রাজধানী উন্নয়ন কতৃপক্ষ (রাজউক) ১৯৬৩ সালে গেন্ডারিয়ায় ১৩ দশমিক ৫৭ একর সম্পত্তি অধিগ্রহণ করে। এর মধ্যে দুই একরের একটি পুকুরও ছিল। পুকুরটির বয়স বর্তমানে প্রায় ১০০ বছর। শতবর্ষী এ পুকুরটি স্থানীয়দের নানান কাজে ব্যবহৃত হতো। এলাকাবাসী খাওয়ার পানি সংগ্রহ থেকে শুরু করে ধোয়া মোছাসহ নানাকাজে পুকুরের পানি ব্যবহার করতেন। পুকুর থেকে মাছও ধরতেন স্থানীয়রা।
সেই পুকুরটিই ব্যক্তিমালিকানাধীন দাবি করে এখন ভরাট করে ফেলা হচ্ছে। চারপাশে তোলা হচ্ছে প্রাচীর,এরই মধ্যে তৈরি হয়েছে শতাধিক দোকান। দখল নিশ্চিত করতে পুকুর পাড়ের একটি অংশে নির্মিত দোতলা ভবন ব্যবহার করা হচ্ছে স্থানীয় কাউন্সিলরের কার্যালয় হিসেবে। দীর্ঘ সময় পেরোলেও এটির দখল উচ্ছেদ না করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা। তবে রাজউক কর্মকর্তারা বলছেন, পুকুরে অবৈধ দখল উচ্ছেদের বিষয়ে প্রস্তাব করা হয়েছে। আইনি বাধা না থাকলে শিগগির উচ্ছেদ অভিযান শুরু হবে।
ঢাকার ইতিহাস অনুযায়ী, একসময় ঢাকার গেন্ডারিয়া এলাকার বড় অংশই ছিল জলাভূমি। বুড়িগঙ্গা, ধোলাইখাল, ধোলাই নদী, যাত্রাবাড়ি খাল, কুতুবদিয়া খালের মত বড় নদী ও খালের মাঝে ছিল এলাকাটি। ব্রিটিশ আমলে গেন্ডারিয়া থেকে যাত্রাবাড়ি, সায়দাবাদ ও বাংলাবাজার এলাকায় যেতে হলে নৌকায় চলাচল করতেন এলাকাবাসী। ষাটের দশকের পর থেকে গেন্ডারিয়ার জলাভূমি ভরাট হতে থাকে। সংকুচিত হয়ে আসে পাশ্বর্তী এলাকার ধোলাইখাল, ধোলাই নদী ও কুবুতবিদয়া খাল। বিলিন হয়ে যায়, যাত্রাবাড়ি ও জুরাইনের অনেক খাল ও জলাশয়। রাজধানীর অন্যান্য এলাকার মত গেন্ডারিয়ায় বসতি বাড়তে থাকে।
স্থানীয়রা বলছেন, ২০০৪ সালেও রাজউকের পুকুরে গোসল করেছেন তারা। এরপর থেকেই মূলত পুকুরটি প্রভাবশালীদের দখলে চলে যেতে থাকে। স্থানীয়দের ব্যবহারের সুযোগ কমতে থাকে।
স্থানীয় বাসিন্দা কবির হোসেন জানান, দখলের শুরুতে পুকুরটিতে প্রচুর আবর্জনা ফেলা হয়। গৃহস্থালি থেকে শুরু করে সব ধরনের বর্জ্যে পুকুরটি ভরে ওঠে। তারপর স্থানীয় প্রভাবশালীরা পুকুরপাড়ে টং দোকান ও রিকশার গ্যারেজ নির্মাণ করেন। তখন পুকুরটির ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
পুকুরটি যথাযথ সংরক্ষণের বিষয়ে ১৯৯৬ সাল থেকে আন্দোলন করছেন স্থানীয় বাসিন্দা জুবায়ের আহমেদ। তিনি বলেন, নামে বেনামে রাজউকে অনেকবার চিঠি পাঠিয়েছি। বারবার বলেছি, পুকুরটি সংস্কার করে এলাকাবাসীর ব্যবহারপোযোগী করা হোক। পুকুরটি যদি রেলিং দিয়ে ঘিরে,ঘাট তৈরি করে দেয়া হতো, তাহলে স্থানীয়দের কাজে লাগত। বিনোদনের জায়গা হিসেবেও এর চারপাশ ব্যবহার করা যেত। কিন্তু সেসবের কিছুই করা হয়নি।
সরেজমিন দেখা যায়, গেন্ডারিয়া পুকুরের চারপাশ মার্কেট ও কংক্রিটের দোকানে ঘেরা। এমনভাবে দোকান তৈরি করা হয়েছে, রাস্তা থেকে বোঝার উপায় নেই যে দোকানের পেছনে পুকুর রয়েছে।
কয়েকজন দোকানীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এখানে অবস্থিত প্রায় দেড়শ থেকে দুইশ দোকানের ভাড়া তোলেন বর্তমান কাউন্সিলরের বাবা ও সাবেক কাউন্সিলর শহিদুল ইসলাম।
