পাবনার ঈশ্বরদীতে দেশের সর্ববৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণকাজ এগিয়ে চলেছে দ্রুতগতিতে। এরই মধ্যে কেন্দ্রটির দ্বিতীয় ইউনিটে স্থাপন করা হয়েছে প্রকল্পের ‘হূিপণ্ড’ হিসেবে পরিচিত রিঅ্যাক্টর প্রেসার ভেসেল (পারমাণবিক চুল্লিপাত্র)। সেই সঙ্গে সম্পন্ন হয়েছে টারবাইন হলে জেনারেটর স্ট্যাটর স্থাপনের জটিল কাজটিও। কিন্তু গ্রিড সংযোগ ও সঞ্চালন লাইন নির্মাণে সময়ক্ষেপণের কারণে পিছিয়েছে প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি। সংসদীয় কমিটিতে গতকাল উপস্থাপন করা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা যায়।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের আওতায় পরমাণু শক্তি কমিশন। ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াটের দুটি ইউনিট নির্মাণ করছে রাশিয়ার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অ্যাটমস্ট্রয়এক্সপোর্ট। খরচ হচ্ছে প্রায় ১ লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকা। বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের কাজ করছে দেশের পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি লিমিটেড (পিজিসিবি)। সম্প্রতি গ্রিড সংযোগ এবং সঞ্চালন লাইনের বাস্তবায়ন অগ্রগতি জানতে চেয়েছিল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি। পরে এ নিয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়। সেখানে উল্লেখ করা হয়, সঞ্চালন অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পটি ২০১৮ সালের ১০ এপ্রিল জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) অনুমোদন পায়। ১০ হাজার ৯৮২ কোটি টাকার এ কাজ হচ্ছে ভারতের লাইন অব ক্রেডিট (এলওসি) চুক্তির আওতায়। এতে ৮ হাজার ২১৯ কোটি টাকা অর্থায়ন করছে ভারতের এক্সিম ব্যাংক। বাকি টাকা দিচ্ছে বাংলাদেশ সরকার ও পিজিসিবি। শুরুতে এ প্রকল্পের মেয়াদ ছিল ২০২২ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত। কিন্তু ভারত সরকারের ‘ইন প্রিন্সিপাল’ অনুমোদন পাওয়া যায় ২০১৯ সালের ২৬ মে। মূলত তখনই প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। এছাড়া এক্সিম ব্যাংক অব ইন্ডিয়া থেকে ক্রাইটেরিয়া চূড়ান্ত করে প্রি কোয়ালিফিকেশন আহ্বান করে ঠিকাদারের সংক্ষিপ্ত তালিকা দেয়া এবং বিড ডকুমেন্ট (দরপত্রের দলিলাদি) চূড়ান্ত করা—এসব কাজে প্রায় ২৪০ দিন সময়ক্ষেপণ হয়েছে। আর সে কারণেই পিছিয়েছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের গ্রিড সংযোগ ও সঞ্চালন লাইনের কাজ। তাই বিভিন্ন প্যাকেজের কাজ শেষ করতে প্রকল্প বাস্তবায়নের মেয়াদ ২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব জিয়াউল হাসান বণিক বার্তাকে বলেন, সংসদীয় কমিটিতে পিজিসিবি জানিয়েছে, প্রকল্পের রিভারক্রসিং সঞ্চালন লাইন নির্মাণের একটি অংশের কাজের অর্থায়নে কিছুটা জটিলতা দেখা দেয়। পরে সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে সে কাজ শুরু হয়। তবে এ বিলম্বের জন্য রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ সঞ্চালন প্রক্রিয়ায় কোনো বিলম্ব হবে না বলে জানিয়ে পিজিসিবি কর্মকর্তারা আমাদের আশ্বস্ত করেছেন।
