বিপন্ন বাঘের অবৈধ চোরাচালান ও পাচারের বড় কেন্দ্র হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ। বিভিন্ন সময়ে বন বিভাগসহ দেশী-বিদেশী সংস্থার অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, আইন করে সংরক্ষণের পদক্ষেপ নেয়া হলেও বাংলাদেশে বাঘ শিকার ও চোরাচালান বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। বরং সাম্প্রতিক কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে অভ্যন্তরে বসবাসরত অভিজাতরাই এখন চোরাচালানকৃত বাঘ ও অন্যান্য বন্যপ্রাণী এবং এগুলোর অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্রেতা হয়ে উঠেছেন।
সারা বিশ্বে আজ উদযাপন হচ্ছে বিশ্ব বাঘ দিবস। দিবসটি সামনে রেখে ওয়াইলি কনজার্ভেশন সায়েন্স অ্যান্ড প্র্যাকটিস জার্নালে একটি গবেষণা নিবন্ধ প্রকাশ হয়েছে। এতে উঠে আসে, বাংলাদেশ থেকে বাঘ ও বাঘের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ থেকে তৈরি দ্রব্য এখন ১৪টি দেশে যাচ্ছে। এর মধ্যে জি-২০ভুক্ত দেশগুলোও রয়েছে। যুক্তরাজ্য, জার্মানি ও কাতারে বসবাসরত বাংলাদেশী প্রবাসীদের কাছেও বাঘের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ক্রেতা পাওয়া গেছে। তবে সার্বিকভাবে বাঘের অঙ্গপ্রত্যঙ্গজাত পণ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভোক্তা গ্রুপ এলিট বা অভিজাত বাংলাদেশীরাই। আর এসব ক্রেতার চাহিদা পূরণে বাঘ সরবরাহ হচ্ছে উত্তর-পূর্ব ভারত, মিয়ানমার ও বাংলাদেশের সুন্দরবন থেকে।
গবেষণায় বাংলাদেশী অভিজাত শ্রেণীর ক্রমবর্ধমান চাহিদাকেই এ তিন অঞ্চলে বাঘ শিকার ও চোরাচালানের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন বিশেষজ্ঞরা। একই সঙ্গে সরকারের দেশের ‘জলদস্যু শিকারি’ নেটওয়ার্ক ভেঙে ফেলার পদক্ষেপ নিয়ে প্রশংসার পাশাপাশি বিষ দিয়ে বাঘ শিকার বন্ধে সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
‘টাইগার্স অ্যাট আ ক্রসরোডস: শেডিং লাইট অন দ্য রোল অব বাংলাদেশ ইন দি ইলিগাল ট্রেড অব দিস আইকনিক বিগ ক্যাট’ শিরোনামে গবেষণায় উঠে আসা ফল প্রকাশ হয়। চাইনিজ অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেস, নিউইয়র্কভিত্তিক সংরক্ষণ সংস্থা প্যান্থেরা ও ইউনিভার্সিটি অব হংকংয়ের পাঁচ গবেষক এটি পরিচালনা করেন।
এতে দেখা যায়, সুন্দরবনের চ্যানেলগুলো ২০০০ সাল থেকে শুরু করে ২০১৮ সাল পর্যন্ত প্রায় ৩০টি জলদস্যু গোষ্ঠী নিয়ন্ত্রণ করত। চাঁদাবাজি, অপহরণ, বনজীবীদের কাছ থেকে চাঁদা আদায় ইত্যাদি তাদের নিত্যনৈমিত্তিক কাজ ছিল। তাদের মধ্যে অন্তত সাতটি জলদস্যু দল প্রত্যক্ষভাবে বাঘ শিকারে অংশ নেয়। ফলে সুন্দরবনের বাঘের সংখ্যা ২০০৯ সালের ৩০০-৫০০টি থেকে কমে ২০১৮ সালে আনুমানিক ১১৪টিতে নেমে আসে। বাংলাদেশ সরকার ২০১৬ সালে জলদস্যু গোষ্ঠীগুলোকে সাধারণ ক্ষমার প্রস্তাব দেয়। যারা প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে তাদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা হয়। এভাবে কয়েক বছরের মধ্যে অঞ্চলটিকে জলদস্যুমুক্ত ঘোষণা করা হয়। তবে জলদস্যু চলে যাওয়ার পর তাদের শূন্যস্থান দখল করেছে প্রায় ৩২টি বিশেষজ্ঞ বাঘ চোরাচালানকারী সিন্ডিকেট। তারা কৃষিকাজে ব্যবহৃত বিষ ‘ফুরাডন’ ব্যবহার করে বাঘ হত্যা করে।
