কারো আবার সব মনোযোগ ইনস্ট্রাক্টরের নির্দেশনায়। ঠিক সেই সময় আচমকা বেজে ওঠে ফায়ার অ্যালার্ম। ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে গাড়িতে উঠে ৪০ সেকেন্ডের মধ্যে যাত্রা। ১ ঘণ্টার পথ মাড়িয়ে ৭২ ঘণ্টার চেষ্টায় শতাধিক মানুষের জীবন রক্ষা।

চার বছর আগে রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর ফায়ার ফাইটারদের এ ছুটে চলার সময় নাজির হোসেন ছিলেন অনেকটা নবীন কর্মী। আর এখন অনেক বেশি পরিণত। দক্ষতাও বেড়েছে। এখনো তিনি ছুটছেন, তবে আরো বেশি দক্ষতা নিয়ে। নাজির হোসেনের ভাষ্য, ‘শুধু বেতনের জন্য নয়, দুর্ঘটনার খবর পেলে ছুটে যাই কর্তব্যের ডাকে।’

কর্তব্য পালন করতে গিয়ে নিজের জীবন ঝুঁকিতে ফেলার ঘটনাও কম নয় সংস্থাটিতে। গত ১০ বছরে উদ্ধারকাজের সময় প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত আটজন ফায়ার ফাইটার। এর মধ্যে ২০০৬ সালে মারা যান একজন ও ২০০৮ সালে চারজন। ২০০৯ ও ২০১৩ সালেও একজন করে ফায়ার ফাইটার প্রাণ হারিয়েছেন।

তবে আহতের সংখ্যাটা বেশ বড়। এদের কেউ কেউ আবার কর্মক্ষমতাও হারাচ্ছেন। ১০ ডিসেম্বর নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় একটি ব্যাংকে আগুন নেভাতে গিয়ে গুরুতর আহত হন ফাইয়ার ফাইটার আমিনুল ইসলাম। তিনতলার আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য ঘটনাস্থলের পাশে থাকা একটি ল্যাডারে ওঠেন আমিনুল। সেখান থেকে একাই পাইপ ধরে পানি দিতে থাকেন। এভাবে কয়েক মিনিট পানি দেয়ার পর ল্যাডার থেকে পড়ে যান। সংজ্ঞাহীন অবস্থায় দ্রুত তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নেয়া হয়। চিকিত্সা শেষে আমিনুল নেত্রকোনায় গ্রামের বাড়ি ফিরলেও পুরোপুরি কর্মক্ষম হননি।

বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, দুর্ঘটনার খবর শুনলে বসে থাকতে পারি না। আগুনের খবর শোনার পর গিয়ে দেখি ভবনের ওপরে অনেকগুলো মানুষ আটকা পড়েছে। তারা চিত্কার করে বাঁচতে চাইছে। পরে নিজের কথা না ভেবে ল্যাডারে উঠে যাই। তবে পানির পাইপটা একা না ধরলে এ দুর্ঘটনা ঘটত না।

যদিও গত তিন বছরে অগ্নিদুর্ঘটনা মোকাবেলা করতে গিয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের হতাহতের ঘটনা অনেক কমেছে। দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমেই এটা সম্ভব হয়েছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। সেই সঙ্গে বেড়েছে আধুনিক সরঞ্জাম ব্যবহারও। ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) মেজর একেএম শাকিল নেওয়াজ বলেন, অগ্নিদুর্ঘটনা মোকাবেলায় সবার আগে প্রয়োজন দমকলকর্মীর দক্ষতা। এ দক্ষতা তৈরিতে গত তিন বছরে অনেক প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়েছে। এসব প্রশিক্ষণে অংশ নিয়েছেন প্রায় আড়াই লাখ প্রশিক্ষণার্থী।

