সিলেটের খাদিম বিসিক শিল্পনগরীতে আড়াই বছরে ছয়টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গিয়েছে। দীর্ঘদিন থেকে মামলাজনিত কারণে বন্ধ রয়েছে অন্য শিল্পনগরী গোটাটিকর বিসিকের আরো ছয়টি শিল্প ইউনিট। খাদিম বিসিকে সর্বশেষ চলতি বছরের জুন থেকে উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে টায়ার রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান সানটেক টায়ার লিমিটেড। বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্প ইউনিটের মধ্যে চারটি কেমিক্যাল ও একটি টেক্সটাইল এবং একটি খাদ্য ও খাদ্যজাত ইউনিট রয়েছে। কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, পরিবহন খরচ বৃদ্ধি, করোনা ভাইরাস ও সর্বশেষ রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে কাঁচামালের দুষ্প্রাপ্যতা ও অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে শিল্প ইউনিটগুলো বন্ধ হয়ে যায় বলে উল্লেখ করা হয়।
অন্যদিকে দেশের প্রাচীনতম সিলেটের অন্য শিল্পনগরী গোটাটিকর বিসিক ধুঁকছে নানা সমস্যায়। অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে জলাবদ্ধতা ও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ বিরাজ করছে বিসিকের অভ্যন্তরে।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গিয়েছে, খাদিমনগরে বিসিক শিল্পনগরীর যাত্রা হয় ১৯৯৬ সালে। এটি সিলেটের দ্বিতীয় শিল্পনগরী। এখানে ৭৪টি শিল্প ইউনিটের মধ্যে ৬৫টি পুরোদমে চালু রয়েছে। বাকি নয়টির মধ্যে ছয়টি বন্ধ রয়েছে ও তিনটিতে চলছে অবকাঠামো নির্মাণ। এসব শিল্প-কারখানায় মোট বিনিয়োগ ১৬০ কোটি টাকা। বার্ষিক উৎপাদন হচ্ছে ৩৯২ কোটি টাকা। ৫ হাজার ৭৩০ জন মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে খাদিমনগর বিসিকের বিভিন্ন শিল্প-কারখানায়।
এদিকে ২০২০ সাল থেকে খাদিম শিল্পনগরীতে ছয়টি প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গিয়েছে। এর মধ্যে ২০২০ সালের ১৫ মে থেকে মেসার্স ইসলাম টেক্সটাইল মিল বন্ধ রয়েছে। কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, লোকসান, পরিবহন ব্যয় ও জ্বালানি ব্যয় বাড়ায় বন্ধ করে দেয়া হয় প্রতিষ্ঠানটি। প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মালিকানা হস্তান্তর করে দিতে চান।
একই বছরের ২০ ডিসেম্বর বন্ধ হয়ে যায় মেসার্স নোভা কেমিক্যাল নামের আরেকটি শিল্প-কারখানা। একই কারণ দেখিয়ে মালিক আব্দুল লতিফ
খাদ্য ও খাদ্যজাত প্রতিষ্ঠান দুধওয়ালার কাছে মালিকানা হস্তান্তর করে দিয়েছেন। ২০২০ সালের ১৭ ডিসেম্বর মেসার্স ছিদ্দিকী চারকোল বন্ধ হয়ে যায়। এ শিল্প ইউনিটটি হস্তান্তরিত হয়েছে পিউরিয়ার কাছে। শিগগিরই তাদের কার্যক্রম চালুর কথা। মেসার্স রয়েল ফুড ইন্ডাস্ট্রিজ বন্ধ হয়ে যায় একই বছরের ৮ ডিসেম্বর। এ প্রতিষ্ঠানটি চালুর কোনো সম্ভাবনা নেই। আগামী এলএসি মিটিংয়ে করণীয় ঠিক করবে বিসিক কর্তৃপক্ষ।
সর্বশেষ খাদিম শিল্পনগরীর রফতানিকারক বড় একটি প্রতিষ্ঠান সানটেক টায়ার লিমিটেড উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে। দুটি শিল্প ইউনিট নিয়ে গঠিত সানটেকে টায়ারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক একেএম নুরুল হক বন্ধ হয়ে যাওয়ার জন্য করোনা ভাইরাস ও যুদ্ধের কারণে কাঁচামালের দুষ্প্রাপ্যতা এবং অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তারা নতুন করে চালুর জন্য বিসিকের কাছে দুই মাস সময় চেয়েছেন।
এছাড়া এ শিল্পনগরীর তিনটি রুগ্ণ শিল্প ইউনিটকে সচল করার উদ্যোগ নিয়েছে বিসিক। যার মধ্যে হিমায়িত মাছ ও সবজি রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান ইউরোক্রস ফ্রোজেন ফুডস লিমিটেড একটি। ২০১৫ সালে প্লট পেলেও এর নির্মাণ কাজ মাত্র ১৫ শতাংশ হয়েছে। বারবার তাগিদ দিয়েও কাজ শেষ করতে পারছে না উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান।
