পাইপলাইনে সরবরাহ করা গ্যাসের তীব্র সংকট থাকায় হিমশিম খেতে হচ্ছে শিল্পোদ্যোক্তাদের। এ প্রেক্ষাপটে কারখানা চালু রাখতে বিকল্প জ্বালানি হিসেবে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) সংযোগ বাড়াচ্ছেন তারা। এমনকি ডিজেলভিত্তিক জেনারেটরের খরচ বাঁচাতে সেটিকে অনেকে এলপিজিতে রূপান্তর করছেন। রাজধানী ও আশপাশের জেলাগুলোর বিভিন্ন শিল্প-কারখানায় খোঁজ নিয়ে এ তথ্য জানা গেছে।
দেশে আবাসিকে পাইপলাইনের গ্যাস সংযোগ দীর্ঘ সময় ধরে বন্ধ। যেসব লাইন রয়েছে সেখানেও গ্যাসের তীব্র সংকট। একই সঙ্গে শিল্প-কারখানায় প্রতিনিয়ত গ্যাসের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিয়ে অসন্তোষে ব্যবসায়ীরা। এসব কারণে দেশে এলপিজির ব্যবহার বাড়ছে, যার বার্ষিক চাহিদা ১৪ লাখ টন। এর ৯০ শতাংশের ব্যবহার বাসাবাড়ি ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে। এরই মধ্যে অটোগ্যাস হিসেবে এটি গাড়িতে ব্যবহার শুরু হয়েছে। নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সংযোগ না থাকায় ভারী ও মাঝারি শিল্পের অন্তত পাঁচ শতাধিক কারখানাও এখন এলপিজি ব্যবহার করছে। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, বর্তমানে বিভিন্ন খাতের অন্তত এক হাজারের বেশি কারখানায় এলপিজির সংযোগের কাজ চলছে।
শিল্পে এলপিজির ব্যবহার বাড়াতে গত নভেম্বর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এ খাতের স্টেকহোল্ডারদের নিয়ে একটি বৈঠক হয়। সেখানে শিল্প খাতে এলপিজি ব্যবহারের সম্ভাবনা, চ্যালেঞ্জ ও সুপারিশ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। ওই বৈঠকে এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (লোয়াব) শিল্প খাতে বিকল্প জ্বালানি হিসেবে এলপিজির একটি প্রেজেন্টেশন উপস্থাপন করে। তাতে শিল্পে এলপিজির প্রযুক্তিগত নানা সমাধান তুলে ধরা হয়। পরে ওই বৈঠকে শিল্পে এলপিজি ব্যবহারের সমন্বিত একটি নীতিমালা তৈরির বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়, যেটি নিয়ে এখন কাজ করছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। এরই মধ্যে নীতিমালার খসড়ার কাজ অনেকটা এগিয়েছে বলে জানিয়েছে জ্বালানি বিভাগ।
জ্বালানি বিভাগের সচিব মো. নূরুল আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এলপিজির একটি নীতিমালা রয়েছে। এখন সেটি সমন্বিত নীতিমালা করা হচ্ছে। এটি নিয়ে কাজ চলছে। শিগগিরই এ নীতিমালা প্রকাশ করা হবে।’
ব্যবসায়ীরা অবশ্য বলছেন, শিল্পে এলপিজি ব্যবহারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এটি প্রাকৃতিক গ্যাসের তুলনায় ব্যয়বহুল। তবে ডিজেলের তুলনায় সাশ্রয়ী। বর্তমানে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম শিল্পে ৩০ টাকা। আর এলপিজির দাম প্রতি কেজি ১১৯ টাকা ৪০ পয়সা, প্রতি লিটারের (অটোগ্যাস) দাম ৬৫ টাকা ৭৬ পয়সা। এ দাম শুধু জানুয়ারির জন্য কার্যকর।
শিল্পে গ্যাসের সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয় নিটওয়্যার ফ্যাক্টরিতে। এসব কারখানার বেশির ভাগ জেনারেটর গ্যাস ও ডিজেলচালিত। ফলে এগুলোকে ডুয়াল জেনারেটরে রূপান্তর করা ব্যয়বহুল ও চ্যালেঞ্জের। তবে ব্যবসায়ীদের অন্য একটি পক্ষ বলছে, নিরবচ্ছিন্ন সংযোগ পেতে খরচ বেশি হলেও এলপিজি নির্ভরযোগ্য।
দেশে শিল্প-কারখানায় গ্যাসের সংকট দীর্ঘদিনের। সরেজমিনে গাজীপুরের বেশ কয়েকটি গার্মেন্ট ও নারায়ণগঞ্জের সিরামিক ফ্যাক্টরিতে গিয়ে দেখা গেছে, কারখানার অব্যবহৃত জায়গায় তৈরি করা হচ্ছে এলপিজির অবকাঠামো। যেখানে মাউন্টেড বা গ্যাস স্টোরেজ ট্যাংক বসানো হয়েছে।
