দেশের অত্যাধুনিক আইকনিক কক্সবাজার রেলওয়ে স্টেশন। দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পের অধীনে স্টেশনটি নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ২১৫ কোটি টাকা। উদ্বোধনের পর স্টেশনটির একাধিক নির্মাণ ত্রুটি দেখা দেয়। দেড় বছর পর এখন ট্রেনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে সংকটে পড়েছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। মূলত ডাম্পিং সুবিধা না থাকায় ট্রেন থেকে আসা বর্জ্য রাখা হয় স্টেশনেই। প্রতি সপ্তাহে পোড়ানো হয় ওয়াশপিট ও ডকইয়ার্ডের পাশে। এতে স্টেশনসহ আশপাশের পরিবেশে বিরূপ প্রভাব পড়ছে।
কক্সবাজার আইকনিক রেলওয়ে স্টেশনগামী চারটি ট্রেন প্রতিদিন (সাপ্তাহিক বন্ধ ব্যতীত) যাত্রী পরিবহন করে। ঢাকা থেকে প্রতিদিন দুই জোড়া ও চট্টগ্রাম থেকে দুই জোড়া আন্তঃনগর ট্রেন থেকে গড়ে ২০ বস্তা বর্জ্য হয়। এসব বর্জ্য মজুদ ও সরিয়ে রাখার কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। বাধ্য হয়ে ট্রেন অপারেশনের কর্মী ও টিএলআর (অস্থায়ী রেলওয়ে কর্মী) কর্মীদের সহযোগিতায় ওয়াশপিট এলাকার ডকইয়ার্ডে রাখা হয় বর্জ্য। এরপর সপ্তাহে অন্তত একবার করে সেগুলো পুড়িয়ে ফেলা হয়। পোড়ানোর সময় স্টেশন সংলগ্ন এলাকায় কালো ধোঁয়ায় পরিবেশ দূষণ হচ্ছে। স্টেশন এলাকায় বর্জ্য রাখার সুনির্দিষ্ট ও স্বাস্থ্যসম্মত ব্যবস্থা না থাকায় পরিবেশ দূষণ করেই বর্জ্য রাখা ও পোড়ানো হয় বলে দাবি করেছেন স্টেশন সংশ্লিষ্ট রেলকর্মীরা।
নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে কক্সবাজার স্টেশনের একজন রেলকর্মী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কয়েকশ কোটি টাকা ব্যয়ে আইকনিক রেলস্টেশন নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু এ ধরনের আধুনিক স্টেশনে বর্জ্য রাখা ও ব্যবস্থাপনার কোনো সুযোগ রাখা হয়নি। দেশের প্রধান স্টেশনগুলোতে বর্জ্য রাখার ব্যবস্থা রয়েছে। পৌর কর্তৃপক্ষ কিংবা সিটি করপোরেশনের মাধ্যমে অন্য স্টেশনগুলোর বর্জ্য উন্মুক্ত ল্যান্ডফিল্ডে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু কক্সবাজারের মতো একটি পর্যটন নগরীতে স্টেশন এলাকায় ট্রেনের বর্জ্য পোড়ানো স্বাস্থ্যসম্মত নয়।’
দেশের বৃহৎ ও দৃষ্টিনন্দন আইকনিক রেলস্টেশনটি দেখতে অনেকটা ঝিনুকের আদলে। ২৯ একর জমির ওপর ২১৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত স্টেশনটি এশিয়ার সর্ববৃহৎ ও দৃষ্টিনন্দন হিসেবে নির্মাণ করা হয়েছে দেশী-বিদেশী পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে। বিগত বছর বর্ষায় স্টেশনের ওপরের ছাদ থেকে বৃষ্টির পানি চুইয়ে পড়ার ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া স্টেশন এলাকার প্লাটফর্মের ছাদ থেকে আসা পানি স্টেশনের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেছে। বিষয়টি জানাজানি হলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ দ্রুত স্টেশনে পানি প্রবেশের উৎসমুখ সংস্কার করে।
রেল সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রেলওয়ের অধিকাংশ সর্বশেষ গন্তব্যস্থল বা বিভাগীয় স্টেশনগুলো সিটি করপোরেশন এলাকায়। ফলে স্থানীয়ভাবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য রেলওয়েকে তেমন একটা বেগ পেতে হয় না। রেলকর্মীরা ট্রেন থেকে বর্জ্য সরিয়ে স্টেশনে রাখলে করপোরেশনের গাড়ি এসে সেসব বর্জ্য নিয়ে যায়। কিন্তু কক্সবাজার সিটি করপোরেশন না হওয়ায় সেখানকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা তুলনামূলক কঠিন। বিশেষ করে খুরুশকুল এলাকায় কক্সবাজারের একমাত্র ল্যান্ডফিল্ড থাকলেও সেটি স্টেশন থেকে দূরে। স্টেশনটি পৌর এলাকায় না হওয়ায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য রেলওয়েকে স্থানীয় পৌরসভার সঙ্গে চুক্তি কিংবা আলোচনায় যেতে হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। যদিও উদ্বোধনের প্রায় দেড় বছরেও রেলওয়ের পক্ষ থেকে পৌর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা কিংবা প্রস্তাব দেয়া হয়নি।
জানতে চাইলে কক্সবাজার পৌরসভার প্রশাসক রুবাইয়া আফরোজ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কক্সবাজার আইকনিক রেলওয়ে স্টেশন পৌরসভার বাইরে। ফলে পৌরসভার পক্ষ থেকে রেলওয়ে স্টেশনের বর্জ্য ডাম্পিং স্টেশনে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। তাছাড়া রেলের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগও করা হয়নি। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ চাইলে স্টেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আলোচনা করে একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হবে।’
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে দোহাজারী-কক্সবাজার রেলওয়ে প্রকল্পের সাবেক প্রকল্প পরিচালক ও রেলওয়ের (পূর্বাঞ্চল) মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সুবক্তগীন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কক্সবাজার সিটি করপোরেশন নয়। ফলে স্টেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা অনেক কঠিন হয়ে পড়েছে। বিষয়টি আমাদের নজরে আসার পর এ বিষয়ে করণীয় নির্ধারণের চেষ্টা করা হচ্ছে। প্রয়োজনে অবকাঠামোগত উন্নয়ন করে বর্জ্য রাখার ব্যবস্থা করা হবে।’
স্টেশনের অভ্যন্তরে ডাম্পিং সুবিধা না রাখা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘প্রকল্পের নকশায় না থাকায় বর্জ্য রাখতে কোনো অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়নি। ট্রেন থেকে আসা ও স্টেশনের বর্জ্য রাখার পাশাপাশি বর্জ্য ফেলতে স্থানীয় সরকারি সংস্থাগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। প্রয়োজনে পৌরসভার সঙ্গে আলোচনা করে রেলস্টেশন থেকে বর্জ্য অপসারণে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হবে। প্রতিদিনের বর্জ্য প্রতিদিন সরিয়ে নেয়া হলে অবকাঠামো নির্মাণের প্রয়োজন হবে না। এরপরও স্টেশন কর্মীদের সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত সংকট সমাধানে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’










