হেমন্তে টানা বৃষ্টি হবে—উত্তরাঞ্চলের মানুষ প্রকৃতির এমন বিরূপ আচরণের সঙ্গে পরিচিত না হলেও এবার তা-ই হয়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের পাঁচটি উপজেলায় গত ২৪ ঘণ্টায় ৯৫৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। যা জেলায় গড় বৃষ্টিপাতের (১৯১ মিলিমিটার) প্রায় পাঁচ গুণ। এক দশকে একদিনে এত বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়নি। শুক্রবার রাতভর বৃষ্টিতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে জনজীবন। জেলার বিভিন্ন এলাকায় সৃষ্টি হয়েছে জলাবদ্ধতা। তলিয়ে গেছে নিম্নাঞ্চলের আমন ধান, সরিষা ও শীতকালীন সবজির জমি।

কৃষকরা বলছেন, এক সপ্তাহ পরই ধান কাটা শুরু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে এসে টানা বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে খেত। নিম্নাঞ্চলের প্রায় সব জমিই এখন ডুবে আছে। আগে যেখানে বিঘাপ্রতি ২০ মণ ধান পাওয়ার আশা ছিল, সেখানে এখন পাঁচ মণের বেশি পাওয়ার সম্ভাবনা নেই।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. ইয়াছিন আলী বলেন, ‘গত ১০ বছরে একদিনে এত বৃষ্টির রেকর্ড নেই চাঁপাইনবাবগঞ্জে। এ বৃষ্টিতে জেলার প্রায় সাড়ে চার হাজার হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।’

এদিকে টানা বৃষ্টিতে শহরে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ও বাসভবন, পুলিশ সুপারের বাসভবন, নিউ মার্কেট, বড় ইন্দারামোড়, স্কুল-ক্লাব রোডসহ শহরের অধিকাংশ সড়কে হাঁটুপানি জমে গেছে। অনেক বাড়িঘরেও পানি ঢুকে পড়েছে।

শহরের বিদিরপুর এলাকার নাসরিন আখতার বলেন, ‘দুই-তিন দিন ধরেই বৃষ্টি হচ্ছে। আমরা ভাবতেই পারিনি এমন পরিস্থিতি হবে। ফসলের খেত, ঘরবাড়িতে পানি ঢুকে পড়েছে। আমার বাড়ির ভেতরেও হাঁটুসমান পানি। মাঠের ফসল শেষ। এখন ধান পাব কিনা, সেটা নিয়ে সংশয় রয়েছে।’

আবহাওয়া অফিস বলছে, শুক্রবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে শুরু হওয়া বৃষ্টি চলে ভোর পর্যন্ত। কখনো মাঝারি, কখনো হালকা বৃষ্টিতে শহর ও গ্রামে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে।

বৃষ্টিতে মাঠে থাকা আমন ধান পানিতে নিমজ্জিত হয়ে পড়েছে। কৃষকরা বলছেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর, শিবগঞ্জ, গোমস্তাপুর, নাচোল ও ভোলাহাট উপজেলার নিম্নাঞ্চলের শত শত বিঘা জমি এখন পানির নিচে। কোথাও কোথাও পানির উচ্চতা এক ফুটেরও বেশি। মাঠে থাকা ধানের শীষ পানির নিচে ডুবে থাকায় গাছে পচন ধরার আশঙ্কা রয়েছে।

কৃষক আমানুল্লাহ বলেন, ‘আমার দুই বিঘা জমির ধান পুরোপুরি পেকে গিয়েছিল। এক সপ্তাহ পর কাটার কথা ছিল, কিন্তু সব এখন পানির নিচে। ধানের জমি চেনাই যাচ্ছে না। হয়তো পাঁচ মণ ধান পেতে পারি। কিন্তু অনেকের খেতেই কিছুই থাকবে না। এক বিঘা জমিতে ৫-৭ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। সেটাও উঠবে না।’

কৃষক আব্দুল্লাহ আক্ষেপ করে বলেন, ‘যে ধানগুলো ডুবে গেছে, সেগুলো পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যাবে। খরচও হয়েছে, ধানও নষ্ট হলো, এখন কিছুই পাওয়া যাবে না।’

আরেক কৃষক আলমগীর হোসেন বলেন, ‘দুদিনের বৃষ্টিতে আমার চার বিঘা জমি তলিয়ে গেছে। এর মধ্যে দুই বিঘা ঋণ করে চাষ করেছি। এখন পর্যন্ত কোনো কৃষি কর্মকর্তা আসেননি।’