২০২০ সালেও স্পট মার্কেটে প্রতি এমএমবিটিইউ (মেট্রিক মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট) এলএনজির গড় মূল্য ছিল ৪ ডলার। বর্তমানে তা ওঠানামা করছে ৩৪-৩৮ ডলারের মধ্যে। সাশ্রয়ী থেকে আকস্মিক সবচেয়ে ব্যয়বহুল হয়ে ওঠা জ্বালানি পণ্যটির বাজার কবে স্থিতিশীল হয়ে উঠবে, সে বিষয়ে নিশ্চয়তা দিতে পারছে না কেউই। জ্বালানির আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ হলো অদূরভবিষ্যতে এলএনজির বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে ওঠার কোনো সম্ভাবনা নেই। বাজারের এ অস্থিতিশীলতা এখন জ্বালানি পণ্যটিকে ঘিরে করা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগগুলোকে ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।

দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের পরিকল্পনা অনেকটাই সাজানো হয়েছে আমদানীকৃত এলএনজিকে কেন্দ্র করে। গ্যাসের সরবরাহ ঘাটতি মেটাতে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কাতার ও ওমান থেকে পণ্যটি আমদানি করছে বাংলাদেশ। আমদানি হচ্ছে স্পট মার্কেট থেকেও। বিদ্যুৎকেন্দ্র, রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট, টার্মিনাল ও পাইপলাইন নির্মাণসহ এলএনজিকেন্দ্রিক নানা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও নেয়া হয়েছে।

জ্বালানির আন্তর্জাতিক বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) এক সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, সাশ্রয়ী জ্বালানি বিবেচনায় বাংলাদেশ, চীন, ভারত, ভিয়েতনাম, ফিলিপাইনসহ এশিয়ার আটটি দেশ এলএনজি খাতে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করেছে। এলএনজিকেন্দ্রিক অনেক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হচ্ছে দেশগুলোর বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে। জ্বালানিটির সরবরাহ ও মজুদ বৃদ্ধিতে প্রস্তুত করা হচ্ছে নানা অবকাঠামো। কিন্তু এসব বিনিয়োগ এরই মধ্যে ঝুঁকিতে পড়েছে। উচ্চমূল্যের কারণে দেশগুলো সামনের দিনগুলোয় পণ্যটির আমদানি বজায় রাখতে পারবে কিনা, সে বিষয়েও বড় ধরনের সংশয় রয়েছে।

বর্তমানে গ্যাসের সরবরাহ সংকট সমাধানের চেয়ে এলএনজি অবকাঠামো নির্মাণের দিকেই বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ দেখা যাচ্ছে বেশি। বিশেষ করে মাতারবাড়ীতে পরিকল্পনাধীন ১০০ কোটি ঘনফুট সক্ষমতার এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের কাজ পাওয়া নিয়ে জ্বালানি খাতের দেশী-বিদেশী জায়ান্টগুলোর মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা চলছে। এ নিয়ে সরকারের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানগুলো দেনদরবার চালিয়ে যাচ্ছে বলেও গুঞ্জন রয়েছে। পেট্রোবাংলার সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিজিসিএল) তথ্য অনুযায়ী, টার্মিনালটি নির্মাণের জন্য পাঁচ দেশের আটটি প্রতিষ্ঠানকে শর্টলিস্ট করা হয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশের দুটি, জাপানের তিনটি এবং ফ্রান্স, ভারত ও কাতারের একটি করে প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ফরাসি প্রতিষ্ঠানটি হলো টোটাল গ্যাস অ্যান্ড পাওয়ার বিজনেস সার্ভিসেস/ টোটাল গ্যাস ইলেকট্রিসিটি হোল্ডিং ফ্রান্স। মাতারবাড়ী রিগ্যাস টার্মিনাল নির্মাণে জাপান ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশনের সঙ্গে কিউশু ইলেকট্রিক পাওয়ার কোম্পানি ইনকরপোরেট ও ইউনিক হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টের নির্মিত কনসোর্টিয়ামও এ আট প্রতিষ্ঠানের তালিকায় রয়েছে। প্রতিযোগিতায় রয়েছে জাপানের মিত্সুই অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেড এবং সুমিতমো করপোরেশন ও চুগোকো ইলেকট্রিক পাওয়ার লিমিটেড কোম্পানি লিমিটেডের কনসোর্টিয়ামও। তালিকার অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো হলো বাংলাদেশের সামিট করপোরেশনের নেতৃত্বে মিত্সুবিশি  করপোরেশন (জাপান) ও জেরা কোম্পানি ইনকরপোরেটের কনসোর্টিয়াম, ইউনাইটেড এন্টারপ্রাইজ অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেডের নেতৃত্বে পসকো ইন্টারন্যাশনাল করপোরেশন ও কোরিয়া গ্যাস করপোরেশনকে নিয়ে গঠিত কনসোর্টিয়াম, ভারতের পেট্রোনেট এলএনজি লিমিটেড ও এক্সনমোবিল এলএনজি মার্কেট ডেভেলপমেন্ট ইনকরপোরেটকে সঙ্গে নিয়ে কাতার পেট্রোলিয়াম এলএনজি সার্ভিসেস লিমিটেডের নেতৃত্বে গঠিত কনসোর্টিয়াম।