গবেষক দলের প্রধান এবং চাইনিজ একাডেমি অব সায়েন্সের সাবেক ডক্টরাল ফেলো ড. নাসির উদ্দিন ২০১৬-২১ সাল পর্যন্ত বাঘ চোরাচালানের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি স্থল, সমুদ্র এবং আকাশ পথে বাংলাদেশে বাঘ পাচারে জড়িত প্রায় ১৬৩ চোরা শিকারি, চোরাকারবারি এবং ব্যবসায়ীর সাক্ষাৎকার নেন। এর মাধ্যমে তিনি বাঘের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সংগ্রহের স্থান, প্রক্রিয়াকরণ এবং বিতরণ কেন্দ্র, ট্রানজিট পোর্ট, অবৈধ সীমান্ত ক্রসিং এবং ব্যবহারের স্থানসহ বাণিজ্য রুটগুলো চিহ্নিত করেন। এতে বাঘ শিকারের চারটি কেন্দ্রস্থল শনাক্ত করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে ভারত ও বাংলাদেশজুড়ে বিস্তৃত সুন্দরবন, ভারতের কাজিরাঙ্গা-গরমপানি পার্ক, নামদাফা-রয়্যাল মানস পার্ক ও মিয়ানমারের নর্দার্ন ফরেস্ট কমপ্লেক্স।
তাদের দাবি, ব্যবসায়ীরা কিছু ক্ষেত্রে বৈধ বন্যপ্রাণী ব্যবসার লাইসেন্স নিয়ে অবৈধভাবে বন্যপ্রাণীর ব্যবসা পরিচালনা করে থাকেন। বাংলাদেশ থেকে বাঘ চোরাচালানের সিংহভাগই হচ্ছে ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে স্থলসীমান্ত দিয়ে। আঞ্চলিক রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং দেশগুলোর মধ্যে সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত মিল পশুটি চোরাচালানে অন্যতম সহায়ক হিসেবে কাজ করে। এছাড়া বাঘের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পাচারকারি চক্রগুলো মাদক পাচারের সঙ্গেও জড়িত।
গবেষণার সহলেখক এবং প্যানথেরা টাইগার প্রোগ্রামের পরিচালক ড. অভিষেক হারিহার বলেন, ‘এ অঞ্চলকে বাঘ শিকারের জন্য গ্রাউন্ড জিরো হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কিন্তু গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, শিকার এখনো বাঘের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি। বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও বিজ্ঞানীদের অবশ্যই মনোযোগী হতে হবে। বাংলাদেশে অবৈধভাবে বাঘ পাচারের জন্য সুবিধাজনক অর্থনৈতিক ও অবকাঠামো দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।’
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা সংস্থা অক্সফোর্ড মার্টিন স্কুলসহ বেশ কয়েকটি বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ সংস্থা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে উঠেছে অক্সফোর্ড মার্টিন প্রোগ্রাম অন ওয়াইল্ডলাইফ ট্রেড। বাংলাদেশের বাঘ শিকার ও চোরাচালান নিয়ে কর্মসূচিটির পর্যবেক্ষণে বলা হয়, বাংলাদেশ বন বিভাগের করা টাইগার থ্রেট অ্যাসেসমেন্ট থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, বাঘ শিকার ও চোরাচালান প্রাণীটির সংখ্যায় সবচেয়ে বড় প্রভাবক হয়ে উঠেছে। সুন্দরবনে বাঘ শিকারের সঙ্গে স্থানীয় বন ব্যবহারকারী, পেশাদার শিকারি ও জলদস্যুদের প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ সংশ্লিষ্টতার আভাস মিলেছে।
বন অধিদপ্তরের প্রধান বন সংরক্ষক মো. আমীর হোসাইন চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, বাঘের জন্য বড় থ্রেট অবশ্যই চোরা শিকার। সুন্দরবনের বাঘ বৃদ্ধির জন্য তিনটি বিষয় জরুরি। তার আবাসস্থল ভালো থাকতে হবে, খাবার ভালো থাকতে হবে এবং চোরা শিকারিদের তৎপরতা কম থাকতে হবে। সুন্দরবনের পরিবেশ ভালো থাকায় বাঘের খাবার প্রাণী বাড়ছে, আর বাঘ বাড়ছে কিনা তা জানতে আগামী বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।










