দীর্ঘ পাঁচ দশক পর স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দিয়েছেন চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়নের নারীরা। জৈনপুরের পীর আল্লামা মুফতি ড. সাইয়্যেদ মুহাম্মাদ এনায়েতুল্লাহ আব্বাসী ওয়া সিদ্দিকীর অনুরোধে তারা নাগরিক এ অধিকার থেকে নিজেদের বিরত রেখেছিলেন।
আয়েশা বেগমের বয়স ৭০ বছর। এসেছেন ভোট দিতে। তিনি বলেন, ‘এই প্রথম ভোট দিতে এসেছি। খুবই ভালো লাগছে।’ এত বছর কেন ভোট দেননি জানতে চাইলে আয়েশা বেগম বলেন, ‘নিষেধ ছিল। স্থানীয় লোকজন আমাদের বোঝানোর পর ভোট দিতে এসেছি।’
রূপসা ইউনিয়নের বাসিন্দা নূরজাহান বেগম জানান, তার বিয়ে হয়েছে ৪৫ বছর। এই সময়ে তিনি কোনো ভোট দেননি। তাহলে এখন কেন ভোট দিতে এসেছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সবাই বলছে, তোমরা নারীরা বাজারে যাও, চাকরি করো, সবকিছুই করো, তাহলে ভোট দিতে পারবা না কেন? ইসলামের দৃষ্টিতে ভোট দেয়া হারাম নয়। তাহলে ভোট দিতে সমস্যা কোথায়? এখন আমাদের মধ্যেই উপলব্ধি এসেছে, এত দিন ভোট না দিয়ে আসলে ভুল করেছি।’
ইউনিয়নের গৃদকালিন্দিয়া উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে নারী ভোটারদের উপচে পড়া ভিড় ছিল।
ওই কেন্দ্রের প্রিসাইডিং কর্মকর্তা একেএম লোকমান হাকিম বলেন, ‘এ কেন্দ্রে মোট ভোটার ৩ হাজার ৬০৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১ হাজার ৮১১ ও নারী ১ হাজার ৭৯২। সকাল সাড়ে ৯টা পর্যন্ত কেন্দ্রে ভোট পড়ে ৪০১ জনের। এর মধ্যে নারী ভোটার ১৫৯ জন।’
এই ইউনিয়নে মোট ভোটার ২১ হাজার ৬৯৫ জন। এর মধ্যে নারী ভোটার প্রায় ১০ হাজার ২৯৯ জন। তাদের অংশগ্রহণ এবারের নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ভোট দিতে আসা জরিনা বলেন, হুজুরের নিষেধ ছিল। তবে ভোট দিতে এসে ভালো লাগল। ভবিষ্যতেও ভোট দেব। এবার জীবনের প্রথম ভোট দিলাম।’
দীর্ঘ পাঁচ দশক পর নারী ভোটারদের কেন্দ্রে আনতে সক্ষম হয়েছে প্রশাসন। এখানে আট কেন্দ্রে নারী কর্মকর্তা ও ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগসহ নেয়া হয়েছিল বিশেষ ব্যবস্থা।
রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান হুমায়ুন কবির বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এবারের নির্বাচনে এ ইউনিয়নে নারী ভোটারদের উপস্থিতি লক্ষণীয় ছিল। প্রায় ৩০ শতাংশের বেশি নারী ভোট দিয়েছে। এটা প্রশাসনের দূরদর্শিতা ও উদ্যোগের কারণেই হয়েছে।’
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ১৯৭০ সালে জৈনপুরের পীর আল্লামা মুফতি ড. সাইয়্যেদ মুহাম্মাদ এনায়েতুল্লাহ আব্বাসী ওয়া সিদ্দিকীর অনুরোধ মেনে রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়নের নারীরা ভোট দিতে যান না। মাঝে মধ্যে স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থীদের কাছের আত্মীয়রা ভোট দিলেও সে সংখ্যা ছিল নামমাত্র।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. নাজমুল ইসলাম সরকার নারীদের পর্দা নিশ্চিত করে ভোট দেয়ার জন্য উদ্যোগ নেন। সেই উদ্যোগের অংশ হিসেবে রূপসা দক্ষিণের ইউনিয়নের আটটি কেন্দ্রের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেয়া হয়।
ফরিদগঞ্জ সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ইউনিয়নের আটটি কেন্দ্রে নারী ভোটারদের জন্য ২০টি বুথ তৈরি করা হয়। বুথগুলোর জন্য সহকারী প্রিজাইডিং কর্মকর্তা থেকে শুরু করে সব পর্যায়ের ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা হিসেবে নারীদের নিয়োগ করা হয়। এছাড়া আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য পুলিশ, আনসার ভিডিপি এবং আটটি কেন্দ্রের জন্য একজন নারী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করা হয়। আটজন প্রার্থীকে ওই বুথগুলোতে নারী পোলিং এজেন্ট নিয়োগ দেয়ার জন্য চিঠি ও মৌখিকভাবে অনুরোধও করা হয়।
চাঁদপুর জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা নাজমুল ইসলাম সরকার বলেন, ‘ইসলামের দৃষ্টিতে নারীদের ভোট দেয়া কোনো অপরাধ নয়। ৫৪ বছর আগে স্থানীয় পর্যায়ে সাময়িক নির্দেশনাকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করে নারীদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত রাখা হয়েছে, যা বর্তমান সময়ে গ্রহণযোগ্য নয়।’










