দেশের গণতন্ত্র সুরক্ষা ও মানবাধিকার পরিস্থিতি ইস্যুতে পশ্চিমা কূটনীতিকদের বক্তব্য নিয়ে বিব্রত সরকার। একই সঙ্গে আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিদেশী মিশনপ্রধানদের সাম্প্রতিক তৎপরতা নিকট অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে চোখে পড়ার মতো। এ পরিস্থিতিতে নির্বাচনের আগমুহূর্তে বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে কূটনীতিকদের দফায় দফায় বৈঠক ক্ষমতাসীনদের অস্বস্তিতে ফেলেছে বলে মনে করছেন রাজনীতি বিশ্লেষকরা। সেজন্য দল ও সরকারের তরফ থেকে কূটনীতিকদের সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধি করা হচ্ছে। বিদেশীদের কাছে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরার জন্য কূটনীতিকঘনিষ্ঠ নেতাদের দায়িত্ব দেয়া হচ্ছে। ফলে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ ফোরামে দায়িত্বপ্রাপ্ত এসব নেতার গুরুত্ব বেড়েছে দলে।
আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা জানান, সব নির্বাচনের আগেই বিদেশী বিভিন্ন সংস্থা ও কূটনীতিকদের তৎপরতা চোখে পড়ে। তবে এবারের প্রেক্ষাপট অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে ভিন্ন। সে কারণে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বিদেশীদের সঙ্গে নির্বাচনকেন্দ্রিক আলোচনার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে দল থেকে অভিজ্ঞদের প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে।
আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের দেয়া তথ্যে জানা যায়, বিদেশী সংস্থা বা মিশনপ্রধানদের সঙ্গে বৈঠকের জন্য কূটনীতিকদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে এমন নেতাদের নির্বাচন করা হচ্ছে। দলীয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক যেকোনো বৈঠকের জন্য নির্দিষ্ট নেতা নির্বাচন করে দেন। আর এক্ষেত্রে কূটনৈতিক শিষ্টাচারে অভিজ্ঞদেরই দল থেকে দায়িত্ব দেয়া হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, দৃশ্যমানভাবে আওয়ামী লীগ বিদেশীদের সমালোচনায় মুখর হলেও ভেতরে ভেতরে আলাপ-আলোচনা অব্যাহত রাখার চেষ্টা করছে। আর এ আলাপ-আলোচনায় দলের প্রাজ্ঞ, অভিজ্ঞ ও চিন্তাশীল ব্যক্তিরা প্রাধান্য পাচ্ছেন।
সম্প্রতি দেশে-বিদেশে বিভিন্ন সংস্থা ও কূটনীতিকদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকগুলো পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বিদেশীদের সঙ্গে বৈঠকে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা ও কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা এতে অংশ নিচ্ছেন। তাদের মধ্যে আছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য অ্যাম্বাসেডর মোহাম্মদ জমির, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফর উল্লাহ, ড. আবদুর রাজ্জাক, লে. কর্নেল (অব.) ফারুক খান, দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, দলের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ড. শাম্মী আহমেদ, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক ড. সেলিম মাহমুদ, দপ্তর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া, কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য অধ্যাপক মো. আলী আরাফাতসহ বেশ কয়েকজন নেতা।
আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করার আহ্বান জানিয়ে আসছে মার্কিন প্রশাসন। সেই লক্ষ্যে বাংলাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে বৈঠক অব্যাহত রেখেছেন ঢাকায় নিযুক্ত দেশটির রাষ্ট্রদূত পিটার ডি হাস। এরই অংশ হিসেবে সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দলটির একটি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। ওবায়দুল কাদেরের নেতৃত্বে ওই বৈঠকে আরো উপস্থিত ছিলেন ফারুক খান, ড. শাম্মী আহমেদ, ড. সেলিম মাহমুদ, বিপ্লব বড়ুয়া ও মো. আলী আরাফাত।
