বগুড়ার ফাউন্ড্রি শিল্পে তৈরি হওয়া হস্তচালিত টিউবওয়েল মার খেয়ে যাচ্ছে বিদ্যুচ্চালিত সাবমারসিবলের কাছে। জনপ্রিয় ও বহুল ব্যবহূত হস্তচালিত টিউবওয়েল দেশের ৮০ শতাংশ তৈরি হয় বগুড়ায়। তবে আধুনিকায়নের কারণে টিউবওয়েল উৎপাদন ক্রমেই কমছে।

গ্রামে গ্রামে বিদ্যুৎ পৌঁছে যাওয়া, সাবমারসিবল ব্যবহারে খরচ কমে আসা ও ব্যবহারে সহজ হওয়ায় কমছে টিউবওয়েল ব্যবহার। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের পথ পাচ্ছেন না বগুড়ার ফাউন্ড্রি শিল্প মালিকরা।

জানা যায়, শিল্পনগরী হিসেবে পরিচিত বগুড়ায় পঞ্চাশের দশকে প্রতিষ্ঠিত সব ভারী শিল্প বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে সত্তরের দশকে জেলায় মাঝারি ও ক্ষুদ্র শিল্প স্থাপনে ব্যাপক সাড়া পড়ে। ১৯৬৪ সালে শহরের ফুলবাড়ী এলাকায় সাড়ে ১৪ একর জায়গার ওপর গড়ে তোলা হয় বিসিক শিল্পনগরী। স্বাধীনতার পর পরই শেষ হয়ে যায় প্লটগুলো। উদ্যোক্তাদের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৮০ সালে আরো ১৮ দশমিক ৬৭ একর জায়গা সম্প্রসারণ করা হয়। সে জায়গায় গড়ে তোলা প্লটও একই বছরে শেষ হয়ে যায়। এভাবে দুই দফায় নির্মিত মোট ২৩৩টি প্লটে ৮৫টি শিল্প ইউনিট গড়ে ওঠে। গড়ে ওঠা শিল্প এখনো সচল রয়েছে।

বিসিক কর্মকর্তারা জানান, আশির দশকে বগুড়ায় ঢাকার ধোলাইখাল মডেলে ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্পের পাশাপাশি ফাউন্ড্রি ও মেটাল শিল্পের ব্যাপক বিকাশ হলেও বিসিক শিল্পনগরীতে প্লট না থাকায় উদ্যোক্তারা বাধ্য হয়েই এসব শিল্পের অনেক ইউনিট আবাসিক এলাকায় স্থাপন করতে শুরু করেন। কোথাও আবার আবাদি জমিতে কল-কারখানা স্থাপন করা হয়েছে। আবাসিক এলাকা ও চাষযোগ্য জমিতে শিল্প ইউনিট স্থাপনে নিরুৎসাহিত করতে বগুড়া সদরের চারমাথা ছয়পুকুরিয়া এলাকায় ভারী শিল্পের জন্য ১৯৮০ সালে জমি অধিগ্রহণ করা হয়। বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল করপোরেশন (বিএসইসি) এ জমি অধিগ্রহণ করে বগুড়া বিসিকের মাধ্যমে ভারী শিল্পভিত্তিক কল-কারকানা স্থাপনার প্রস্তাব দেয়। পরে জায়গাটিও বগুড়া বিসিককে দেয়ার প্রস্তাব ওঠে। অধিগ্রহণকৃত প্রায় সাড়ে ১৫ একর জায়গায় শিল্পনগরী প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেয়া হয়। বিসিকের পক্ষ থেকে ১৯৯৮ সালে প্রস্তাবটি উত্থাপন করা হয়। পরবর্তী সময়ে এ নিয়ে বহু চিঠি চালাচালির পর ২০০৫ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি বিসিকের পক্ষ থেকে উল্লিখিত জায়গায় শিল্পনগরী প্রতিষ্ঠার সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের লক্ষ্যে একটি কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটির পক্ষ থেকে বগুড়ার শিল্পোদ্যোক্তাদের ব্যাপক চাহিদা ও পাইপলাইনে গ্যাসপ্রাপ্তির কারণে ভারী শিল্পের জন্য অধিগ্রহণ করা জায়গা বাজারমূল্যে বিসিকের নামে কিনে সেখানে শিল্পনগরীর প্রতিষ্ঠার পক্ষে মতামত দেয়। এতে বলা হয়, শিল্পনগরীতে নতুন করে ১০৪টি শিল্প ইউনিট গড়ে তোলার মাধ্যমে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অন্তত ২৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। কিন্তু সেটি আর আলোর মুখ দেখেনি। পরবর্তী সময়ে ছয়পুকুরিয়ায় ভারী শিল্পের জন্য অধিগ্রহণকৃত জায়গাটি আর বগুড়া বিসিককে দেয়া হয়নি।

