শুধু হাটখোলা বাজারেই নয়; কুড়িগ্রাম, দিনাজপুর, মেহেরপুর, কক্সবাজারসহ সীমান্তবর্তী জেলাগুলো থেকে সবচেয়ে বেশি অবৈধ জ্বালানি তেলের মজুদ পাওয়ার কথা জানিয়েছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। পুলিশের হিসাব অনুযায়ী, গত ১৭ মার্চ থেকে ২ এপ্রিল পর্যন্ত ২২ জেলায় মোট ২৯টি স্থানে জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুদ চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।
ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর থেকে সৃষ্ট যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে। বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়েছে দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাও। সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সময়মতো জ্বালানি তেল দিতে না পারায় দেশের জ্বালানির মজুদে টান পড়তে শুরু করেছে।
একদিকে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির চাপ, অন্যদিকে দেশীয় গ্যাস উত্তোলন কমে যাওয়ায় কনডেনসেট সংকট এবং বাজারে সিন্ডিকেটের কারসাজি—সব মিলিয়ে চরম জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এসব পরিস্থিতির মধ্যে দেশের কিছু অসাধু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুদ করে চলছে। এ মজুদের পরিমাণ দিন দিন বেড়েই চলছে।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব বিশ্ববাজারের মতো বাংলাদেশেও জ্বালানি সরবরাহে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। এ পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুদ, পাচার ও সরবরাহকে কেন্দ্র করে সহিংসতার ঘটনাও ঘটছে। সংশ্লিষ্ট জেলাগুলোর পাশাপাশি সারা দেশে জ্বালানির অবৈধ মজুদ প্রতিরোধে কঠোর নজরদারির কথা জানিয়েছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
পুলিশ সদর দপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী জানা যায়, গত ১৭ মার্চ থেকে ২ এপ্রিল পর্যন্ত ২২ জেলায় জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুদের সন্ধান পাওয়া গেছে। এসব জেলার মধ্যে রয়েছে কক্সবাজার, গাইবান্ধা, শরীয়তপুর, সাতক্ষীরা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, চট্টগ্রাম মহানগর, ময়মনসিংহ, কুড়িগ্রাম, দিনাজপুর, পাবনা, মেহেরপুর, মাদারীপুর, নেত্রকোনা, জামালপুর, চট্টগ্রাম, বাগেরহাট, ফরিদপুর, নারায়ণগঞ্জ, নড়াইল, গাজীপুর, ভোলা ও রাজশাহী। এ জেলাগুলোর মোট ২৯টি স্থানে অবৈধ জ্বালানির মজুদের তথ্য পাওয়া গেছে।
এসব অভিযানে ৪০ হাজার লিটারের বেশি ডিজেল ও পেট্রল জব্দ করা হয়েছে। অভিযানকালে অবৈধ বিক্রি, পরিমাপে কারচুপি, লাইসেন্সবিহীন ব্যবসা ও অবৈধ মজুদের প্রমাণ পাওয়া যায়। মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে অন্তত ৪ লাখ ২২ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। একই সঙ্গে জব্দ করা জ্বালানি সরকারি কোষাগারে জমা দেয়া এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।
এদিকে মিয়ানমারে পাচারকালে চট্টগ্রামের পতেঙ্গা উপকূলে ছয় হাজার লিটার ডিজেল ও আট রোহিঙ্গাসহ ১২ জনকে আটক করেছে কোস্টগার্ড। গতকাল পতেঙ্গায় বন্দরের বহির্নোঙরে একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকায় অভিযান চালিয়ে এসব ডিজেল জব্দ করা হয় বলে কোস্টগার্ডের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে। আটকদের মধ্যে বাংলাদেশী নাগরিকরা হলেন আব্দুল মান্নান, সাকিব, মো. সাকের ও সৈয়দ আলম। আর রোহিঙ্গারা হলেন আবু তাহের, সৈয়দ হোসেন, এনামুল হাসান, হামিদুল হক, মো. সাকের, মো. আয়াস, মোহাম্মদ ফারুক ও পরান। ডিজেল ছাড়াও তাদের কাছ থেকে ছয়টি গ্যাসভর্তি সিলিন্ডার ও নগদ ১৫ হাজার ৮০০ টাকা জব্দ করা হয়েছে। তার আগে বৃহস্পতিবার কর্ণফুলী নদীতে একটি লাইটার জাহাজ থেকে ৩৭ হাজার লিটার ডিজেল জব্দ করা হয়। ওই তেল অবৈধভাবে মজুদ করা হয়েছিল বলে চট্টগ্রাম বন্দরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট বলেছিলেন। গত ২৭ মার্চ চট্টগ্রামে মজুদ করা প্রায় ছয় হাজার লিটার ডিজেল জব্দ করার কথা জানিয়েছিল পুলিশ। আর গতকাল অন্য দেশে পাচারকালে ডিজেল জব্দের তথ্য দিল কোস্টগার্ড।