এর আগে গত ১৫ জুলাই ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে আওয়ামী লীগের নয় সদস্যের প্রতিনিধি দলের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে ছিলেন অ্যাম্বাসেডর মো. জমির, ফারুক খান, হাছান মাহমুদ, ড. শাম্মী আহমেদ, বিপ্লব বড়ুয়া, সেলিম মাহমুদ, কার্যনির্বাহী সদস্য তারানা হালিম ও মো. আলী আরাফাত। এছাড়া চলতি বছরের মে মাসে আওয়ামী লীগের একটি প্রতিনিধি দল চীনা কমিউনিস্ট পার্টির আমন্ত্রণে চীন সফরে যায়। ওই টিমের নেতৃত্বে ছিলেন দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ফারুক খান।
আওয়ামী লীগের সঙ্গে বিভিন্ন সংস্থা ও কূটনীতিকদের বৈঠক প্রসঙ্গে ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাংলাদেশে যেসব বিদেশী প্রতিনিধি রয়েছেন তাদের দায়িত্ব হচ্ছে সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে কাজ করা। সেজন্য তাদের সঙ্গে আমরা বৈঠকের মাধ্যমে বিভিন্ন বিষয়ে আলাপ-আলোচনা করি। আমরা আশা করি, আমাদের বিদেশী বন্ধুরা আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে আমাদের গণতান্ত্রিক সংগ্রাম, সংবিধান সমুন্নত রাখার সংগ্রামকে সহযোগিতা করবে।’
বিদেশীদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনায় দলের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্টসংখ্যক নেতাদের অংশ নেয়ার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। তবে আগামীতে যেকোনো বৈঠকে অপেক্ষাকৃত ছোট টিম নিয়ে আলোচনায় অংশ নেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমি মনে করি মিটিংয়ে পাঁচজনের বেশি থাকা উচিত না। এর অধিক হলে কেউ কেউ মনে করে যে আমি একটু বেশি কথা বলতে পারলাম না, আবার অনেক ক্ষেত্রে কেউ এমন একটা কথা বলে বসল যে পরিস্থিতি অনেক কঠিন হয়ে যায়। আমাদের নেত্রী ও সাধারণ সম্পাদক সবকিছু দেখেন। তারা সবকিছু বিবেচনায় নিয়েই টিম গঠন করেন।’
তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি এক মিটিংয়ে আমাদের দলের একজন এমন এক কথা বলেছেন যে যেটি আমাদের বিরুদ্ধে গেছে। কিন্তু যিনি বলেছেন তিনি পজিটিভলি বলেছেন। আমাদের তরফ থেকে এ তথ্য দেয়ার কোনো মানে নেই। আমাদের অবস্থান ওরা যেটা চাইবে আমরা সেটুকুই বলব, তার বাইরে কিছু বলব না। আমরা যদি তাদের (বিদেশীদের) নতুন তথ্য দিই তাহলে তারা এটাকে নিজেদের মতো করে পর্যালোচনা করবে। তারা কিন্তু আমাদের তথ্য শতভাগ বিশ্বাস করবে না। সুতরাং তারা আমাদের কাছে যে প্রশ্ন করবে শুধু তারই উত্তর দেব। সেজন্য আগামী যেকোনো মিটিংয়ে আমরা পাঁচ থেকে সর্বোচ্চ সাতজনের টিম নিয়ে অংশ নেব।’
আন্তর্জাতিক সংস্থা বা কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠকে অংশ নেয়ার ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের সুনির্দিষ্ট টিম গঠন প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য লে. কর্নেল (অব.) ফারুক খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘যখন দেশে বিদেশী কোনো টিম আসে তখন আমাদের নেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের আলোচনা করে একটি টিম নির্ধারণ করে দেন। ওই টিমের মধ্যে তারাই থাকেন যাদের মনে করা হয় এ বিষয়ে তাদের ভালো অভিজ্ঞতা রয়েছে। যেমন আমাকে নেয়া হয় কারণ সম্ভবত আমি পররাষ্ট্রবিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি সেজন্য। আমি এর আগে আমেরিকায় গিয়েছিলাম। সম্প্রতি আমেরিকা থেকে যারা যারা এসেছেন তাদের সবার সঙ্গেই আমার আগে থেকেই পরিচয় ছিল। ইউরোপীয় পার্লামেন্টে আমি গিয়েছিলাম, সেখান থেকে যারা এসেছেন তাদের অধিকাংশের সঙ্গেও আমার আগেই দেখা হয়েছে। কথাও হয়েছে। সুতরাং এ ব্যাপারে যেহেতু আমার আগেই যোগাযোগ রয়েছে সে কারণে আমাকে ডাকা হয়। সুতরাং যাদের এ ধরনের মিটিংয়ে প্রয়োজন মনে হয়, তাদেরই বৈঠকে রাখা হয়।’
এ প্রসঙ্গে রাজনীতি বিশ্লেষক, সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশের বিরাজমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিদেশী কূটনীতিকদের সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোকে আলাপ-আলোচনা করতে হচ্ছে। তারই অংশ হিসেবে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগও এ কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। দলের মধ্যে যারা অভিজ্ঞ, উচ্চশিক্ষিত ও চিন্তাশীল তারাই এখন অধিক গুরুত্ব পাচ্ছেন। তারা তাদের যোগ্যতা দিয়ে নিজ জায়গা থেকে কূটনীতিকদের সঙ্গে আলোচনায় অংশ নিচ্ছেন।’