অন্যদিকে ১৯৬৪ সালে কাজ শুরু হলেও স্বাধীনতা-পরবর্তী ১৯৭৮ সালে গোটাটিকর বিসিকের যাত্রা শুরু। ৭২টি শিল্প ইউনিটের মধ্যে বর্তমানে এ বিসিকে ৬৬টি কারখানা উৎপাদনে রয়েছে। এর মধ্যে ৩৮টিই মিষ্টি ও খাদ্যজাত পণ্য উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত।
গোটাটিকর বিসিকের শিল্প কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্র জানায়, মামলাজনিত কারণে দীর্ঘদিন থেকে বন্ধ রয়েছে ছয়টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে বেগম প্যাকেজিং নামক প্রতিষ্ঠান অগ্রণী ব্যাংক থেকে নিলামের মাধ্যমে সানবেস্ট বেকারি নামক একটি প্রতিষ্ঠান এ প্লট পেয়েছে। এমএস সুরমা বেকার্স অ্যান্ড সন্স ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে হাইকোর্টে মামলা ছিল। মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। দরপত্র আহ্বানের প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এছাড়া মনসুর নিটিং, প্রিমিয়ার ডাইয়িং ও এম আহমদ টেক্সটাইলের বিসিকের সঙ্গে মামলা চলছে। ফলে এ ইউনিটগুলো কাজে লাগানো যাচ্ছে না। উদ্যোক্তারা নতুন করে প্লট নিতে চাইলেও পাচ্ছেন না।
সরেজমিনে বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গিয়েছে গোটাটিকর বিসিকের সবচেয়ে বড় সমস্যা জলাবদ্ধতা। গোটাটিকর বিসিকের সামনের সড়কসহ আশপাশের সব স্থাপনা উঁচু। ফলে ভেতরে নালা ব্যবস্থা থাকলেও বিসিকের পানি বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ পায় না। পানিতে দুর্গন্ধ থাকায় পাশের আলমপুর-কুচাই এলাকাবাসী বিসিকের বাইরে মূল নালা বন্ধ করে দিয়েছেন। এতে বৃষ্টি হলেই পানি জমে যায়। বর্ষা মৌসুমে অনেক শিল্প-কারখানায় পানি উঠে যায়।
গোটাটিকর বিসিকের বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠান আলীম ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বিসিক শিল্পনগরী শিল্প মালিক সমিতির কোষাধ্যক্ষ আলীমুল এহছান চৌধুরী বলেন, সিলেটে দুটি বিসিক শিল্পনগরী থাকলেও এখানে নতুন করে শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্যোগ নেই।
গোটাটিকর বিসিক নগরীর কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ আবিদুর রহমান খান বলেন, বিসিকের ভেতরের নালাগুলো সংস্কার করা হয়েছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে ৩৬ লাখ টাকার উন্নয়নকাজ হয়েছে। চলতি বছরে ১ কোটি ৩০ লাখ টাকার একটি প্রস্তাবনা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এ বরাদ্দ পেলে ড্রেন ও রাস্তার উন্নয়ন হবে।
খাদিম বিসিক শিল্পনগরী কর্মকর্তা তোফাজ্জল হোসেন বলেন, বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্পপ্রতিষ্ঠান চালুর ব্যাপারে প্রতিষ্ঠান মালিকদের বারবার তাগিদ দেয়া হচ্ছে। এর সুফলও পাওয়া যাচ্ছে। যারা একেবারেই উৎপাদনে আসার সম্ভাবনা নেই তাদের অন্য উদ্যোক্তাদের হস্তান্তরের তাগিদ দেয়া হচ্ছে। এরই মধ্যে তিনটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান উৎপাদনে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। এছাড়া বিসিকের অভ্যন্তরে ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নেও কাজ করছে বিসিক।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) শিল্প সহায়ক কেন্দ্রের উপমহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী ম. সুহেল হাওলাদার বলেন, আমরা রুগ্ণ বা নিষ্ক্রিয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো চালুর ব্যাপারে উৎসাহ দিচ্ছি। আবার কোনো কোনো উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান চালাতে না পারলে অন্যদের সুযোগ করে দেন সে ব্যবস্থা করছি। ফলে ফুলকলি, পিউরিয়াসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান উৎপাদন শুরু করতে পেরেছে।