বিনিয়োগে তীব্র প্রতিযোগিতা থাকলেও এলএনজির বর্তমান বাজার পরিস্থিতি এ ধরনের অবকাঠামো নির্মাণের মতো দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগগুলোকে ক্রমেই ঝুঁকির দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলে অভিমত বাজার পর্যবেক্ষকদের। তারা বলছেন, কয়েক বছর আগেও এলএনজি ছিল অত্যন্ত সাশ্রয়ী একটি জ্বালানি। কিন্তু পরিবর্তিত বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে জ্বালানিটি হয়ে দাঁড়িয়েছে সবচেয়ে ব্যয়বহুলগুলোর অন্যতম। বাড়তি চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে ২০২০ সালে স্পট মার্কেট থেকে পণ্যটি আমদানি শুরু করে বাংলাদেশ। ওই সময়ে পণ্যটির মূল্য ছিল প্রতি এমএমবিটিইউ ৪ ডলার করে। সস্তার এলএনজি কিনে ওই সময়ে বেশ লাভও করেছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগ।

কিন্তু পরিস্থিতি বদলে যায় গত বছরের শুরু থেকে। কভিডের অভিঘাত কাটিয়ে পুনরুদ্ধার কার্যক্রম জোরালো হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্বব্যাপী জ্বালানির চাহিদায় বড় ধরনের উল্লম্ফন দেখা দেয়। এর ধারাবাহিকতায় জ্বালানি পণ্যের বাজারদর বাড়তে থাকে। সবচেয়ে দ্রুতগতিতে বাড়তে থাকে এলএনজির দাম। একসময়ের সাশ্রয়ী জ্বালানিটি হয়ে ওঠে সবচেয়ে ব্যয়বহুলগুলোর অন্যতম। স্পট মার্কেটে এখন প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির দাম ওঠানামা করছে ৩৪-৩৮ ডলারের মধ্যে। বাড়তি মূল্যের কারণে স্পট মার্কেট থেকে পণ্যটি সংগ্রহ করতে গিয়ে বেগ পেতে হচ্ছে জ্বালানি বিভাগকে। একদিকে সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটছে, অন্যদিকে বাড়তি মূল্যে পণ্যটি আমদানি করতে গিয়ে বিদ্যুৎ খাতে সরকারের ভর্তুকি ও লোকসানের পরিমাণও বেড়েছে।

আইইইএফএ মনে করছে, আমদানীকৃত এলএনজি দিয়ে জ্বালানি চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে কঠিন পরিস্থিতিতে পড়েছে বাংলাদেশ। সংস্থাটির পর্যবেক্ষণে বলা হয়, স্পট মার্কেটে এলএনজির উচ্চমূল্য সত্ত্বেও সরবরাহ ব্যবস্থাপনা ঠিক রাখতে পণ্যটির আমদানি অব্যাহত রাখতে হচ্ছে। এতে ভর্তুকির পরিমাণ বেড়ে গিয়ে আর্থিক চাপ সামাল দিতে পারছে না বাংলাদেশ।