স্থানীয়রা মনে করেন, পুকুরের পাড় দখল করে দোকান তৈরি করা হলেও এখনো পুকুরের বড় অংশই দৃশ্যমান। ধীরে ধীরে ভেতরের অংশ দখলে নেওয়ার পরিকল্পনা থেকেই চারপাশে মার্কেটের প্রাচীর দেয়া হয়েছে। এ ছাড়াও পুকুর দখল নিশ্চিত করতে একাংশে দোতলা ভবনে কার্যালয় স্থাপন করেছেন স্থানীয় কাউন্সিলর।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৪৭ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর সাহানা আক্তার বণিক বার্তাকে বলেন, রাজউক জায়গাটি অধিগ্রহণ করেছে সত্য, পরবর্তীতে এটি আবার ব্যক্তি মালিকানায় চলে আসে। জাকির হোসেন নামে স্থানীয় একজন পুকুরটির প্রকৃত মালিক। কাউন্সিলর কার্যালয়টি তার কাছ থেকে ভাড়া নেয়া হয়েছে।
পুকুরটি যে ব্যক্তিমালিকানাধীন, তা প্রতিষ্ঠার জন্য এর পাশে উত্তরাধিকারের দাবি সম্বলিত একটি সাইনবোর্ডও টানানো হয়েছে। যেখানে লেখা আছে, পুকুরটির মালিক জাকির হোসেন।
তবে রাজউকের সম্পত্তি বিভাগ নিশ্চিত করে বলেছে যে, পুকুরটি রাজউকেরই। এটি দখলে নেয়ার জন্য প্রভাবশালীরা ভুয়া কাগজপত্র দিয়ে একটি মামলা করে। সে মামলা এখনো চলছে। তবে গেজেটভুক্ত সম্পত্তি হওয়ায় পুকুরটি দখলে নিতে পারছে না দখলদাররা।
রাজউকের সম্পত্তি বিভাগ থেকে জানানো হয়, গত দুই বছরে দুবার পুকুরটির দখল উচ্ছেদের বিষয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ-২ বিভাগে। গত জুন মাসে দখলের ছবিসহ উচ্ছেদ প্রস্তাব দেয়ার পরও অবৈধ দখল উচ্ছেদ হয়নি। এক্ষেত্রে রাজউকের সদিচ্ছার অভাব রয়েছে বলে মনে করেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা। তিনি বলেন, সদিচ্ছা থাকলে এক ঘণ্টায় উচ্ছেদ করে পুকুরটি রাজউকের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা সম্ভব।
রাজউকের মালিকানার পুকুর কীভাবে ব্যক্তি মালিকানা দাবি করছেন তা জানতে চাইলে কথিত মালিক জাকির হোসেন বলেন, ওয়ারিশ সূত্রে পুকুরটির মালিক আমি। পুকুরটি নিয়ে উচ্চ আদালতে রিট করি। রিট আমার পক্ষে আসে। এরপর রাজউক আপিল করে। সেখানেও রায় আমার পক্ষে আসে। এরপর আবার রাজউক রিভিউ করে। সে রায়ও আমার পক্ষে আসে। তাই আমি এখন পুকুরটির মালিকানা দাবি করছি।
পুকুর পাড়ে মার্কেট ও কাউন্সিলর কার্যালয় প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এগুলোর মালিক আমি। তবে আমি যেহেতু দেশে থাকি না, তাই বর্তমান কাউন্সিলরের বাবা শহিদ ভাইকে দেখাশোনা করার দায়িত্ব দিয়েছি। তিনিই দেখাশোনা করছেন।
তবে তার দাবি নাকচ করে দিয়েছেন রাজউকের আইন শাখার কর্মকর্তারা। তারা বলছেন,পুকুরটি রাজউকের। স্থানীয় প্রভাবশালীরা ভুয়া কাগজপত্র দিয়ে একটি মামলা করেছে। মামলাটি এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। ফলে এটি কারো ব্যক্তিমালিকানাধীন তা বলার সুযোগ নেই।
রাজউকের চেয়ারম্যান মো. আনিছুর রহমান মিঞা বণিক বার্তাকে বলেন, রাজউকের কিছু সম্পদ বেদখল আছে। আমরা অভিযান চালিয়ে উদ্ধারও করছি। গেন্ডারিয়ার ডিআইটি প্লটের বিষয়ে আমি খোঁজখবর নিয়েছি। প্রাথমিকভাবে সেখানে দখলের প্রমাণও পেয়েছি। আইনি কোনো বাধা না থাকলে শিগগির উচ্ছেদে যাবো।