সংসদীয় কমিটিতে দেয়া প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, সাতটি প্যাকেজে গ্রিড সংযোগ ও সঞ্চালন লাইন নির্মাণ প্রকল্পের কাজ চলছে। এর মধ্যে সবচেয়ে কম অগ্রগতি হয়েছে প্যাকেজ-৬-এ রিভারক্রসিং নির্মাণকাজে। কাজের অগ্রগতি এখন পর্যন্ত মাত্র ২ শতাংশ। এ প্যাকেজের আওতায় যমুনা ও পদ্মা নদীতে ৪০০ ও ২৩০ কেভির ১৬ কিলোমিটার সঞ্চালন লাইন নির্মাণ করা হবে। এর মধ্যে যমুনা নদীর ওপর ৭ কিলোমিটার ৪০০ কেভি এবং ৭ কিলোমিটার ২৩০ কেভি লাইন নির্মাণ করা হবে। আর পদ্মা নদীতে টানতে হবে ৪০০ কিলোমিটার ৪০০ কেভি লাইন।
এছাড়া প্যাকেজ-১-এর (লট-১) কেভি রূপপুর-বাঘাবাড়ী পর্যন্ত ৬৫ দশমিক ৩১ কিলোমিটার ডাবল সার্কিট সঞ্চালন লাইন নির্মাণকাজের অগ্রগতি হয়েছে শতভাগ। আমিনবাজার থেকে কালিয়াকৈর পর্যন্ত ৫১ কিলোমিটার ৪০০ কেভি ডাবল সার্কিট সঞ্চালন লাইন প্যাকেজ-১-এর (লট-২) নির্মাণকাজের অগ্রগতি হয়েছে প্রায় ৮২ শতাংশ। প্যাকেজ-২-এ রূপপুর থেকে ঢাকা (আমিনবাজার-কালিয়াকৈর) ১৪৭ কিলোমিটার ৪০০ কেভি ডাবল সার্কিট সঞ্চালন লাইন নির্মাণকাজ হয়েছে প্রায় ৪৬ শতাংশ। প্যাকেজ-৩-এ রূপপুর থেকে গোপালগঞ্জ পর্যন্ত ১৪৪ কিলোমিটার ৪০০ কেভি সিঙ্গেল সার্কিট সঞ্চালন লাইন নির্মাণকাজের অগ্রগতি ৫১ শতাংশ হয়েছে। রূপপুর থেকে ধামরাই পর্যন্ত প্যাকেজ-৪-এর আওতায় ১৪৫ কিলোমিটার ২৩০ কেভি ডাবল সার্কিট সঞ্চালন লাইন নির্মাণকাজ এগিয়েছে ৪১ শতাংশ। প্যাকেজ-৫-এ রূপপুর থেকে বগুড়া পর্যন্ত ১০২ কিলোমিটার ৪০০ কেভি সিঙ্গেল সার্কিট সঞ্চালন লাইন নির্মাণকাজের অগ্রগতি হয়েছে প্রায় ৫৯ শতাংশ। প্যাকেজ-৭-এ নয়টি বে এক্সটেনশন নির্মাণকাজের অগ্রগতি হয়েছে ২৪ দশমিক ৫০ শতাংশ।
কাজের ধীরগতি সম্পর্কে মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক করোনা মহামারী, ইন্স্যুরেন্স গ্রহণে বিলম্ব এবং সর্বশেষ রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে। এর মধ্যে যুদ্ধের কারণে রাশান ব্যাংকের জন্য ডলার বিনিময়ের সুইফট কোড বন্ধ থাকায় লেটার অব ক্রেডিটের (এলসি) মাধ্যমে কনসালট্যান্টের বিল পরিশোধ করা সম্ভব হয়নি। সেই কারণে কনসালট্যান্টরা প্রকল্প এলাকায় উপস্থিত থেকে চুক্তি অনুযায়ী সেবা দিতে পারছেন না। ফলে কাজটি বাস্তবায়নে বিলম্ব দেখা দিয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ে বিঘ্ন অথবা অন্য কোনো প্রতিকূল পরিস্থিতির উদ্ভব না হলে ইভ্যাকুয়েশনের জন্য নির্মিতব্য ওভার ল্যান্ড সঞ্চালন লাইন ও তত্সংশ্লিষ্ট উপকেন্দ্রের প্রয়োজনীয় কাজ আগামী আগস্ট নাগাদ সম্পন্ন হবে।
জানতে চাইলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বণিক বার্তাকে বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণকাজের সঙ্গে সমানতালে গ্রিড সংযোগ ও সঞ্চালন লাইনের কাজ এগিয়ে চলেনি। ফলে এ কাজে অগ্রগতি কিছুটা ধীর, যা পুরো প্রকল্পকাজেই প্রভাব ফেলেছে।