গাজীপুরের একটি গার্মেন্টের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বণিক বার্তাকে জানান, নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ দেয়ার কথা বলে ব্যবসায়ীরা সরকারকে গ্যাসের দাম বেশি দিচ্ছেন। অথচ গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। এতে উৎপাদন ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। তাই বায়ারের অর্ডার ও ডেলিভারি ঠিক রাখতে ব্যয় বেশি হলেও এলপিজি সিস্টেম প্রতিস্থাপন করা হচ্ছে।
দেশের বাজারে এলপিজি সরবরাহে নিয়োজিত রয়েছে ৩০টি দেশী ও বহুজাতিক কোম্পানি। এর মধ্যে বসুন্ধরা, ওমেরা, ফ্রেশ, যমুনা, বিএমসহ আরো কয়েকটি কোম্পানি বাজারজাতের শীর্ষ তালিকায় রয়েছে। তাদের ভাষ্য, বাসাবাড়ির পাশাপাশি শিল্পে এলপিজির ব্যাপক চাহিদা বাড়ছে। সরকারের একটি সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন পাওয়া গেলে পাইপলাইনের গ্যাসের নির্ভরতা অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব।
জানতে চাইলে ওমেরা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) তানজীম চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘শিল্পে এলপিজির জন্য চাই প্রপার নীতিমালা, যেখানে সরকার একটা গাইডলাইন দেবে। সে অনুযায়ী বেসরকারি কোম্পানিগুলো এলপিজি মার্কেট ডেভেলপ করবে। বাসাবাড়ি থেকে গাড়িতে এ গ্যাস প্রসারিত হয়েছে। এখন শিল্পে প্রসার সময়ের দাবি।’
শিল্পে এলপিজির ব্যবহার বাড়ার কথা জানিয়েছে এ খাতের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান বসুন্ধরা। কোম্পানিটির বিভাগীয় প্রধান (বিক্রয় ও বিপণন) মো. রেদোয়ানুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সিরামিক, পেট্রোকেমিক্যাল, টেক্সটাইল ও গার্মেন্ট শিল্পে এলপিজির ব্যবহার বাড়াচ্ছেন শিল্প মালিকরা। খরচ বিবেচনায় ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার বাদ দিয়ে এলপিজিতে রূপান্তর করছে অনেক কারখানা। আমরা এরই মধ্যে অনেকগুলো কারখানায় এলপিজি সরবরাহ করেছি। পর্যায়ক্রমে সেটি বাড়ছে।’
শিল্প খাতে এলপিজি ব্যবহারের সম্ভাবনা, চ্যালেঞ্জ ও সুপারিশ সরকারের কাছে তুলে ধরেছেন এ খাতের স্টেকহোল্ডাররা। এ বিষয়ে লোয়াব সভাপতি ও ইস্ট কোস্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এলপিজি খাতে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের বিপুল অংকের বিনিয়োগ। এ খাতের যন্ত্রাংশ আমদানিতে সরকারের নীতিসহায়তা পেলে শিল্প খাতে ব্যবসাটি প্রসারিত হবে। প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর পর্যায়ক্রমে চাপও কমে আসবে।’
দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের মোট সরবরাহের সিংহভাগ ব্যবহার হয় বিদ্যুতে। এর বাইরে বাসাবাড়িতে ব্যবহৃত হয় ১৩ শতাংশ এবং সিএনজি খাতে ৬ শতাংশ। শিল্প মালিকরা অবশ্য আবাসিক ও সিএনজি খাতকে এলপিজিতে রূপান্তর করে সে গ্যাস শিল্পে ও সার কারখানায় ব্যবহারের দাবি জানিয়ে আসছেন। এতে শিল্পের গ্যাস সংকট কিছুটা হলেও কমে আসবে বলে মনে করছেন তারা।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ) সভাপতি মোহাম্মদ আলী খোকন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘শিল্পে এলপিজি সংযোগ দুঃসাহসিক চ্যালেঞ্জ। এ খাতে বৃহৎ আকারে এলপিজি ব্যবহার ব্যয়বহুল। প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জও অনেক। তার চেয়ে বরং আবাসিক ও সিএনজি খাতের গ্যাসকে এলপিজিতে রূপান্তর করতে পারে সরকার। এ দুই খাতের প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যবহার ১৯ শতাংশ, যা মোট দৈনিক গ্যাস সরবরাহের ৪২৯ এমএমসিএফডি। বিপুল পরিমাণ এ গ্যাস শিল্পে ও সার কারখানায় দেয়া গেলে তার অর্থনৈতিক ফিডব্যাক অনেক বেশি।’