দেশের পাশাপাশি বিদেশে প্রশিক্ষণের সুযোগও পাচ্ছেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। বছর দুই আগে মালয়েশিয়ায় এ ধরনের একটি প্রশিক্ষণ গ্রহণের সুযোগ পেয়েছিলেন নাজির হোসেন। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে অর্জিত এ দক্ষতা কাজে দিয়েছিল বসুন্ধরা শপিং সেন্টারের অগ্নিনির্বাপণে। নাজির হোসেন বলেন, ‘প্রশিক্ষণলব্ধ দক্ষতা ব্যবহার করে হাইড্রোলিক কাটারের সাহায্যে ভবনের অ্যাঙ্গেল কেটে ভেতরে প্রবেশ করি। থার্মাল ইমেজিং ক্যামেরার সাহায্যে ভেতরের আগুন সম্পর্কে ধারণা নিই। এর পরই মূল অগ্নিনির্বাপণ প্রক্রিয়ায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনি। উন্নত প্রশিক্ষণ ও আধুনিক সরঞ্জামের ব্যবহার না করলে বসুন্ধরা সিটির ওই অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতির পরিমাণ আরো বাড়ত।’

দক্ষতার উন্নয়ন হলেও জনবল ঘাটতি এখনো রয়ে গেছে ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরে। জনবলস্বল্পতার কারণে বিশ্রামের সুযোগ সেভাবে পাচ্ছেন না ফায়ার ফাইটাররা। বিভাগীয় শহরে ৪৮ ঘণ্টা ডিউটির পর ২৪ ঘণ্টার বিশ্রাম পান তারা। আর জেলা শহরের ফায়ার স্টেশনগুলোয় ৭২ ঘণ্টা ডিউটি শেষে ২৪ ঘণ্টা বিশ্রাম দেয়া হয় ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের।

জনবলস্বল্পতার বিষয়ে ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী আহাম্মেদ খান বণিক বার্তাকে বলেন, ১৬ কোটি মানুষের দেশে ফায়ার ফাইটার রয়েছেন মাত্র আট হাজার। প্রয়োজনের তুলনায় সংখ্যাটা সামান্যই। এ সংখ্যা দ্বিগুণ করা হলে ফায়ার সার্ভিসের কাছ থেকে আরো বেশি সেবা পাওয়া যাবে। তার পরও দুর্ঘটনা মোকাবেলায় সর্বোচ্চ ঝুঁকি নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা।

জনবলের ঘাটতি থাকলেও আধুনিক সরঞ্জাম ও দক্ষতার যে উন্নতি, তা নিয়ে বেশ সন্তুষ্ট ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক। তার ভাষায়, সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ফায়ার ফাইটারদের দক্ষতা বাড়ানো হয়েছে; দেয়া হয়েছে আধুনিক সরঞ্জাম। পাশাপাশি এসব আধুনিক সরঞ্জাম পরিচালনার জন্য প্রতিনিয়তই সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রশিক্ষণে পাঠানো হচ্ছে। এসব প্রশিক্ষণ ও আধুনিক সরঞ্জাম ব্যবহারের ফলে ইমার্জেন্সি রেসপন্স বেড়েছে।

আধুনিক সরঞ্জাম ব্যবহার ও দক্ষতা বৃদ্ধির কারণে অগ্নিদুর্ঘটনায় হতাহতের ঘটনা অনেকটা কমেছে। ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৪ সালে ১৭ হাজার ৮৩০টি অগ্নিদুর্ঘটনায় প্রাণ হারান ৭০ জন। পরের বছরও অগ্নিকাণ্ড ঘটে প্রায় সাড়ে ১৭ হাজার। তবে প্রাণহানি কমে আসে ৬৮টিতে। ২০১৬ সালে প্রায় ১৭ হাজার অগ্নিদুর্ঘটনায় প্রাণ হারান ৫২ জন। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এ সময়ে অগ্নিদুর্ঘটনা মোকাবেলা করতে গিয়ে ফায়ার সার্ভিসের কেউ প্রাণ হারাননি।