচারের সময় ৩৮৪ কেজি রক্তচন্দন কাঠসহ দুই পাচারকারীকে আটক করে র্যাব।

সেই অভিযানের নেতৃত্ব দেন র্যাব-১-এর সহকারী পুলিশ সুপার মুশফিকুর রহমান তুষার। তিনি জানান, এ চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে নানা প্রজাতির মূল্যবান কাঠ চোরাচালান করে আসছিল। তাদের সঙ্গে আন্তর্জাতিক চক্রের যোগাযোগ রয়েছে। এ কাঠ তারা পার্শ্ববর্তী দুটি দেশের সীমান্ত দিয়ে চোরাচালান করে থাকে। কাঠ বহন অবৈধ না হওয়ায় এর চোরাচালানে ঝুঁকি কম, বিপরীতে বেশি অর্থ আয়ের সুযোগ রয়েছে বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে এ চক্রের সদস্যরা।

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য বলছে, কয়েকটি অংশে বিভক্ত হয়ে কাঠ চোরাকারবারিরা কাজ করে। এর মধ্যে একটি অংশ দেশের বিভিন্ন দুর্গম বনভূমি ঘুরে গাছ শনাক্ত করে। আরেকটি অংশ রাতারাতি ওইসব গাছ কেটে তক্তা বানিয়ে তেলবাহী লরি, কখনো ট্রাকের ইটের সারির নিচে চাপা দিয়ে দীর্ঘ পথ বহন করে।

বন অধিদপ্তরের ভাষ্যমতে, বর্তমানে দেশে বনভূমি রয়েছে ১৬ লাখ হেক্টর। বিশাল এ বনভূমি রক্ষায় নেই পর্যাপ্ত লোকবল। এ সুযোগটি কাজে লাগিয়ে মূল্যবান গাছ কেটে নিচ্ছে চোরাকারবারিরা। বর্তমানে সবচেয়ে বেশি চোরাই কাঠের কারবার হয়ে থাকে কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের দুর্গম এলাকায়। বিশেষ করে পাহাড়ি এলাকাগুলো থেকে প্রতিনিয়তই মহামূল্যবান বিভিন্ন ভেষজ উদ্ভিদ কেটে পাচার করে আন্তর্জাতিক চোরাকারবারি চক্রের সদস্যরা।

বনভূমিবেষ্টিত সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে গড়ে উঠেছে বেশকিছু চোরাই কাঠের বাজার। চোরাই কাঠের বাজারগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি কাঠ যায় উখিয়ার রুমখাঁ বাজারে। এককালের ঐতিহ্যবাহী এ হাট এখন চোরাই কাঠের বাজারে পরিণত হয়েছে। এ বাজারে দুটি অবৈধ করাতকলে প্রতিদিন চিরাই করা হচ্ছে হাজার ঘনফুট চোরাই কাঠ। দৈনিক এ হাট থেকে পাঁচ হাজার ঘনফুটেরও বেশি কাঠ কেনাবেচা হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে চুরি করে কেটে নেয়া গাছ নিয়ে যাওয়া হয় উখিয়ার এ বাজারটিসহ সীমান্তবর্তী অন্যান্য চোরাই কাঠের বাজারে। সেখানে চোরাকারবারিদের আরেকটি অংশ আগে থেকেই অবস্থান নেয়। তারা মূলত পার্শ্ববর্তী দেশের ক্রেতাদের সঙ্গে দরদাম ঠিক করে। পরে সুযোগ বুঝে কাঠগুলো পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে পাচার করা হয়।

প্রকাশ্যে এমন চোরাই কাঠের বাজার বসলেও কার্যত কোনো পদক্ষেপ নিতে পারছে না বন অধিদপ্তর। তাদের নিজস্ব লোকবল না থাকায় অভিযানের ক্ষেত্রে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর ভরসা করে থাকেন। নিজেদের সংকটের কথা জানিয়ে বন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলেন, দুই হাজার একর বনভূমির তত্ত্বাবধানে থাকেন মাত্র চার থেকে পাঁচজন কর্মী। সমতলভূমিতে স্টেশনভিত্তিক ডিউটি কার্যক্রম পরিচালনা করা গেলেও দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় তাদের থাকার জন্য নিরাপদ আশ্রয়স্থলের ব্যবস্থা নেই। ফলে প্রতিদিন বনরক্ষীদের ডিউটি শেষে ফিরে আসতে হয়। আর এ সুযোগটির জন্যই ওঁেপতে থাকে কাঠ পাচারকারীরা।

বন অধিদপ্তরের সহকারী প্রধান বন সংরক্ষণ মো. আরিফুল হক বেলাল বণিক বার্তাকে বলেন, বনভূমি রক্ষায় আমাদের নিয়মিত মনিটরিং ব্যবস্থা রয়েছে। গাছ কাটা হচ্ছে বা বনভূমি ধ্বংসের খবর পাওয়া মাত্রই আমরা তা উদ্ধারে কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে থাকি। তবে আমাদের বেশির ভাগ বনভূমিই দুর্গম এলাকাতে হওয়ায় সেখানে কেউ গাছ কেটে নিলে সেই খবর আমাদের পেতে একটু সময় লেগে যায়। তবে আমরা চেষ্টা করি পরবর্তী সময়ে ওই অপরাধীদের অনুসরণ করে গাছগুলো উদ্ধারের পাশাপাশি নতুন করে বনায়নের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের।

তিনি আরো বলেন, অনেকে বনের নিচু ভূমিতে চাষের জন্য অনুমতি নিয়ে ধীরে ধীরে উপরের দিকে গাছ কাটতে শুরু করে। এভাবে একটা সময় দেখা যায় বনের অনেকটাই উজাড় করে চাষাবাদ শুরু করে। এছাড়া প্রাকৃতিক নানা বিপর্যয়ের কারণে গৃহহীন হয়ে পড়া প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের প্রাথমিক আশ্রয়স্থল হিসেবে বেছে নেয়া হয় বনভূমি। তারাই দেখা যায় নিজেদের প্রয়োজনে ধীরে ধীরে বনের গাছ কেটে বনভূমি ধ্বংস করতে থাকেন। বনভূমি রক্ষায় কাঠের চাহিদা কমিয়ে আনার পাশাপাশি জনসাধারণের মধ্যে সচেতনতা তৈরির তাগিদও দেন এ কর্মকর্তা।