বাহিনীর মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন বলেন, ‘অবৈধভাবে মিয়ানমারে পাচারের উদ্দেশ্যে এসব ডিজেল ওই নৌকায় বহন করা হচ্ছিল। আটককৃতরা মানব পাচারকারী—এ কথা তুলে ধরে কোস্টগার্ডের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এ নৌকা ব্যবহার করে মানব পাচারকারীরা ১৫০-২০০ জনকে মালয়েশিয়ায় পাচারের পরিকল্পনা করছিল। এ ঘটনায় আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে কোস্টগার্ড।
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্রে আরো জানা যায়, শুধু পুলিশ নয়; র্যাব, বিজিবি ও কোস্টগার্ড জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুদ ও পার্শ্ববর্তী দেশে জ্বালানি পাচার বন্ধ করতে অভিযান পরিচালনা করছে। এসব অভিযানে অভিযুক্তদের গ্রেফতারও করা হচ্ছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু অভিযান পরিচালনা করলেই হবে না। অবৈধ মজুদদারদের সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা না নিলে এ সমস্যার কার্যকর সমাধান সম্ভব নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, ‘ইরানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলায় সৃষ্ট যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশে জ্বালানির যে সংকট তৈরি হয়েছে, সেটা আরো বেশি তীব্র আকার ধারণ করেছে এসব অবৈধ মজুদদারের কারণে। জ্বালানি সংকট তৈরি করে এবং সহজলভ্যতাকে নিয়ন্ত্রণ করে এ মজুদদাররা দেশের মধ্যে একটা বড় ধরনের অস্থিতিশীলতা তৈরি করার চেষ্টা করছেন।’
তিনি আরো বলেন, ‘কোনো পাম্প মালিক যদি অবৈধভাবে তেল মজুদ করেন, সেক্ষেত্রে তার লাইসেন্স বাতিল করতে হবে, যাতে অন্য ব্যবসায়ীরা এ ধরনের অপরাধে যুক্ত হওয়া থেকে বিরত থাকেন। আর যারা লাইসেন্স ছাড়াই জ্বালানির অবৈধ মজুদে যুক্ত হয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে আরো কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। আমরা দেখেছি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পুলিশ নিজেই বাদী হয়ে মামলা করেছে। এখানেও পুলিশকে সেই একই ভূমিকা নিতে হবে। কারণ অনেক ক্রেতাই আছেন, যারা ভুক্তভোগী হলেও মামলা করতে চান না। এ সুযোগ নিয়েই মজুদদাররা এ ধরনের অবৈধ কার্যক্রমে যুক্ত হয়ে পড়েন। তাই তাদের চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।’
জ্বালানির অবৈধ মজুদদার ও পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানান পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (গণমাধ্যম ও জনসংযোগ) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন। তিনি বলেন, ‘জ্বালানি সরবরাহ প্রক্রিয়ায় যারা বাধা তৈরি করছেন বা অবৈধ মজুদ করে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা করছেন তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। এক্ষেত্রে কাউকেই ছাড় দেয়া হবে না। জ্বালানি সরবরাহের পাম্পগুলোয় এরই মধ্যে অনিয়ম বন্ধে একজন ট্যাগ অফিসার নিয়োগ করেছে সরকার। পাশাপাশি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও কঠোর নজরদারি অব্যাহত রেখেছে।’