নতুন করে সংকট সৃষ্টি হলে বগুড়ার অনেক শিল্পোদ্যাক্তা আবাসিকসহ কৃষিজমিতে কল-কারখানা গড়ে তোলেন। এরই ধারাবাহিকতায় বগুড়ার ৫৫টি ফাউন্ড্রির মধ্যে বিসিকে ফাউন্ড্রি শিল্প রয়েছে ১৭টি আর বাকি সব বিভিন্ন এলাকায় প্রতিষ্ঠা করা হয়। ৫৫টি ফাউন্ড্রিতে কাস্ট বা ভাঙাড়ি লোহা ব্যবহার করা হয়। এ ভাঙাড়ি গলিয়ে নতুন করে পণ্যের রূপ দেয়া হয়। রূপান্তরিত এসব যন্ত্রাংশ ব্যবহার হচ্ছে কৃষিকাজে, বাসাবাড়ি, ছোট-বড় ইন্ডাস্ট্রি ও বিভিন্ন কল-কারখানায়। প্রতিদিন তৈরি হচ্ছে শ্যালো ইঞ্জিনের সেচ পাম্প, পিস্টন, টিউবওয়েল, পাওয়ার টিলারের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ, লেদ মেশিন, গাড়ির ব্রেক ড্রাম, করাতকল, ফ্লাওয়ার মিল, টেক্সটাইল মিল ও অয়েল মিল, এমনকি ধানকাটা মেশিনসহ অন্যান্য মেশিনের যন্ত্রাংশ। এসব যন্ত্রাংশের ওপর দেশের বিভিন্ন এলাকার মানুষের নির্ভরতাও বেড়ে যায়। বিশেষ করে দেশের মানুষ বগুড়ার তেরি হস্তচালিত টিউবওয়েলের প্রতি বেশি ঝুঁকে পড়ে।

আশির দশক থেকে শুরু করে হস্তচালিত টিউবওয়েলের ব্যাপক ব্যবহার হয়। এমনকি একসময় হস্তচালিত টিউবওয়েল আফ্রিকায় রফতানি করা হতো। মাঝে নেপালে হস্তচালিত টিউবওয়েলের কয়েকটি চালানও যায়। নানা জটিলতায় পর আর রফতানি নিয়মিত হয়ে ওঠেনি।

বগুড়ার টিউবওয়েল তৈরির বড় প্রতিষ্ঠান গুঞ্জন মেটাল ওয়ার্কসের জেনারেল ম্যানেজার বিশ্বজিৎ রায় জানান, বগুড়া বিসিকে এখন ১৭টি ফাউন্ড্রি রয়েছে। বাকি ফাউন্ড্রি বিসিকের বাইরে। ফাউন্ড্রির জন্য ভাঙাড়ি এখন কিনতে হয় ৫৬ টাকা কেজি দরে। আগে এ লোহা কম দামে বিক্রি হতো। ফাউন্ড্রি শিল্পের জন্য অতিপ্রয়োজনীয় হার্ডকোক (এক ধরনের কয়লা), সিলিকন এসবের দাম বেড়েছে। ফাউন্ড্রিতে আগে বেশি টিউবওয়েল তৈরি হতো। পাওয়ার টিলারের পার্টস কম তৈরি হতো। এখন টিউবয়েল উৎপাদন কমেছে আর পাওয়ার টিলারের পার্টস বেশি তৈরি হচ্ছে। আগে মাসে দুই হাজারের বেশি টিউবওয়েল উৎপাদন হতো। এখন সেখানে ১ হাজার ২০০ টিউবওয়েল তৈরি হচ্ছে। গ্রামে গ্রামে বিদ্যুৎ ও ব্যবহারের সুবিধার কারণে অনেকেই এখন সাবমারসিবলে ঝুঁকেছে। সাবমারসিবল বেশি ব্যবহারের কারণে টিউবওয়েলের ব্যবহার কমছে।

ফাউন্ড্রি শিল্প মালিক আব্দুল মালেক জানান, বিগত দিনে যে পরিমাণ টিউবওয়েল তৈরি হয়েছে, তার চেয়ে এখন কিছুটা হলেও কম হচ্ছে। দেশে আধুনিকায়নের ছোঁয়া লাগায় হস্তচালিত টিউবওয়েলের প্রতি মানুষের তেমন আগ্রহ নেই। মানুষ এখন বিদ্যুচ্চালিত সাবমারসিবলের প্রতি ঝুঁকছে। এছাড়া টিউবওয়েল তৈরির ক্ষেত্রে যে কাঁচামাল প্রয়োজন তার দাম বেড়েছে কয়েক গুণ। এ ফাউন্ড্রি শিল্পের জন্য ব্যবহারযোগ্য কাঁচামালের দাম কমিয়ে দেয়া জরুরি। নয়তো এ শিল্প বেশি দিন টেকানো দায় হয়ে যাবে।

বগুড়া শহরের সাবমারসিবল বিক্রেতা মো. ছান্নু জানান, শহর এলাকায় টিউবওয়েল বিক্রির চেয়ে সাবমারসিবল বেশি বিক্রি হয়। ইদানীং গ্রামেও টিউবওয়েল খুব কম বিক্রি হচ্ছে। এ কারণে গ্রামেও বেড়েছে সাবমারসিবল ব্যবহার। অধিকাংশ বাড়িতে টিউবওয়েল নেই। এখন টিউবওয়েলের মিস্ত্রির পরিবর্তে সাবমারসিবলের মিস্ত্রি খোঁজ করা হয়।

সাবমারসিবল মেরামতকারী রবিউল করিম জানান, এখন বেশির ভাগ বাড়িতে মোটর ও সাবমারসিবল ব্যবহার হয়। পানি ওপরে তুলতে টিউবওয়েল কাজ করে না। মোটর ও সাবমারসিবল কাজ করে। তাছাড়া ব্যবহারে সুবিধা বলে এখন সাবমারসিবল ব্যবহার হচ্ছে। এখন শহর থেকে গ্রামেও সাবমারসিবল ব্যবহার হচ্ছে।