সংস্থাটির এ পর্যবেক্ষণের সঙ্গে একমত দেশের জ্বালানি বিশেষজ্ঞরাও। তারা বলছেন, যেসব দেশ আমদানিনির্ভর জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে, সেগুলো এরই মধ্যে ঝুঁকিতে পড়েছে। দেশে এলএনজি নিয়ে বড় ধরনের যেসব পরিকল্পনা হচ্ছে সেগুলোও হয়ে উঠেছে বর্তমান বাজার পরিস্থিতির সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জ্বালানিবিষয়ক উপদেষ্টা ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, এলএনজি নিয়ে বাংলাদেশ যে পরিকল্পনা করেছে, সেটা অতীতে ঠিক ছিল। এখন নেই। এখন এ পরিকল্পনা থেকে বেরিয়ে আসা দরকার। বৈশ্বিক জ্বালানির বাজারে যে অস্থিরতা চলছে তাতে আমদানিনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এলএনজি নিয়ে আমরা এখনো সে অর্থে বড় মাপের বিনিয়োগ করিনি। ফলে ঝুঁকির পরিমাণ অন্যান্য দেশের মতো বড় না হলেও এখনই এর বিকল্প জ্বালানিতে বিনিয়োগ করা দরকার।

স্থানীয় জোগান ঠিক রাখতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগকে এখন উচ্চমূল্যেই এলএনজি আমদানি করতে হচ্ছে। এ খাতে বিপুল অংকের ভর্তুকিও দিতে হচ্ছে। চলতি অর্থবছরে এলএনজি আমদানি বাবদ সরকারের ভর্তুকি বরাদ্দ রয়েছে ৪ হাজার কোটি টাকা। যদিও আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিতিশীলতার কারণে এবার ৩২ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি প্রয়োজন পড়বে বলে অর্থ মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছে জ্বালানি বিভাগ। গ্যাস খাতের এ ভর্তুকির চাপ কমাতে ১১৭ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব দিয়েছে গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলো। এরই মধ্যে সে প্রস্তাবের ওপর গণশুনানি করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন। এছাড়া উচ্চমূল্যে গ্যাস কিনে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে তা কম মূল্যে বিক্রি করায় বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাবও করা হয়েছে কমিশনে।

আবার এর মধ্যেই এলএনজিকেন্দ্রিক বড় বড় অনেক প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে বাংলাদেশে। দেশে বর্তমানে এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণাধীন রয়েছে ৩ হাজার ৭০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার। এর মধ্যে কয়েকটি চলতি বছরেই উৎপাদনে যাচ্ছে। বাকিগুলো উৎপাদনে যাওয়ার কথা আগামী বছর। এছাড়া ২০২৮ সাল নাগাদ আরো অন্তত আট হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতার এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।

তবে এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহের সম্ভাব্য উৎস এখনো নিশ্চিত করতে পারেনি জ্বালানি বিভাগ। যদিও বিদ্যুৎ খাতের নীতিনির্ধারকরা বলছেন প্রকল্পগুলো যথাসময়েই উৎপাদনে যাবে।

বিদ্যুত খাতের নীতি ও পরিকল্পনা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক মোহাম্মদ হোসাইন এ বিষয়ে বণিক বার্তাকে বলেন, বিশ্ববাজারে জ্বালানি পণ্যের যে উচ্চমূল্য তা মূলত রাশিয়া ও ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও জ্বালানি বাজার আগের অবস্থায় চলে আসবে। আমরা বিদ্যুৎ নিয়ে যে পরিকল্পনা করেছি, সেখানে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাপনা সেভাবেই রাখা হয়েছে। ফলে অসুবিধা হবে না।

শুধু বিদ্যুৎকেন্দ্র নয়, আমদানীকৃত গ্যাস সরবরাহের পরিকল্পনা থেকে দেশের নয়টি জেলায় ১০ হাজার কোটি টাকার পাইপলাইন নির্মাণ প্রকল্পও গ্রহণ করা হয়েছে। প্রকল্পগুলোর অর্থায়ন ও সম্ভাব্যতা সমীক্ষাও করা হয়েছে। এর বাইরে মহেশখালী ও পটুয়াখালীর পায়রায় এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণে পরিকল্পনা করা হয়েছে। ২০১৬ সালে কক্সবাজারের মহেশখালীর মাতারবাড়ীতে স্থলভাগে এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণে গৃহীত প্রকল্পটির অনুমোদন দেয় সরকার। এখনো এটির কাজ শুরু হয়নি।

সামনের দিনগুলোয়ও আমদানীকৃত এলএনজি দিয়েই চাহিদা পূরণ করা হবে বলে জানিয়েছেন সরকারের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ বিভাগ-সংশ্লিষ্টরা। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, দেশে গ্যাসের মজুদ ফুরিয়ে আসছে। আগামীতে চাহিদা পূরণের জন্য আমদানীকৃত এলএনজির ওপরই নির্ভর করতে হবে। এছাড়া স্থানীয় গ্যাসের অনুসন্ধানও বাড়ানো হচ্ছে।